১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনি লড়াইয়ের মাঠে উপস্থিত এক ঝাঁক নতুন মুখ। বিএনপি, এনসিপি, নানান ধারার বাম দলসহ সবখানেই তরুণ, নতুন মুখ। এমনকি দলগুলোর আদর্শ ও নির্বাচনি এজেন্ড নিয়ে যারা গণমাধ্যম, টকশো, পডকাস্ট করছেন তারাও তরুণ। তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে, বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রভাবিত করতে—তারা নিজেদের ভাবনার কথা বলছেন। তারা রাজনীতিকে ভিন্নভাবে দেখার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করছেন। কিন্তু সেখানে কি নতুন রাজনীতি আছে? আছে কোনও পরিকল্পনার কথা?
গত ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমান দেশে ফেরার মধ্য দিয়ে বিএনপির মধ্যে রাজনীতির ধারায় পরিবর্তনের সুর শোনা যাচ্ছে— মিছিল-মিটিং করে মানুষের হয়রানি না করা, কিংবা প্রতিশোধের রাজনীতি থেকে বের হয়ে আসা নানান নতুনত্ব নিয়ে কথা বলতে শোনা যাচ্ছে। নতুন মানুষ, নতুন প্রজন্ম বিভিন্ন সভা-সেমিনারে প্রতিনিধিত্ব যেমন করছে, তেমনই মনোনয়নেও এসেছে নতুন প্রজন্মের অনেক নাম। কেবলই কি নতুন কিছু মুখ, নাকি এদের মধ্যে নতুন রাজনীতিরও আভাস মেলে। বিশ্লেষকরা বলছেন, আসনের ভাগ-বাটোয়ারা কী করে নতুন রাজনীতি হয়। এই তরুণেরা জানেন, আগের রাজনীতি দিয়ে তারা ভোটার টানতে পারবেন না। তারপরও নতুন রাজনীতি তারা স্পষ্ট করে দেখাতে পারছেন না। তরুণ কিছু প্রার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মানুষের মধ্যে পুরোনো রাজনীতির পদ্ধতি কৌশল রয়ে গেছে, তাই আমূল বদলে ফেলতে তারা পারছেন না।
একসময় রাজপথে কোটা সংস্কারের দাবিতে সরব হয়েছিলেন যারা, এখন তাদের একটি অংশ সরাসরি নির্বাচনি রাজনীতিতে সক্রিয়। ছাত্র আন্দোলন থেকে উঠে আসা এসব তরুণ নেতার নির্বাচনি মাঠে নামা দেশের রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, এটা আন্দোলনের স্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিণতি। ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ছাত্র ও নাগরিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের অনেকেই তখন নিজেদের ‘অরাজনৈতিক’ দাবি করেছিলেন। সময়ের ব্যবধানে তাদের কেউ কেউ রাজনৈতিক দল গঠন, কেউবা নতুন বা প্রচলিত দলে যুক্ত হয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আন্দোলন থেকে নির্বাচনে আসা অস্বাভাবিক নয়। ইতিহাসে বহু রাজনৈতিক নেতৃত্বই গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে। অপেক্ষাকৃত তরুণ দল এনসিপির সব নেতাই তরুণ। ফলে যে ২৭ জনের প্রার্থিতা ঘোষিত হয়েছে, প্রত্যেকে তরুণ ও নতুন রাজনীতির কথা বলেই এগিয়ে এসেছেন নেতৃত্ব দিতে। তবে সেখানেও নতুন কিছু মিলছে না দাবি করে বিতার্কিক আব্দুন নূর তুষার বলেন, ‘‘আমি তাদের মধ্যে কোনও নতুন রাজনীতি দেখি না। ভেবেছিলাম, নতুন দলের মধ্য দিয়ে আমরা নতুন পরিকল্পনা পাবো। কিন্তু সব তো আগের মতোই। নতুন রাজনীতি দেখতে চেয়েছিলাম, কিন্তু পেলাম না। যদি কোনও দল কম আসন নিয়ে বড় দলের সঙ্গে জোট করে, তাহলে শুরুতেই তো তারা বুঝিয়ে দিলো, ভোটে জিতলে তারা পলিসি বদলের জায়গায় থাকবে না। সংসদের আসন ভাগবাটোয়ারাই যদি লক্ষ্য হবে, তাহলে এটা কি নতুন বন্দোবস্ত নাকি। বাংলাদেশ বদলে দেওয়ার যে কথা তারা বলেছিল, সেই সুযোগ তাদের থাকলো না ‘’
বিএনপি বলতে একসময় বড় বড় নেতা এম সাইফুর রহমান, তরিকুল ইসলাম, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, সাদেক হোসেন খোকা, আ স ম হান্নান শাহর নাম সামনে আসতো, যারা দলের প্রতিষ্ঠাতা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা ছিলেন। এখন রাজনীতিতে এসেছেন তাদের সন্তানেরা।