ভূমি অধিগ্রহণসহ নানান জটিলতায় আট বছরেও আলোর মুখ দেখেনি ‘নবীনগর-আশুগঞ্জ সড়ক’ প্রকল্প। ‘ভুল’ পরিকল্পনায় তিন বছরের কাজ শেষ হয়নি আট বছরেও। কয়েক দফা মেয়াদ বাড়িয়ে জুন ২০২৭ সাল করলেও কাজ সমাপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, ঢাকা-চট্টগ্রাম (এন-১) ও ঢাকা-সিলেট (এন-২) জাতীয় মহাসড়কের সঙ্গে নবীনগর-আশুগঞ্জ অঞ্চলের সংযোগ উন্নত করার জন্য আট বছর আগে নেওয়া হয়েছিল প্রকল্পটি। এই সড়ককে দেশের ইকোনমিক লাইফলাইন বলা হয়।
জানা যায়, এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত প্রকল্পের ক্রমপুঞ্জিত আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ৬৭ দশমিক ৯০ শতাংশ এবং ভৌত অগ্রগতি ৭৮ শতাংশ। সময়ের তুলনায় অগ্রগতির এই হার তুলনামূলকভাবে কম। ফিজিবিলিটি স্টাডি সম্পাদনে দুর্বলতা প্রকল্পটির কর্ম ও ক্রয় পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নে সীমাবদ্ধতা তৈরি করেছে।
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) পর্যবেক্ষণে ভূমি অধিগ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা, কোভিড-১৯, ডিজাইন হালনাগাদে ঘাটতি, ক্রয় প্রক্রিয়ায় জটিলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের দুর্বলতা প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রধান অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় কাজের গুণগত মানও বজায় রাখা হয়নি।
আইএমইডি জানায়, মূল প্রকল্পটি জুলাই ২০১৮ থেকে জুন ২০২১ মেয়াদে শেষ হওয়ার কথা ছিল। এর পরে জুন ২০২৩, জুন ২০২৫ ও সবশেষ জুন ২০২৭ নাগাদ প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়। এই মেয়াদেও প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়া নিয়ে রয়েছে সংশয়। নতুন করে ফের মেয়াদ বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে।
প্রকল্পের মোট ব্যয় ৬০৪ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। মূল কাজ ১৮ দশমিক ৫৫ কিলোমিটার সড়ক, ৯টি সেতু, ১৩টি কালভার্ট নির্মাণসহ সড়কের রক্ষণাবেক্ষণ কাজ করা। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ)।
তবে সওজ দাবি করেছে, প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণে কিছু সমস্যা ছিল। সেটা দূর করে নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ হবে।
আমরা আইএমইডির সুপারিশ মেনেই কাজ করছি। প্রকল্পের মেয়াদ জুন ২০২৭ নাগাদ আছে। আশা করছি এই মেয়াদে কাজ হয়ে যাবে। ভূমি অধিগ্রহণসহ কিছু সমস্যা আছে, এগুলো কাটিয়ে ঠিক সময়ে কাজ হয়ে যাবে।-সওজের প্রধান প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামান
আইএমইডি প্রতিবেদন প্রসঙ্গে সওজের প্রধান প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘আমরা আইএমইডির সুপারিশ মেনেই কাজ করছি। প্রকল্পের মেয়াদ জুন ২০২৭ নাগাদ আছে। আশা করছি এই মেয়াদে কাজ হয়ে যাবে। ভূমি অধিগ্রহণসহ কিছু সমস্যা আছে, এগুলো কাটিয়ে ঠিক সময়ে কাজ হয়ে যাবে।’
প্রকল্পের সঠিক ফিজিবিলিটি স্টাডি হয়নি? এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করলে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি প্রধান প্রকৌশলী।
