BD SYLHET NEWS
সিলেটবুধবার, ২৯শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, সন্ধ্যা ৭:৫১
আজকের সর্বশেষ সবখবর

সুনামগঞ্জে হাওরে দ্রুত বাড়ছে পানি, শঙ্কায় কৃষকেরা


এপ্রিল ২৯, ২০২৬ ৫:৫৪ অপরাহ্ণ
Link Copied!

টানা বৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা ঢলে পানির উচ্চতা বাড়ছে, দ্রুত তলিয়ে যাচ্ছে সুনামগঞ্জের হাওড়গুলো। কৃষকের চোখের সামনে ডুবে যাচ্ছে সারা বছরের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের ফসল। ঠান্ডা ঝড়ো হাওয়া, বজ্রপাতের আতঙ্ক, ভারী বৃষ্টি সবকিছু উপেক্ষা করে হাওরের দিকেই দৌড়ে যাচ্ছেন কৃষক। হাঁটু থেকে বুক সমান পানিতে নেমে কেটে আনার চেষ্টা করছেন পরিবারের সারা বছরের খাদ্যের জোগান পাকা ধান।

বুধবার (২৯ এপ্রিল) সকাল থেকেই জেলাজুড়ে এমন চিত্র দেখা গেছে।

আবহাওয়া অধিদফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বুধবার ও আগামীকাল বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) সুনামগঞ্জে অতিভারী বৃষ্টি হতে পারে। এতে সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টির আশঙ্কা আছে। একই সঙ্গে সুনামগঞ্জের উজানে ভারতের চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টি হওয়ায় নামছে উজানের পাহাড়ি ঢল। এতে হাওরে ও নদীতে দ্রুত পানি বাড়ছে। চোখের সামনেই তলিয়ে যাচ্ছে কৃষকের জমির ধান।

সুনামগঞ্জে গত ২৪ ঘণ্টায় প্রায় সব নদ-নদীর পানি বেড়েছে। এতে জেলার হাওরগুলোতেও দ্রুত জমির ধান তলিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে ভারী বৃষ্টির কারণে কৃষকেরা ধান কাটা ও মাড়াই নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। ধান শুকাতে না পারায় খলাতেই নষ্ট হচ্ছে বলে জানিয়েছেন চাষিরা।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, জেলায় গতকাল মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) সকাল নয়টা থেকে আজ বুধবার সকাল নয়টা পর্যন্ত বৃষ্টি হয়েছে ২২ মিলিমিটার। এ সময়ে সুরমা নদীর পানি বেড়েছে ৫৬ সেন্টিমিটার। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টি হয়েছিল ১৩৭ মিলিমিটার। তখন সুরমা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছিল ৩৫ সেন্টিমিটার। এ ছাড়া কুশিয়ারা, নলজুর, পাটলাই, যাদুকাটা, খাসিয়ামারা, বৌলাইসহ সব নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এতে সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টির আশঙ্কা আছে। একই সঙ্গে সুনামগঞ্জের উজানে ভারতের চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টি হওয়ায় নামছে উজানের পাহাড়ি ঢল। এতে হাওরে ও নদীতে দ্রুত পানি বাড়ছে। চোখের সামনেই তলিয়ে যাচ্ছে কৃষকের জমির ধান। জামালগঞ্জ উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামের কৃষক তাজুল ইসলাম জানান, তাদের এলাকার পাগনার হাওরের প্রায় সব ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। হঠাৎ এত পানি হবে, কেউ ভাবতে পারেননি। তাই মাড়াই করা ধান অনেকে খলায় রেখেছিলেন। পানিতে সেগুলোও নষ্ট হয়েছে। হাওরে হাহাকার শুরু হয়েছে জানিয়ে হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, কৃষকেরা নিঃস্ব হয়ে গেছেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সরকারিভাবে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

কৃষকরা বলছেন, কেটে আনার পর রোদ না থাকায় খলায় পচে নষ্ট হচ্ছে ধান, আর না কাটলে পানিতে ডুবে যাচ্ছে। জেলার মধ্যনগরে বাঁধ ভেঙে ডুবে গেছে ইকরাছই হাওরের পাকা ধান। হাওরের নিচের দিকের উপজেলা মধ্যনগর ও শাল্লায় জলাবদ্ধতায় পাকা ধানের ক্ষতি হয়েছে বেশি। গেল দুইদিনের বৃষ্টিতে অন্য ১০ উপজেলার হাওরের নীচু জমির ধানও ডুবে গেছে। জেলার সবচেয়ে বড় সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার দেখার হাওরের একাংশের কৃষকরাও ডুবরায় ডুবে যাওয়া ধান বুধবার ভোর থেকেই কেটে আনার চেষ্টা করছেন।