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) অনেক ক্ষেত্রে দলের বড় নেতাদের সন্তান বা উত্তরাধিকারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে। বর্তমান সময়ে রাজনীতিতে সক্রিয় আবদুল্লাহ আল নোমানের ছেলে সাইয়েদ আল নোমান (চট্টগ্রাম-১০), কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা মীর মোহাম্মদ নাসির উদ্দিনের ছেলে মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন (চট্টগ্রাম-৫), সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী (চট্টগ্রাম-৭), ফজলুর রহমান পটলের মেয়ে ফারজানা শারমীন পুতুল (নাটোর-১) আসনে প্রার্থী হয়েছেন। তাদের পাশাপাশি মির্জা ফখরুল ইসলামের মেয়ে শামারুহ নিজে না লড়লেও নির্বাচনি মাঠে তার বিচরণ আছে। এছাড়া আছেন চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফের মেয়ে চৌধুরী নায়াব ইউসুফ, জাফরুল ইসলাম চৌধুরীর ছেলে মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী (পাপ্পা), হারুনার রশিদ খান মুন্নুর মেয়ে অফরোজা খানম রিতা রাজনীতিতে সরব অবস্থান নিয়ে লড়ে যাচ্ছেন। বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ভোটের মাঠে নেই রুমিন ফারহানা। তবে বিষয়টি একটু ব্যাখ্যার দাবি রাখে।
গত ১৫ বছর ধরে বিএনপির পক্ষে সক্রিয় নেত্রী রুমিন ফারহানাকে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। সংশ্লিষ্ট আসনে বিএনপি জোটগত সমঝোতার কারণে অন্য দলকে ছাড় দেওয়ায় তিনি দলীয় প্রার্থী হতে পারেননি। তিনি অলি আহাদের মেয়ে, যিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত রাজনীতিক, ভাষা আন্দোলনের অন্যতম কর্মী ও সংগ্রামী ব্যক্তিত্ব।
এদিকে ডা. তাসনিম জারাও এনসিপি থেকে বেরিয়ে গিয়ে স্বতন্ত্র নির্বাচনের ঘোষণা দিয়ে মাঠে নেমেছেন। কোটা সংস্কার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা নেতা নুরুল হক নূর পটুয়াখালী থেকে বিএনপির সমর্থিত প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করছেন নিজ প্রতীকে। গণসংহতি আন্দোলন বেশ কয়েকজন তরুণকে মনোনয়ন দিয়েছে। তারা দাবি করছেন, জুলাই সনদের অঙ্গীকারকে রক্ষা করে ২৮ শতাংশ নারী প্রার্থী নিশ্চিত করেছেন তারা। নাটোর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, টাঙ্গাইলে তরুণ নেতৃত্ব সবাইকে বিস্মিত করেছে।
বাসদের (মার্কসবাদী) মনোনীত মার্কায় ৩৩ জন প্রার্থীর মধ্যে ১০ জন নারী এবং তাদের মধ্যেও পাঁচ জন তরুণ। ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, রংপুর, নোয়াখালীতে তারা অনানুষ্ঠানিক জনসংযোগ করছেন এবং ব্যাপক সাড়া পাচ্ছেন বলেও দাবি করেছেন।
তরুণদের প্রতি মানুষের ব্যাপক প্রত্যাশা থাকায় প্রার্থীরা চাপ বোধ করছেন কিনা, প্রশ্নে ডাকসুর সাবেক ভিপি ও বর্তমানে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী নুরুল হক নূর বলেন, ‘‘দুই ধরনের চাপ উপস্থিত আছে। মানুষের প্রত্যাশা হলো, তারা আগামী দিনের রাজনীতিতে পরিবর্তন চায়, আমাদের মাধ্যমে সেটার বাস্তবায়ন দেখতে চান। আমরা কতটুকু পারবো সেই চাপ আছে। আরেকটি হলো, পুরোনো রাজনৈতিক বন্দাবস্তের চাপ।’’ নির্বাচনে কালো টাকার আধিপত্য রয়ে গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘‘মানুষের মানসিকতায়ও সেসব রয়ে গেছে। আমরা সেটার সঙ্গে কতটা পেরে উঠবো, সেই চাপ আছে।’’
রাজনীতি নষ্ট হয়ে গেছে উল্লেখ করে সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘‘রাজনীতি ব্যবসাতে পরিণত হয়েছে। এটা আর জনকল্যাণমূলক নেই, ব্যক্তি কল্যাণের হাতিয়ার হয়েছে। আমি সেখান থেকে পরিবর্তনের কোনও লক্ষণ দেখি না। কারণ, জুলাই অভ্যুত্থানের পর যে আকাঙ্ক্ষা জন্ম নিয়েছিল, তা বাস্তবায়ন হয়নি। দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তন, সংস্কার—এসবে তারা একদমই আগ্রহী না। ফলে সব কিছু আবারও পেছনের দিকে, আগের রাজনীতিতে ফিরে যাচ্ছে, সব পুরোনো মনে হচ্ছে।’’
কেবল তরুণ মুখই আছে, রাজনীতি ওই একই জায়গায় আছে উল্লেখ করে সাংবাদিক মাসুদ কামাল বলেন, ‘‘কেবল মুখেই নতুন বন্দোবস্ত শুনলাম। গালিগালাজ ছাড়া নতুন কিছু পেলাম না। তারা নতুন বন্দোবস্ত দিয়ে কী বুঝাতে চান, তা কী স্পষ্ট করতে পেরেছেন? রাজনীতি আগেরটাই আছে বলেই নির্বাচনে আসতে তারা পুরোনো দলে ভিড়তে গেছে। যারা নতুন রাজনীতির কথা বলছে, তারা যে সময়টাতে বড় হয়েছে, এসময়ে তারা নতুন রাজনীতির কিছু দেখেনি, ফলে রাজনীতিতে তাদের নতুন কিছু যোগ করার নেই। ফলে যা হচ্ছে তা পুরোনো ধারারই রাজনীতি।’’