প্রকল্পটি যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ
সওজ জানায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর থেকে ঢাকা বা অন্য কোনো শহরে যাতায়াতে কুমিল্লার মুরাদনগর অথবা পার্শ্ববর্তী বাঞ্ছারামপুর ঘুরে নারায়ণগঞ্জের ভুলতা-ধনবাড়িয়া হয়ে যেতে হয়। এতে ঘুরতে হয় ৫০-৬০ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ। আবার নবীনগর থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরে যাতায়াতে স্পিডবোট বা পার্শ্ববর্তী কুমিল্লা জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে যেতে হয়।
মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে আশুগঞ্জ থেকে নবীনগর পর্যন্ত ১৮ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সরকার। তবে ২০১৮ সালে নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার পর থেকে দেখা দেয় নানা জটিলতা। প্রকল্প প্রস্তাবের ত্রুটির কারণে সংশোধন করতে হয়। এরপর থেকে ঠিকাদারের গাফিলতিতে সময় পার হওয়ার পর সড়কটির নির্মাণকাজে এখন বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভূমি অধিগ্রহণ।
গত সাত বছরে প্রকল্পের মেয়াদ তিন দফা বাড়ানো হলেও মাত্র নয় কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ শেষ করতে পেরেছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ)। জেলার দুই উপজেলার মধ্যে সড়কটি সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করা ছাড়াও ঢাকার সঙ্গে নবীনগরের যোগাযোগ সহজ করবে। ৫০-৬০ কিলোমিটার পথ ঘুরে কুমিল্লা হয়ে আর ঢাকা যেতে হবে না তাদের।
প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য নবীনগর থেকে আশুগঞ্জ পর্যন্ত নতুন সড়ক নির্মাণের মাধ্যমে আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ে নিরাপদ সড়ক সংযোগ স্থাপন, আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা।
আইএমইডি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, প্রকল্পের প্রধান অবকাঠামো কার্যক্রমের মধ্যে সড়ক বাঁধ প্রশস্তকরণ কাজের অগ্রগতি ৯৯ দশমিক ২৮ শতাংশ এবং সেতু নির্মাণ প্রায় ৯০ শতাংশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন হয়েছে। তবে ফ্লেক্সিবল পেভমেন্টে বেজ ও সাব-বেজ পর্যায়ের কাজ সম্পন্নের (নতুন নির্মাণ ৯২ শতাংশ, সড়ক প্রশস্তকরণ ৯৯ শতাংশ ও মজবুতীকরণ শতভাগ) দিকে অগ্রসর হলেও সার্ফেসিং/চূড়ান্ত পেভমেন্টে অগ্রগতি মাত্র ১৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ। সার্ফেসিংয়ে সীমিত অগ্রগতির অর্থ হলো রাস্তার ওপরের স্তরের কাজ এখনো অসম্পূর্ণ। কালভার্ট নির্মাণেও মাঝারি অগ্রগতি হয়েছে।
তবে ড্রেনেজ ব্যবস্থা ৩৬ দশমিক ৪০ শতাংশ, সড়ক রক্ষার কাজ (সিসি ব্লক) ৫১ দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং সড়ক নিরাপত্তা উপাদান তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে রয়েছে, যা ভবিষ্যতে সড়কের স্থায়িত্ব, পানি নিষ্কাশন ও নিরাপদ ব্যবহারে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রধান সীমাবদ্ধতা হলো ভূমি অধিগ্রহণে বিলম্ব। এখন পর্যন্ত ৫৭ দশমিক ৭১ শতাংশ ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে, যা বর্তমানে প্রকল্পের প্রধান বাধা হিসেবে কাজ করছে। মূল প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণের পরিমাণ যথাযথভাবে নির্ণয় না করায় পরবর্তীসময়ে সংশোধিত প্রকল্পে সেটা ব্যয় দ্বিগুণ ও পরিমাণ বেড়েছে।
