ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার সালন্দর গ্রামের এসএসসি পরীক্ষার্থী ৩ বোন স্বপ্নীল বর্মন, স্বর্ণালী বর্মন ও সেঁজুতি বর্মন।
একই দিনে জন্ম, একসঙ্গে বড় হওয়া, একই ছন্দে পথচলা আর এবার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মোড় এসএসসি পরীক্ষায়ও একসঙ্গে অংশগ্রহণ। ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার সালন্দর গ্রামের তিন বোন স্বপ্নীল বর্মন, স্বর্ণালী বর্মন ও সেঁজুতি বর্মনের গল্প যেন এক বিরল বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।
২০০৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর জন্ম নেওয়া এই তিন বোন ছোটবেলা থেকেই একসঙ্গে বেড়ে উঠেছে। পরিবারের অন্য সদস্যদের কাছে যেমন তারা আলাদা আলাদা ব্যক্তি, তেমনি গ্রামের মানুষের কাছে তারা যেন একসুতোয় গাঁথা তিনটি স্বপ্ন।
মঙ্গলবার থেকে শুরু হওয়া এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সেই স্বপ্নযাত্রায় নতুন অধ্যায় যোগ করেছে তারা।
সোমবার বিকেলে তাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তিনজনই শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। একই টেবিলে পাশাপাশি বসে বইয়ের পাতায় চোখ রেখে মনোযোগ দিয়ে পড়ছে তারা। মাঝে মাঝে একে অন্যকে প্রশ্ন করছে, ভুল ধরিয়ে দিচ্ছে, আবার কখনো ছোট্ট হাসিতে ভেঙে যাচ্ছে পড়ার গম্ভীর পরিবেশ।তবে লক্ষ্য একটাই ভালো ফল করে বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটানো। তাদের বাবা ঠান্ডারাম বর্মন ও মা ময়না রানী সেন। চার সন্তানের এই পরিবারে বড় মেয়ে মৃদুলা বর্মন ও ছোট ছেলে প্রদ্যুৎ বর্মনের পাশাপাশি এই তিন বোনই পরিবারের মূল আকর্ষণ। একসঙ্গে তিন সন্তানের বেড়ে ওঠা যেমন আনন্দের, তেমনি চ্যালেঞ্জেরও ছিল বলে জানান মা ময়না রানী সেন।
তিনি বলেন, ‘একসঙ্গে তিন মেয়েকে মানুষ করা সহজ ছিল না। তবে ওদের ভালোবাসা আর একে অন্যের প্রতি টান আমাদের সব কষ্ট ভুলিয়ে দেয়।’ শিক্ষাজীবনের শুরুটাও ছিল এক সঙ্গেই। প্রথমে একটি স্থানীয় কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি হয় তারা। এরপর আরাজী কৃষ্ণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে।
সেই সময় শিক্ষক ও সহপাঠীদের কাছে তাদের আলাদা করে চেনা ছিল বেশ কঠিন। অনেক সময় আলাদা করতে বিশেষ চিহ্ন ব্যবহার করতে হতো বলে জানান সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা।
২০১৮ সালে স্বপ্নীল ও স্বর্ণালী ঠাকুরগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হয়। পরে একই বিদ্যালয়ে ভর্তি হয় সেঁজুতিও। যদিও তিনজন একই শিফটে পড়াশোনা করলেও স্বর্ণালীকে আলাদা শাখায় পড়তে হয়েছে। বর্তমানে তিনজনই বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। পড়াশোনায় তারা বরাবরই মনোযোগী। ফলাফলেও রয়েছে ধারাবাহিক সাফল্য। তবে পছন্দের বিষয়ে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। স্বপ্নীলের প্রিয় বিষয় জীববিজ্ঞান ও বাংলা সাহিত্য, স্বর্ণালীর পছন্দ জীববিজ্ঞান ও রসায়ন, আর সেঁজুতির আগ্রহ জীববিজ্ঞানেই বেশি।
খাবারের ক্ষেত্রে তিনজনেরই পছন্দ বিরিয়ানি, যদিও অন্য খাবারে রুচির পার্থক্য রয়েছে। পোশাকেও আগে মিল থাকলেও এখন কিছুটা ভিন্নতা এসেছে। তবে থ্রি-পিস তাদের সবারই প্রিয়, আর বিশেষ দিনে শাড়ি পরতে ভালোবাসে তারা।
শুধু পড়াশোনাই নয়, সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও সক্রিয় এই তিন বোন। তারা বাংলাদেশ বেতার, ঠাকুরগাঁও কেন্দ্রের তালিকাভুক্ত শিশুশিল্পী। দেশাত্মবোধক গান গাইতে ভালোবাসে তারা। অবসর সময়ে উপন্যাস ও বিজ্ঞান কল্পকাহিনি পড়া, গান শোনা ও গাওয়া তাদের নিত্যসঙ্গী। একই দিনে জন্ম নেওয়া তিন বোনের এই গল্প শুধু একটি পরিবারের নয়; এটি একসঙ্গে স্বপ্ন দেখার, একসঙ্গে লড়াই করার এবং একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণার গল্প।
ভবিষ্যৎ স্বপ্নেও রয়েছে বৈচিত্র্য। স্বপ্নীল বিসিএস ক্যাডার হতে চায়, স্বর্ণালী চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখছে, আর সেঁজুতি শিক্ষক হয়ে সমাজে অবদান রাখতে চায়। তিনটি আলাদা স্বপ্ন, কিন্তু পথচলা একসঙ্গেই। তাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনও অনেকটা একসুতোয় গাঁথা। একই ঘরে থাকা, একসঙ্গে স্কুলে যাওয়া, পড়াশোনা ও খেলাধুলা সব কিছুতেই রয়েছে মিল। ছোটখাটো খুনসুটি বা ঝগড়া হলেও তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। অল্প সময়েই আবার মিল হয়ে যায়।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক তাপস দেবনাথ বলেন, ‘একই পোশাকে তিনজনকে আলাদা করা অনেক সময় কঠিন হয়ে যেত। মাঝে মাঝে চেনার জন্য বিশেষ চিহ্ন ব্যবহার করতে হতো। তবে তারা পড়াশোনায় খুবই মনোযোগী এবং ভদ্র।’
বাবা ঠান্ডারাম বর্মন জানান, শুরুতে যমজ সন্তান হবে ভেবেছিলেন। কিন্তু একসঙ্গে তিন কন্যাসন্তান জন্ম নেওয়ায় কিছুটা দুশ্চিন্তায় ছিলেন। সময়ের সঙ্গে সেই দুশ্চিন্তা কেটে গেছে। এখন মেয়েদের সাফল্যেই তিনি গর্বিত। তিনি বলেন, ‘ওরা যেন ভালো মানুষ হতে পারে, সেটাই আমাদের সবচেয়ে বড় চাওয়া।’
তিন বোনই সবার কাছে দোয়া চেয়েছে। তাদের আশা, এসএসসি পরীক্ষায় ভালো ফল করে তারা বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে এবং ভবিষ্যতে নিজেদের লক্ষ্য অর্জনের পথে এগিয়ে যাবে।
