আবদুল কাদের তাপাদার:: ইফতারের ঠিক আগে দু:সংবাদটি ছড়িয়ে পড়ে সিলেট শহরজুড়ে। খবর পৌঁছে যায় বড়লেখা উপজেলার প্রান্তিক জনপদ বর্ণি ইউনিয়নের মনারাই গ্রামেও। অবিশ্বাস্য, অস্বাভাবিক, বাকরুদ্ধ করা সেই মৃত্যুর খবর মুহূর্তে বিশ্বাস করা কঠিন!
মাত্র তিনদিন আগে গত বুধবার সিলেটে বড়লেখাবাসীর ইফতার মাহফিলে চারপাশ মাতিয়ে রেখেছিল টগবগে তরুণ, তারুণ্যে উত্তাল, সুদর্শন মায়াবী যুবক কামরুজ্জামান কামরুল।আজই ইফতারের ঠিক আগে সে বিদায় নিয়েছে চিরকালের মতো।
কামরুলের বাড়ি আমার উপজেলা বড়লেখার বর্ণি ইউনিয়নের মনারাই গ্রামে। সিলেট শহরের কুমারপাড়ায় বসবাস করতো
কামরুল। বয়স আর কতো হবে তার। ত্রিশ পেরুতে এখনো বাকি।
একদিন আগে ফেইসবুকে নিজের অসুস্থতার কথা জানান দিয়ে সুস্থতার জন্য দোয়া চেয়েছিল কামরুল।কী এমন কঠিন রোগ বাসা বেঁধেছিল তার শরীরে আমরা তা জানিনা! তাকে দেখে তো সুস্থ স্বাভাবিক ও উচ্ছল মনে হতো।
এমনভাবে মানুষ চিরবিদায় হয়ে যায় কামরুল,খুব কমই তো দেখেছি। তোমার কিসের এতো তাড়া এসে ভর করেছিল? কেনো তুমি হারিয়ে গেলে জীবনের ফুল ফোটার আগেই?আল্লাহতায়ালার সাথে তোমার কী এমন বোঝাপড়া হয়ে গেলো,আমাদের তা জানার কথাও নয়। তোমাকে এতো কম বয়সে আল্লাহ তায়ালা নিয়ে নিলেন!
নিশ্চয়ই আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের মাঝে তুমিও শামিল হবে ।
এই রমজানের মহিমান্বিত দিনে রোজা অবস্থায় তোমার মৃত্যু হলো। এই মৃত্যু যেনো তোমার জন্য জান্নাতুল ফেরদৌসের দরজা খুলে দেয়।
নম্র ভদ্র ও সুদর্শন চেহারার কামরুলের সঙ্গে পরিচয় হয় কয়েক বছর আগে। সম্ভবত: ডা: হেলাল ভাইয়ের আয়েশা মেডিকেয়ার এর চেম্বারে।
আমার কাছে এসে বলেছিল: আপনি সাংবাদিক কাদের তাপাদার ভাই তো, আপনার বাড়ি গাজিটেকায়।আমি আপনাকে অনেক দিন থেকে চিনি।
নিজের নাম বলে বর্ণির মনারাই গ্রামে তার বাড়ি এটা জানিয়েছিলো।
বড়লেখা সমিতি গঠনের তোড়জোড়ের সময় মিটিং ইত্যাদিতে নিয়মিতই দেখা হতো কামরুলের সাথে।আমাদের সমিতির সকল সভায় তার নিয়মিত উপস্থিতি ছিল। কমিটি গঠনের সময় বয়স কম হওয়ার কারণে অনেকেই তাকে কার্যকরী কমিটিতে রাখার পক্ষে ছিলেন না।কিন্তু তার একটিভনেসের কারণে
তাকে বাদ দেয়া সম্ভব হয়নি। তাকে কমিটির সহ-ক্রীড়া সম্পাদকের পদ দেয়া হয়।
রমজানের এই সেদিন দৈনিক সিলেটের ডাক এর অফিসে আমাদের সমিতির সাধারণ সম্পাদক ওয়াহিদের কক্ষে আমাদের ইফতার মাহফিল সংক্রান্ত সভায় সে আগেভাগেই এসে হাজির হয়েছে।
রাতও অনেক হয়েছে। সভা শেষ হওয়ার সাথে সাথে আকাশ জুড়ে বজ্রবৃষ্টি নামে। মধুবনের নীচে এসে আমরা বাসায় ফেরার জন্য
যার যার নিজস্ব বাহন আছে তাদেরকে একে অন্যকে লিফ দেয়ার আলাপ করছিলাম।
কামরুল এসে আমার কানে কানে বলে, চলুন আপনাকে আমি দিয়ে আসি। আমি বলি, তোমার তো মোটরসাইকেল। বৃষ্টির মধ্যে এতদূর যাওয়া তোমার জন্য কষ্টকর হবে। আমি বরং সিএনজি নিয়ে চলে যাবো। পকেটে ভাংতি টাকা না থাকায় আমি তাজুলের কাছ থেকে ১০০ টাকা নিয়ে সিএনজিতে চলে যাই।
গত বুধবার ইফতার মাহফিলে সে অনেক বারই আমার সাথে ছবি উঠেছে।কথা বলেছে। ইফতারের আগে একটা টেবিলে ডাঃ হেলাল ভাইয়ের সাথে ছবি উঠানোর জন্য আমাকে ডেকে নিয়ে বসায়।
শেষদিকে বর্ণি এলাকার দুজন যুবক কামরুল আর আবদুর রহমান পারভেজসহ আরও সমবয়সী কয়েকজন তাদের একটা ছবি তুলে দিতে অনুরোধ জানায় । আমি ছবি তোলার পর কামরুল বলে,ভাই ফেইসবুকে এটা দেবেন। ইফতার মাহফিলের পোস্টে আমি তাদের সেই ছবিটা জুড়ে দেই।
কামরুল, অল্পদিনের পরিচয় হলেও তোমার সাথে স্মৃতি বিস্মৃতির মধুরতা অনেক দীর্ঘ। প্রায়ই ফোন দিতে আমাকে। আমার মোবাইলে তোমার নম্বরটা সেইভ ছিল Kamruzzaman Monarai বলে।
সিলেট শহরের নানা প্রসঙ্গ, বড়লেখার নানা বিষয়ে আলাপ আলোচনা হতো। আজ সেসব কেবলই স্মৃতি!
তোমার মৃত্যু হয়েছে, তোমার জানাজা ও দাফন হবে। চিরকালের মতো হারিয়ে যাবে তুমি, কেনো জানি তা মেনে নেয়া খুব কঠিন মনে হচ্ছে। তোমার মৃত্যু স্বাভাবিক না অস্বাভাবিক আমি ঠিক জানি না। তবে তুমি আর নেই এটাই অবধারিত সত্যি। এরচেয়ে বড় সত্যি আর নেই।
আমরা তোমার জন্য শোকাভিভূত।
তোমার স্বজন পরিজন স্বজনরাও আরো বেশি
শোকাহত।আল্লাহ সবাইকে সবরে জামিলা দান করুন।
আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করে জান্নাতের অমিয়সুধা পান করান এই দোয়া করি।
লেখক:: সহ-সভাপতি, সিলেট প্রেসক্লাব।
কোষাধ্যক্ষ, বড়লেখা সমিতি,সিলেট।