আইএমইডি জানায়, প্রকল্পের কাজে ডিপিপির নির্দেশনা অমান্য করে নির্মাণকাজে ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। সড়কের উভয় পাশে হার্ড শোল্ডারসহ ক্যারেজওয়ের মোট প্রস্থ স্ট্যান্ডার্ড চেইন টেপ দিয়ে পরিমাপ করে ৭ দশমিক ৩৫ মিটার পাওয়া গেছে, যেখানে অনুমোদিত ডিজাইন অনুযায়ী প্রস্থ ৭ দশমিক ৩০ মিটার।
আইএমইডি হলো ওয়াচ ডগ, যা দেখছে তার প্রতিবেদন করছে। প্রকল্পের ডিপিপি বাস্তবায়নে ব্যত্যয় আমরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে পাঠিয়েছি। আএমইডি সুপারিশ আকারে প্রতিবেদনগুলো মন্ত্রণালয়ে পাঠায়।-আইএমইডির প্রশাসন অনুবিভাগের প্রধান রিপন চাকমা
নির্মিত স্তরের পুরুত্ব প্রায় ২৫০ মিলিমিটার পাওয়া যায়, যা অনুমোদিত ২০০ মিলিমিটারের স্পেসিফিকেশনের তুলনায় ৫০ মিলিমিটার কম। কিশোরপুর ব্রিজ এলাকায় মোটরসাইকেল, অটোরিকশা ও পথচারীসহ মিশ্র যান চলাচল দেখা যায়। সিসি ব্লক ব্যবহারের পরও কিছু স্থানে ব্রিজ ও অ্যাপ্রোচ রোডের সংযোগস্থলে মাটির ক্ষয় দেখা গেছে।
আইএমইডির সরেজমিনে পরিদর্শন প্রতিবেদন বলছে, কালভার্ট কাঠামো মজবুত ও স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। কোথাও ফাটল, বিকৃতি, বসে যাওয়া বা কাঠামোগত ক্ষতির চিহ্ন পাওয়া যায়নি। কোনো ধরনের ব্লকেজ, পলি জমা বা জলাবদ্ধতাও দেখা যায়নি। বৃষ্টির পানি উচ্চ বেগে প্রবাহিত হয়ে ড্রেনের প্রান্তে মাটি অপসারণ করে ‘ভাঙন/মাটি ক্ষয়’ সৃষ্টি করতে পারে।
বাধ্যতামূলক ‘৪০ কিমি গতিসীমা’ নির্দেশক সাইনবোর্ডটি অপেশাদার বা হাতে লেখা মনে হয়, যা হাইওয়ে মানদণ্ডের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিটুমিনাস সারফেস ভালো অবস্থায় রয়েছে; রাইডিং কোয়ালিটি মসৃণ ও সন্তোষজনক। যন্ত্রপাতির বিন্যাস ও ব্যবস্থাপনা দুর্বল, টেস্টিং এরিয়াগুলোর যথাযথ বিভাজন নেই এবং বিদ্যুৎ ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত কিছু ঝুঁকি বিদ্যমান।
প্রকল্পটি নিয়ে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতি বছর পরিচালন বাজেটের আওতায় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিভুক্ত (এডিপি) চলমান প্রকল্পের নিবিড় পরিবীক্ষণে এমন ত্রুটি ধরা পড়েছে।
আইএমইডি প্রতিবেদন প্রসঙ্গে সংস্থাটির প্রশাসন অনুবিভাগের প্রধান রিপন চাকমা জাগো নিউজকে বলেন, ‘আইএমইডি হলো ওয়াচ ডগ, যা দেখছে তার প্রতিবেদন করছে। প্রকল্পের ডিপিপি বাস্তবায়নে ব্যত্যয় আমরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে পাঠিয়েছি। আএমইডি সুপারিশ আকারে প্রতিবেদনগুলো মন্ত্রণালয়ে পাঠায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বলি প্রকল্পের ডিপিপিতে এই ছিল আর এটা আছে। প্রকল্পের ডিপিপি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন না হলে আমরা কনসার্ন মন্ত্রণালয়কে অবগত করি। তবে অন্যায় করলে সেই শাস্তি আমরা দিতে পারি না। আমরা জনপ্রশাসন সচিবের কাছে পিডি বা সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করি।’ জাগো নিউজ
