BD SYLHET NEWS
সিলেটবৃহস্পতিবার, ২৩শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, বিকাল ৫:০৬
আজকের সর্বশেষ সবখবর

নজরুল ইসলাম জামায়াত থেকে বহিষ্কার


জুলাই ২৩, ২০২৬ ১২:৫৮ অপরাহ্ণ
Link Copied!

ব্যক্তিগত ভিডিও ভাইরালের প্রেক্ষাপটে নৈতিক স্খলনের প্রমাণ পেয়ে জামায়াতে ইসলামীর সব পদ থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) গাজী মো. নজরুল ইসলামকে। এখন তাঁর সংসদ সদস্যপদ বাতিল হবে কিনা– সে প্রশ্ন উঠেছে।

গণপ্রতিনিধি আদেশ-১৯৭২ এর ১২(খ) অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি এমপি নির্বাচিত হতে বা পদে থাকতে পারবেন না, যদি তিনি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল মনোনীত না হন অথবা স্বতন্ত্র প্রার্থী না হন।

সামাজিক মাধ্যমে ব্যক্তিগত ভিডিও ভাইরালের পর গতকাল বুধবার গাজী নজরুলকে দল থেকে বহিষ্কার করে জামায়াত। দলের আমির শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়।

পাশাপাশি নজরুলের সংসদ সদস্যপদ বাতিলে নির্বাচন কমিশনে চিঠি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ। বহিষ্কার ও এমপি পদ বিতর্কে গাজী নজরুলের সঙ্গে কথা বলতে পারেনি সমকাল। মঙ্গলবার থেকে তাঁর ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।

তিনবারের এমপি গাজী নজরুল জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্য ছিলেন। তাঁকে জামায়াতের রুকন (সদস্য), কেন্দ্রীয় শূরাসহ সব পদ থেকে স্থায়ী বহিষ্কার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন দলটির নেতারা। তাঁর বহিষ্কারের খবরে গতকাল সাতক্ষীরার আশাশুনি-শ্যামনগরে উল্লাস করেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। এর আগে তারা গাজী নজরুলকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে বিচারের দাবিতে মিছিল করেছিলেন। এদিকে গাজী নজরুলের বিরুদ্ধে তাঁর ভাড়া করা গাড়ির চালক ওবায়দুল্লাহ হত্যাচেষ্টা মামলা করেছেন।

গত সোমবার রাতে ৭৫ বছর বয়সী গাজী নজরুলের একটি ব্যক্তিগত ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়। এতে সমালোচনার ঝড় ওঠে। ভিডিওতে থাকা তরুণীকে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী বলে দাবি করেছেন তিনি। মরিয়াম বেগম নামে ওই তরুণীও দাবি করেন, ১৭ জুন গাজী নজরুলের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়েছে। তরুণীর বাবা মাসুম বিল্লাহ এবং গাজী নজরুলের প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলাম একই কথা জানান। তবে সমালোচনা থামেনি।

তদন্তে নৈতিক স্খলনের প্রমাণ
ওই ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে আসার পর সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের নেতাদের নিয়ে গঠিত দলীয় তদন্ত কমিটি কথা বলে গাজী নজরুলের সঙ্গে। বিয়ের তথ্য গোপনের যে ব্যাখ্যা তিনি দেন, তা গ্রহণ করে জামায়াত। কমিটি সূত্র এবং জামায়াতের জ্যেষ্ঠ নেতারা সমকালকে এ তথ্য জানিয়েছেন।

সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ সমকালকে বলেন, তদন্তে গাজী নজরুলের বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। ইসলাম ধর্মে গোপনে বিয়ে করা সমর্থনযোগ্য নয়। বিয়ে করে তা প্রকাশ করে ঘোষণা দেওয়া সুন্নত।

ভিডিও ভাইরালের পর গত মঙ্গলবার ব্যাপক সমালোচনার মুখে তদন্ত শুরু করে জামায়াত। কমিটি গাজী নজরুলের কাছে জানতে চায়, তিনি আদৌ বিয়ে করেছেন কিনা? বিয়ে করলে গোপন রেখেছিলেন কেন? বিবাহিত স্ত্রীকে নিয়ে সংসদ সদস্য হিসেবে পাওয়া বাসায় বা নিজ বাসভবনে না গিয়ে সামাজিক মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য নয়, এমন জায়গায় কেন গিয়েছিলেন?

