শরতের মেঘমুক্ত নীল আকাশে যে স্নিগ্ধতা থাকার কথা, প্রকৃতিতে তা এখন নিখোঁজ। ঋতুচক্রে শরতের পদচারণা ঘটলেও সিলেটের আবহাওয়া আচরণ করছে খরতপ্ত গ্রীষ্মের মতো। শরতে যেখানে ধীরে ধীরে তাপমাত্রা কমার কথা, সেখানে তীব্র রোদ আর বাতাসে আর্দ্রতার কারণে ঝরছে ঘাম, নেমে এসেছে গ্রীষ্মের দাবদাহ। সোমবার মৌসুমের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৭ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তার ওপর যোগ হয়েছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুতের লুকোচুরি। অসহনীয় এই দ্বিমুখী সংকটে সিলেটে নাগরিক জীবনে নেমে এসেছে ভোগান্তি।
সিলেট আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ সজীব হোসাইন জানান, শরতের এ সময়ে যে তাপমাত্রা থাকার কথা, তা অতিক্রম করে গতকাল সিলেটে এই মৌসুমের সর্বোচ্চ ৩৭ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে (আগের দিন রোববার ছিল ৩৪ দশমিক ৭ ডিগ্রি)।
তবে নগরবাসীর দুর্ভোগ শুধু গরমে সীমাবদ্ধ নেই, মূল বিষফোড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদ্যুৎ বিভ্রাট। সিলেট নগরীতে প্রতি ঘণ্টাতে বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলের চিত্র আরও ভয়াবহ; পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহকরা দিনে ৫-৮ ঘণ্টা পযন্ত লোডশেডিংয়ের কবলে পড়ছেন।
লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে সাধারণ মানুষের জীবন জীবিকাতেও। নগরীর জিন্দাবাজার এলাকার টেইলার ব্যবসায়ী মকসুদ হোসেন হতাশা প্রকাশ করে বলেন, দিনের বেশির ভাগ সময় বিদ্যুৎ থাকে না। গ্রাহকদের চাহিদামতো কাপড় ডেলিভারি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সারাদিন বসে থেকেও একটা প্যান্ট সেলাই করা যায় না। নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যবসা লাভে ওঠা দূরের কথা, খেয়ে-পরে বাঁচাই দায় হয়ে পড়েছে।
একই ভোগান্তির কথা জানান মিরের ময়দান এলাকার গৃহিণী সাজনা বেগম। তিনি বলেন, দিনের চেয়ে রাতে লোডশেডিং বেশি হচ্ছে। গরমে বাচ্চারা অসুস্থ হয়ে পড়ছে, ঘুমাতে পারছে না। তার ওপর মোমবাতি জ্বালিয়ে পড়ালেখা বা স্কুলের হোমওয়ার্ক করা সম্ভব হচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে সামনে বাচ্চাদের পরীক্ষার ফলাফল বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।
সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা সেলিম তাপাদার জানান, গ্রামে বিদ্যুৎ নেই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। স্ত্রী সন্তানদের নগরীতে বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছি। সেখানে একই অবস্থা বলে তিনি জানান।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সিলেটের কুমারগাঁওয়ে ২২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ায় সেখানে উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। গত বুধবার থেকে ওই কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের (পিডিবি) সিলেট অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী ইমাম হোসেন জানান, কুমারগাঁও কেন্দ্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশে (বাল্ব) সমস্যা দেখা দিয়েছে। এটি মেরামতের জন্য বিদেশ থেকে নতুন যন্ত্রাংশ আনার প্রক্রিয়া চলছে।
পরিসংখ্যান দিয়ে তিনি জানান, গতকাল দুপুরে ২৫২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৪২ মেগাওয়াট এবং রোববার সন্ধ্যায় ২৫৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৬০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়েছে। তিনি বলেন, উৎপাদন বন্ধ থাকায় ভোল্টেজ ঠিক রাখতে লোডশেডিং বাড়াতে বাধ্য হচ্ছি।
অন্যদিকে কুমারগাঁও বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল কাদের সোমবার বিকেলে জানান, কারিগরি ত্রুটির কারণে উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটেছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে ত্রুটি সমাধান করে কেন্দ্রটি পুনরায় উৎপাদনে ফেরানোর জোর চেষ্টা চলছে। তবে মেরামত শেষ হতে ঠিক কত সময় লাগবে তা এখন নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
