BD SYLHET NEWS
সিলেটশনিবার, ৭ই নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, রাত ১০:০৪
আজকের সর্বশেষ সবখবর

১১ মাস ধরে খুঁড়ে রাখা সড়কে ভোগান্তিতে ১০ গ্রামের মানুষ


নভেম্বর ৭, ২০২৬ ১২:২৮ অপরাহ্ণ
Link Copied!

মেহেরপুর সদরের যাদবপুর-বুড়িপোতা সড়কের আড়াই কিলোমিটার অংশ সংস্কারের জন্য খুঁড়ে রাখা হয়েছে প্রায় ১১ মাস যাবত। কোথাও ছোট-বড় গর্ত, কোথাও উঠে গেছে ইট। নির্ধারিত সময়ে সংস্কারকাজ শেষ না হওয়ায় এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ বন্ধ রাখায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন ১০টি গ্রামের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ।

প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে অটোরিকশা, মোটরসাইকেল, ট্রলি, পিকআপ ভ্যানসহ বিভিন্ন যানবাহনকে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন অসুস্থ রোগী, অন্তঃসত্ত্বা নারী, শিক্ষার্থী ও নিয়মিত যাতায়াতকারী শ্রমজীবী মানুষ। দ্রুত সড়কটির সংস্কারকাজ শেষ করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

সদর উপজেলার যাদবপুর-বুড়িপোতা সড়কটি বুড়িপোতা ইউনিয়নের মানুষের জেলা শহরে যাতায়াতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। সড়কটির আড়াই কিলোমিটার অংশ সংস্কারের জন্য পুরোনো পিচ ও বিটুমিন তুলে ফেলা হলেও দীর্ঘদিন ধরে কাজ বন্ধ রয়েছে। ফলে সড়কটি এখন সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বুড়িপোতা, কামদেবপুর, ইছাখালী, ঝাঁঝা, হরিরামপুর, বাজিতপুর, নবীননগর, বাড়িবাঁকা, রাজাপুর আদর্শগ্রাম ও শালিকা এই ১০ গ্রামের মানুষ প্রতিদিন সড়কটি ব্যবহার করেন। কৃষিপণ্য পরিবহন, শিক্ষার্থীদের যাতায়াত, অসুস্থ রোগীদের হাসপাতালে নেওয়া এবং কর্মজীবী মানুষের জেলা শহরে পৌঁছানোর জন্য সড়কটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, সড়কের বিভিন্ন স্থানে ইট সরে গিয়ে ছোটো-বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও মালামাল বহনকারী ট্রলি। সামান্য অসতর্কতায় যানবাহন উল্টে যাওয়া কিংবা দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।

সড়কে চলাচলকারী যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জেলা শহরে যাতায়াতের জন্য তাঁদের এ পথের ওপর নির্ভর করতে হয়। বিকল্প রাস্তা না থাকায় দুর্ভোগ সহ্য করেই চলাচল করতে হচ্ছে। সড়কের গর্ত ও উঁচু-নিচু অংশের কারণে অটোরিকশায় যাতায়াত করাও কষ্টকর হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে রোগী নিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার সময় ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়।

অটোরিকশার যাত্রী রাশিদা খাতুন, আসমা আক্তার ও রাফিউল জানান, সড়কটির অবস্থা এতটাই খারাপ যে, যানবাহনে বসে স্বাভাবিকভাবে যাতায়াত করা যায় না। প্রতিটি গর্তে গাড়ি পড়ার সময় প্রচণ্ড ঝাঁকুনি লাগে। কখন গাড়ি উল্টে যায়, সেই আশঙ্কাও থাকে। জেলা শহরে যাওয়ার বিকল্প কোনো রাস্তা না থাকায় বাধ্য হয়েই এ সড়ক ব্যবহার করতে হচ্ছে তাঁদের।

অটোরিকশাচালক ফারুক হোসেন জানান, এই রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন যাত্রী নিয়ে শহরে যেতে হয়। কিন্তু সড়কের গর্তের কারণে গাড়ি চালাতে খুব সমস্যা হয়। একটু অসতর্ক হলেই গাড়ির চাকা গর্তে পড়ে যেতে পারে। এতে গাড়ির যন্ত্রাংশ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি যাত্রীদের দুর্ঘটনার ঝুঁকিও থাকে। খারাপ রাস্তার কারণে স্বাভাবিক গতিতে গাড়ি চালানো যায় না। দ্রুত সড়কটি সংস্কার করা হলে আমাদেরও কষ্ট কমবে, যাত্রীরাও নিরাপদে চলাচল করতে পারবেন।

আরেক অটোরিকশাচালক মাসুম হোসেন জানান, সড়কটি ভালো থাকলে অল্প সময়ে যাত্রী নিয়ে শহরে যাওয়া যেত। এখন গর্ত এড়িয়ে চলতে হয় বলে সময় বেশি লাগে। গাড়ির ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে, মেরামতের খরচও বাড়ে। যাত্রীদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া নেওয়াও সব সময় সম্ভব হয় না। এভাবে দীর্ঘদিন চলতে থাকলে আমাদের আয় কমে যাবে। তাই দ্রুত কাজ শুরু করে রাস্তাটি চলাচলের উপযোগী করা দরকার।