গাজী নজরুল তাঁর প্রথম স্ত্রী, দ্বিতীয় স্ত্রী, দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবা এবং সাক্ষীর মাধ্যমে বিয়ে হওয়ার প্রমাণ দেন। কেন ১৭ জুন বিয়ে করে এক মাসের বেশি সময় পর নিবন্ধন করেছেন– এই ব্যাখ্যাও দেন। কিন্তু কী কারণে দ্বিতীয় বিয়ে গোপন রেখেছিলেন– এর সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।

জামায়াতের গঠনতন্ত্রের ৬২(২খ) ধারা অনুযায়ী, দলের কোনো রুকনের (সদস্য) কোনো কাজে জামায়াতের নৈতিক প্রভাব ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা মর্যাদা ক্ষুণ্ন হলে তাঁকে বহিষ্কার করা যাবে। ৬৩(৩) ধারা অনুযায়ী, জেলা বা মহানগর আমির সংশ্লিষ্ট শাখার মহানগরী মজলিসে শূরার সিদ্ধান্তসহ তা জামায়াতের কেন্দ্রীয় আমিরকে জানাবেন। আমির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের পরামর্শে বহিষ্কার করতে পারবেন। এ মতামতে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়।

এমপি পদ বাতিল হবে কি
২০০৮ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে এমপি পদে থাকতে দলের মনোনীত হওয়ার শর্ত যোগ করা হয়। এই বিধান কার্যকরের পর ২০১২ সালে সাতক্ষীরা-৪ আসনের এমপি এইচএম গোলাম রেজা জাতীয় পার্টি থেকে বহিষ্কার হয়েও পদে বহাল থাকেন বিষয়টি নিষ্পত্তিতে তৎকালীন স্পিকার নির্বাচন কমিশনকে চিঠি না দেওয়ায়।

দল থেকে বহিষ্কৃত আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর এমপি পদ বাতিলে এই আইনে ২০১৫ সালে আওয়ামী লীগ নির্বাচন কমিশনে গেলে শুনানির আগেই তিনি পদত্যাগ করেন। ফলে কোনো এমপি দল থেকে বহিষ্কার হলে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ১২(খ) অনুযায়ী পদ বাতিল হবে কিনা– এ সংক্রান্ত রায় আসেনি।

২০১৪ সালে বহিষ্কৃত লতিফ সিদ্দিকীর এমপি পদ বাতিলে ওই বছরই স্পিকারকে চিঠি দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দেন তৎকালীন স্পিকার শিরীন শারমিন। এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে যান লতিফ সিদ্দিকী। তবে হাইকোর্টের পর আপিল বিভাগও তাঁর রিট খারিজ করে দেন।

২০১৫ সালের ২৩ আগস্ট নির্বাচন কমিশনে শুনানি শুরু হয়। এতে আওয়ামী লীগকে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন আইনজীবী এবিএম রিয়াজুল কবীর কাওছার। তিনি সমকালকে বলেন, দল বহিষ্কার করলে এমপি পদ থাকবে না। কারণ আইন অনুযায়ী এমপি দুই রকম; দলীয় ও স্বতন্ত্র। দল বহিষ্কার করলে সেই এমপি স্বতন্ত্র হয়ে যান না। ফলে দলে না থাকলে এমপি পদ থাকবে না।

রিয়াজুল কবীর সমকালকে জানান, ২০১৫ সালের ২৩ আগস্ট প্রথম দিনের শুনানিতে লতিফ সিদ্দিকী সময় প্রার্থনা করেন। পরে তিনি নিজেই পদত্যাগ করেন। ফলে কোনো রায় বা আদেশ আসেনি।

গাজী নজরুলের বিষয়ে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। গতকাল সচিব আখতার আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, এখনও নোটিশ আসেনি। এলে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে কমিশন।