বুধবার দুপুরে সুনামগঞ্জের দেখার হাওরপাড়ের মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের আব্দুল্লাপুরের কৃষক আলা উদ্দিন মিয়া বুক সমান পানি থেকে নিজের ধান কেটে আনার চেষ্টা করছিলেন। তিনি বলেন, ‘১৫ কেয়ার (তিন কেয়ারে এক একর) জমি করছিলাম। ৭ কেয়ার কাটছি, ই-ধান (কাটা ধান) খলায় থাইক্কা পচের (নষ্ট হচ্ছে)। অন্য সাত কেয়ার ডুবি গেছে।’

দেখার হাওরপাড়ের মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের আব্দুল্লাপুর, সরদাবাজ, দরিয়াবাজসহ ওখানকার ১৫ টি গ্রামে একই চিত্র। আব্দুল্লাপুরের আব্দুস ছাত্তার বললেন, ‘ঠাঠার বিজলিতে (বজ্রপাতের ঝলখানি) কানতালি (কান বন্ধ হয়ে যায়) লাগি যার, তবুও ছাড়ের না কেউ হাওর। কিলা যাইবো হাওরও ধান তইয়া (ধান রেখে)।’

দেখার হাওরের পাশেই কোরবাননগর ইউনিয়নের বাওনের বিল হাওর। ওই হাওরপাড়ের লালারচর গ্রামের কৃষক অরুন পাল বললেন, ‘মেঘের (বৃষ্টির) পানিতে ধানের শীষের গলায় গলায় পানি। আজকে (বুধবার ) কাটাওইয়া (ধান কাটা শ্রমিক) দিয়া আধা আধিতে (অর্ধেক নেবার চুক্তিতে) ধান কাটছে। কাইট্টাঔ কিতা করতো, হুকাইতো কিলা (কেটে কী লাভ শুকাবে কীভাবে)।’

অরুন পাল জানান, শহরের ধোপাখালি স্লুইসগেট দিয়ে বাওন বিলের পানি সুরমা নদীতে নামে। এখন সুরমা নদীতে পানি বাড়ায় স্লুইসগেট বন্ধ রাখা হয়েছে। এজন্য হাওরের ধান ডুবে যাচ্ছে।

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহাদাত হোসেন বললেন, দুইদিনে উপজেলার ৫০৫ হেক্টর জমি জলাবদ্ধতায় ডুবেছে। এভাবে বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে ডুবে যাওয়া জমির পরিমাণ বাড়তে থাকবে। টানা বৃষ্টিতে জেলার আরেক বৃহৎ হাওর নলুয়ার ফসল তলিয়ে গেছে।

সোমবার (২৭ এপ্রিল) থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টিতে ফসলের মাঠ জলমগ্ন হলেও রাতের টানা বৃষ্টিতে ফসল তলিয়ে গেছে। মঙ্গলবার সকালে ঘুম থেকে উঠে কৃষকরা পানির নীচে কষ্টার্জিত ফসল দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন।

নলুয়ার হাওরের দাসনোয়াগাঁও গ্রামের কৃষক সারদা চরন দাস জানান, তিনি ১৬ কেয়ার জমিতে চাষাবাদ করেছিলেন, কিন্তু মাত্র এক কেয়ার জমির ফসল তুলতে পেরেছেন। গত দুই দিন ও রাতের বৃষ্টিতে সব জমি তলিয়ে গেছে। কৃষক শ্রমিক সংকট থাকায় তিনি অনেক চেষ্টা করেও ফসল কাটাতে পারেননি। কান্না জড়িত কণ্ঠে জানান, ‘আমার সব শেষ হয়ে গেল, একমাত্র বোরো ফসলের ওপর নির্ভরশীল আমার পরিবার। ধার-দেনা করে জমি চাষাবাদ করেছিলাম, এখন সারাবছর কীভাবে চলব।’

নলুয়ার হাওরের কৃষক এখলাছ মিয়া, মধু মিয়া, গৌরাঙ্গ দাস, হরিন্দ্র দাসসহ অনেক কৃষক বৃষ্টির পানিতে তাদের ফসল তলিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়ে বলেন, পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় বৃষ্টির পানিতে ফসল ডুবে গেছে। তাদের দাবি হাওরের ফসল রক্ষা বেড়িবাঁধ এবার তাদের জন্য মরণফাঁদ হয়েছে।

জগন্নাথপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কাওসার আহমেদ জানান, নলুয়ার হাওরের ৬০ ভাগ জমির ধান কাটা হয়েছে। জলাবদ্ধতা ও শ্রমিক সংকটে অনেক কৃষক ধান তুলতে কষ্টে আছেন। এরমধ্যে টানা বৃষ্টি ফসলের কিছু ক্ষতি করছে, নৌকা দিয়ে ধান উত্তোলনের চেষ্টা করা হচ্ছে। মঙ্গলবার দুপুর থেকে বুধবার সকাল পর্যন্ত ধর্মপাশা উপজেলার, ধারাম, কাইঞ্জা, হারগুড়সহ কয়েকটি হাওর ঘুরে কৃষদের করুণ চিত্র লক্ষ্য করা যায়। যেসব জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে তা কর্তনের আশা ছেড়ে দিয়েছেন কৃষকেরা। আর কর্তন করা ধান বৈরি আবহাওয়ার কারনে মাড়াই ও শুকাতে না পারার যন্ত্রণায় কাতর কৃষক। মাড়াই করা ধান শুকাতে না পারায় এবং অতিরিক্ত পরিবহন খরচ ও খারাপ যোগাযোগ ব্যবস্থার কারনে হাওরেই ফেলে রাখা হয়েছে অনেক কৃষকের ধান।