সড়কটির দুরবস্থার কারণে শুধু যাত্রী ও চালকেরাই নন, ভোগান্তিতে পড়েছেন বিভিন্ন পেশার মানুষও। জেলা শহরে কর্মস্থলে যাওয়া বেসরকারি চাকরিজীবীদের প্রতিদিন সময় হাতে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হতে হচ্ছে। অন্যদিকে কৃষকদের উৎপাদিত ফসল বাজারে নেওয়ার ক্ষেত্রেও বাড়ছে পরিবহনসংক্রান্ত ঝুঁকি ও খরচ।

বেসরকারি চাকরিজীবী সম্রাট হোসেন জানান, প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে কর্মস্থলে পৌঁছাতে হয়। কিন্তু এ রাস্তা দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে কখন কোথায় আটকে পড়তে হয়, তা বলা যায় না। গর্তের কারণে গাড়ি ধীরে চলে, ফলে যাতায়াতে অতিরিক্ত সময় লাগে। বৃষ্টির সময় পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সময়মতো অফিসে পৌঁছানো নিয়েও দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। দ্রুত সংস্কারকাজ শেষ হলে এলাকার মানুষের এই দুর্ভোগ কমবে।

আরেকজন চাকরিজীবী আরিফুল ইসলাম জানান, জেলা শহরে যাতায়াতের জন্য সড়কটি আমাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে কাজ বন্ধ থাকায় প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। বিশেষ করে পরিবারের শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে যাতায়াত করা কঠিন। রাস্তা খুঁড়ে রেখে কাজ বন্ধ করে দেওয়ায় মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত ঠিকাদারকে দিয়ে কাজ শেষ করানো।

এলাকার কৃষকেরাও সড়কটির বেহাল অবস্থার কারণে উদ্বিগ্ন। কৃষিপণ্য উৎপাদনের পর তা বাজারে নিয়ে বিক্রি করতে হয়। কিন্তু সড়ক খারাপ থাকায় পরিবহনে সময় ও খরচ দুটোই বাড়ছে। এতে কৃষকদের লাভ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

কৃষক সেলিম হোসেন জানান, আমরা মাঠে ফসল ফলাই। উৎপাদিত ফসল সময়মতো বাজারে নিতে না পারলে ভালো দাম পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এ রাস্তা দিয়ে মালামাল নিয়ে যেতে গাড়ি ধীরে চালাতে হয়। গর্তে পড়ে ফসল বা মালামালের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। রাস্তা খারাপ থাকায় পরিবহন খরচ বেড়ে গেলে সেই চাপ শেষ পর্যন্ত আমাদেরই বহন করতে হয়। কৃষকদের কথা বিবেচনা করে দ্রুত সড়কটি সংস্কার করা দরকার।

আরেকজন কৃষক চাঁদ আলী জানান, এই এলাকার অনেক মানুষ কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। তাঁদের উৎপাদিত ফসল বাজারে নেওয়ার জন্য ভালো রাস্তা প্রয়োজন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সড়কটির কাজ বন্ধ থাকায় আমাদের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনে সমস্যা হচ্ছে। বর্ষা বা বৃষ্টির সময় পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত ব্যবস্থা নিলে কৃষকসহ এলাকার সব মানুষের উপকার হবে।

বুড়িপোতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহজামান হোসেন জানান, সড়কটির সংস্কারকাজ শুরু হলেও ঠিকাদার কাজ বন্ধ রেখে চলে গেছেন। বিষয়টি জেলা প্রশাসককে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। তবে এখনো কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। ইউনিয়নের প্রায় ৫০ হাজার মানুষের চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটি দীর্ঘদিন ধরে খুঁড়ে রাখায় মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা যায়, মেহেরপুর শহরের পশ্চিম দিকের সীমান্ত এলাকার যোগাযোগ সহজ করতে ২০২৫ সালে যাদবপুর-বুড়িপোতা সড়কের আড়াই কিলোমিটার অংশ পাকা ও উন্নয়নের প্রকল্প নেওয়া হয়। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয় ৬০ লাখ ৬১ হাজার ৫৬৭ টাকা। কাজটি পায় শিশির এন্টারপ্রাইজ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে কাজ শুরু হয় এবং চলতি বছরের মার্চের মধ্যে তা শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও কাজ শেষ হয়নি। পুরোনো পিচ ও বিটুমিন তুলে সড়কটি খুঁড়ে রাখার পর সংস্কারকাজ বন্ধ হয়ে যায়।

কাজ বন্ধ থাকার বিষয়ে বক্তব্য জানতে ঠিকাদার আশিকুর রহমান শিশিরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কথা বলতে রাজি হননি। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক আবদুল্লাহ আল মারুফ জানান, হঠাৎ তেল ও বিটুমিনের দাম বেড়ে যাওয়ায় কাজ করতে গিয়ে লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছিল। এ কারণে কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। এ বিষয়ে এলজিইডি থেকেও নতুন কোনো চিঠি দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।

এ বিষয়ে এলজিইডির মেহেরপুর সদর উপজেলা প্রকৌশলী আক্তার হোসেন বলেন, সড়কটির কাজের মেয়াদ বাড়ানোর জন্য ঢাকায় অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ সম্পন্ন না করলে বিধি অনুযায়ী জরিমানা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।