সংবিধান কী বলে
দল কোনো এমপিকে বহিষ্কার করলে কী হবে– তা সংবিধানে বলা নেই। ৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো এমপি দল থেকে পদত্যাগ করলে বা বিরুদ্ধে ভোট দিলে এমপি পদ বাতিল হবে।

৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো এমপির নৈতিক স্খলনের কারণে দুই বছরের বেশি সময়ের জন্য কারাদণ্ড হলে এমপি পদ বাতিল হবে। সাজার মেয়াদ শেষে পাঁচ বছর অতিক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত এমপি হতে পারবেন না।

জামায়াত নৈতিক স্খলনের কারণ দেখিয়ে গাজী নজরুলকে বহিষ্কার করেছে। তবে এ সিদ্ধান্ত আদালতের নয় বা গাজী নজরুলের জেল হয়নি। ফলে ৬৬ অনুচ্ছেদ তাঁর জন্য প্রযোজ্য নয়। তিনি দল থেকে পদত্যাগ করেননি বা দলের বিরুদ্ধেও ভোট দেননি। ফলে ৭০ অনুচ্ছেদও প্রযোজ্য নয়।

দলীয় এমপিদের চাপ
গাজী নজরুলকে নিজে থেকে পদত্যাগ করতে বলেছে জামায়াত। হামিদুর রহমান আযাদ সমকালকে বলেন, গাজী নজরুল এখন আর জামায়াতের কেউ নন। তিনি জামায়াতের এমপিও নন।

জামায়াতের নির্বাহী পরিষদের একাধিক সদস্য সমকালকে বলেছেন, পদত্যাগের নির্দেশনায় কিছু জানাননি গাজী নজরুল।

জামায়াতের একজন এমপি সমকালকে বলেছেন, সংসদীয় দলের কেউ গাজী নজরুলের পক্ষে নেই। সবার চাওয়া ছিল বহিষ্কার। নইলে সংসদের অধিবেশনে জামায়াতকে চরম বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হতো বিএনপির আক্রমণে। গাজী নজরুল যদি নিজে থেকে পদত্যাগ না করে আইনি লড়াই চালিয়ে যান, তাতে হয়তো তিনি কয়েক মাস বা বছরখানেক এমপি থাকবেন। তবে জামায়াতের এমপিদের সঙ্গে তিনি সংসদে বসতে পারবেন না।

আগের কী নজির
২০২১ সালে জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের পদ থেকে বহিষ্কার হলেও দলের প্রাথমিক সদস্য ছিলেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসান। তাঁর পদ বাতিল হয়নি।
সংবিধানের ৬৬(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘৭০ অনুচ্ছেদ অনুসারে কোনো এমপির আসন শূন্য হবে কিনা, সে সম্পর্কে কোনো বিতর্ক দেখা দিলে শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য প্রশ্নটি নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠানো হবে। কমিশনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে।’

সংসদ সদস্য আইন-১৯৮০ এর ৩ ধারা অনুযায়ী, ‘বিরোধ সৃষ্টির ৩০ দিনের মধ্যে স্পিকার বিরোধের বিবরণ প্রস্তুত করে শুনানির জন্য নির্বাচন কমিশনকে পাঠাবেন।’ জামায়াত নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দেওয়ার কথা জানিয়েছে। তবে এই বিধানগুলো ৭০ অনুচ্ছেদ-সংক্রান্ত।

১৯৯৮ সালে বিএনপির দুই এমপি হাসিবুর রহমান স্বপন এবং আলাউদ্দিন আহমদ নিজ দলে থেকে শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভায় যোগ দেন। স্পিকার একে ফ্লোর ক্রসিং হিসেবে গণ্য না করলেও আদালত একে দলত্যাগ হিসেবে গণ্য করে ওই দুই এমপির পদ বাতিল করেন।

বিএনপির এমপি আবু হেনা ২০০৪ সালে বহিষ্কার হয়েছিলেন। তৎকালীন স্পিকার মুহাম্মদ জমিরউদ্দিন সরকার তাঁর পদ বহাল রাখেন। তবে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধনের আগে এ ঘটনা ঘটেছিল।

জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শিশির মনির বলেছেন, দল থেকে বহিষ্কার হওয়ায় এমপি পদ থাকবে না।

কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।