কান্দাপাড়া গ্রামের কৃষক নুর ইসলাম বলেন, ধান পচে যাওয়ায় আলাল মিয়া তার ধান নিতে আসছে না। যে টাকা খরচ করে ধান কাটা ও মাড়াই করেছে এই টাকাইতো উঠবেনা তার। অন্তত আট দিন আগে তিনি তার ১৯ কেয়ার জমির মধ্যে ১৫ কেয়ার জমির ধান কাটতে পেরেছেন। বাকি ৪ কেয়ার জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। ৬০ মণ ধান তিনি খাবারের জন্য সিদ্ধ করেছিলেন। কিন্তু তিনি এখন শুকাতে পারছেন না। ফলে তিনি তার দোকানের ভেতরে বৈদ্যুতিক পাখা চালিয়ে ধান শুকানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু নিয়মিত বিদ্যুৎ না থাকায় তাও ভালভাবে সম্ভব হচ্ছে না।

কাইঞ্জার হাওরের কৃষক আরিফ মিয়া বলেন, বর্গা নিয়ে ৭ কেয়ার জমি করেছিলাম। কিন্তু জমির ধান কেটে খলায় রাখার পর খলায় পানি উঠে যায়। ফলে এখনও এভাবেই খলায় ধান পড়ে আছে। খলা থেকে পানি নামলেও রোদ না থাকায় মাড়াই বা শুকাতে পারছি না। এসব ধানের আশা ছেড়ে দিয়েছি।

এদিকে উপজেলার হাড়গুড় হাওরে দেখা যায়, সদর ইউপির মহদিপুর গ্রামের কৃষক গোপাল চন্দ্র কর ও তার ছেলে দীপ চন্দ্র কর নিজেদের জমির ধান কাটছেন। তারা জানান, ধান কাটার জন্য তারা কোনো শ্রমিক পাননি। ফলে তারা নিজেরাই ধান কাটছেন।

ধান কাটা কিংবা পরিবহনের কাজে নিয়োজিত রয়েছে পরিবারের ছোট সদস্যরাও। তারা বড়দেরকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে যাচ্ছে। এমন চিত্র দেখা যায়, কান্দাপাড়া গ্রামের পশ্চিম পাশে হাড়গুড় হাওরের বিপরীতে থাকা জমিগুলোতে। কান্দাপাড়া গ্রামের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী জুয়াইদ ও তার ফুফাতো ভাই মাদরাসা শিক্ষার্থী আরিয়ান হাওর থেকে নৌকা দিয়ে ধান এনে উঁচু জায়গায় স্তূপ করছে।

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, এ পর্যন্ত সুনামগঞ্জের হাওরে ৫০ শতাংশ মতো জমির ধান কাটা হয়েছে। বোরো আবাদের অর্ধেক জমির ধান কাটার আগেই অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢলের কবলে পড়েছেন হাওরের কৃষকেরা। বাকি যে জমির ধান এখনো আছে, সেগুলো নির্ভর করছে প্রকৃতির ওপর।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, হাওরে পানি বাড়ছে। বৃষ্টির কারণে কৃষকেরা মাড়াই করা ধানও শুকাতে পারছেন না। নানা দিক থেকে কৃষকেরা সংকটে আছেন। তাদের হিসেবে সারা জেলায় জলাবদ্ধতায় সাড়ে ছয় হাজার হেক্টর ফসল ডুবেছে।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার বলেন, আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ভারী বৃষ্টি হতে পারে। সুনামগঞ্জে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও পানি বৃদ্ধি পেয়েছে ৫০ সেন্টিমিটার। সুনামগঞ্জ সুরমা নদীতে পানি বিপৎসীমার ১৬৯ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ২২ মিলিমিটার। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে আগাম বন্যার আশঙ্কা আছে।

কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, এবার সুনামগঞ্জে আবাদ হয়েছে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর ধান। আগাম বৃষ্টিপাতে তিন হাজার ১৮৯ হেক্টর জমির ধান জলাবদ্ধতায় তলিয়েছে। এরমধ্যে প্রথম ধাপের বৃষ্টিপাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১২১ হেক্টর ও দ্বিতীয় ধাপের বৃষ্টিতে ক্ষতি হয়েছে এক হাজার ২১০ হেক্টর ধান। এই দুই ধাপে মোট ক্ষতি হয়েছে এক হাজার ৩৩১ হেক্টর বোরো ধান। লক্ষ্যমাত্রা ছিলো ২ লাখ ২৩ হাজার ৫০৫ হেক্টর, আবাদ হয়েছে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর।

কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।