BD SYLHET NEWS
সিলেটশনিবার, ২৭শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, বিকাল ৪:৩৬
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ইউছুফ (আ.)-এর জীবনের অবিস্বরণীয় কিছু শিক্ষা


জুন ২৭, ২০২৬ ২:৫৭ অপরাহ্ণ
Link Copied!

মানবজীবনে পরিবারই হলো ভালোবাসা, নিরাপত্তা, পরিচয় ও মূল্যবোধের প্রথম বিদ্যালয়। একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠন, নৈতিক বিকাশ এবং মানসিক প্রশান্তির মূল ভিত্তি গড়ে ওঠে পরিবারকে কেন্দ্র করে।

কিন্তু কখনো কখনো পারিবারিক সংকট, ঈর্ষা, বিচ্ছেদ, দারিদ্র্য কিংবা ভৌগোলিক স্থানান্তরের কারণে এই বন্ধন কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়। পবিত্র কোরআনের সুরা ইউসুফ শুধু একজন নবীর জীবনের ইতিহাস নয়; এটি একটি পরিবারের উত্থান-পতন, বিচ্ছেদ ও পুনর্মিলনের জীবন্ত দলিল।

ইউসুফ (আ.)-এর কাহিনী শুরু হয় পরিবারের উষ্ণ পরিবেশে। একবার তিনি একটি সুন্দর স্বপ্ন দেখেন। তারপর তিনি নিজের স্বপ্ন অন্য কারও কাছে নয়, বরং প্রিয় পিতা ইয়াকুব (আ.)-এর কাছেই ব্যক্ত করেন। ‘যখন ইউসুফ তাঁর পিতাকে বললেন, ‘হে আমার পিতা!……।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৪)

ইউছুফ (আ.) একটি সুন্দর স্বপ্ন দেখা মাত্র পরিবারের স্বরণাপন্ন হন। কেননা সন্তানের প্রথম ভরসার স্থান হলো পরিবার। সে তার আনন্দ, দুঃখ, স্বপ্ন ও আশঙ্কা সবচেয়ে আগে পরিবারের কাছেই প্রকাশ করতে চায়। ইয়াকুব (আ.) শুধু স্বপ্নের ব্যাখ্যাই দেননি; একজন আদর্শ পিতার মতো সন্তানের নিরাপত্তার কথাও ভেবেছেন। তিনি উপদেশ দিয়ে বললেন, ‘হে আমার সন্তান! তোমার স্বপ্ন তোমার ভাইদের কাছে বলো না।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৫)

তাই যেকোনো বিষয়ে সন্তানের আবেগ, প্রতিভা ও ভবিষ্যৎ রক্ষায় সচেতন অভিভাবকের ভূমিকা অপরিসীম।

ঈর্ষা—পরিবার ভাঙনের সূচনা

যে পরিবার ভালোবাসার কেন্দ্র হওয়ার কথা, সেই পরিবারেই যখন ঈর্ষা ও হিংসা স্থান করে নেয়, তখন সম্পর্কের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। ইউসুফ (আ.)-এর ভায়েরা তাঁর এই সুন্দর স্বপ্নের কথা শোনে তাদের অন্তরে জন্ম নেওয়া ঈর্ষা তাদের এমন এক সিদ্ধান্তে পৌঁছে দেয়, যা পুরো পরিবারের জন্য দীর্ঘ বিচ্ছেদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কোরআনের ভাষায় ‘ইউসুফকে হত্যা করো অথবা তাকে কোনো দূর দেশে ফেলে আসো।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৯)

এটি শুধু ভাইদের ষড়যন্ত্র ছিল না; এটি ছিল পারিবারিক ঐক্যের ভয়াবহ ভাঙন। এখান থেকেই শুরু হয় ইউসুফ (আ.)-এর দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতার পথ। আজও অসংখ্য পরিবার হিংসা, অহংকার, সম্পদের লোভ কিংবা ভুল বোঝাবুঝির কারণে ভেঙে যাচ্ছে। সুরা ইউসুফ আমাদের শেখায়—পারিবারিক সংকটের সূচনা বাইরে থেকে নয়, অনেক সময় পরিবারের ভেতর থেকেই হয়।

সংকটের মাঝেও আল্লাহ নতুন পথ খুলে দেন
ভাইদের ষড়যন্ত্রে কূপে নিক্ষিপ্ত হওয়ার পর ইউসুফ (আ.) মিশরে বিক্রি হন। বাহ্যিকভাবে এটি ছিল জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়। কিন্তু আল্লাহ সেই সংকটকেই তাঁর জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার বানিয়ে দেন। নির্দেশ দেয়া হলো, ‘তাঁর থাকার ব্যবস্থা সম্মানজনকভাবে করো।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ২১)

ধৈর্য—সংকট মোকাবিলার সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তি
ইয়াকুব (আ.)-এর জীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল ধৈর্য। তিনি বললেন, ‘অতএব, উত্তম ধৈর্যই আমার অবলম্বন।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ১৮)

বহু বছর ধরে সন্তানহারা থাকার পরও তিনি আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হননি। ফলে আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ আসে, ‘আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৮৭)

এই শিক্ষা আজও প্রতিটি ভেঙে পড়া পরিবারের জন্য আশার আলো। যত বড় সংকটই আসুক, আল্লাহর প্রতি আস্থা ও ধৈর্য পরিবারকে টিকিয়ে রাখতে পারে।

অর্থনৈতিক সংকট ও পারিবারিক স্থানান্তর
দুর্ভিক্ষের সময় ইউসুফ (আ.)-এর ভাইদের খাদ্যের সন্ধানে বারবার মিশরে যেতে হয়েছিল। এখানে আমরা দেখি, মানুষের অভিবাসনের পেছনে শুধু রাজনৈতিক বা ধর্মীয় কারণ নয়, জীবিকা ও খাদ্য নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ জীবিকার সন্ধানে নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে পাড়ি জমায়। সুরা ইউসুফ সেই বাস্তবতার এক প্রাচীন কিন্তু চিরন্তন উদাহরণ।

দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর আল্লাহ ইউসুফ (আ.)-কে তাঁর পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলিত করেন। কোরআনের ভাষায়, ‘যখন তারা ইউসুফের কাছে প্রবেশ করল, তিনি তাঁর পিতা-মাতাকে নিজের কাছে স্থান দিলেন। (তারপর) তিনি তাঁর পিতা-মাতাকে সম্মানের আসনে বসালেন।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৯৯-১০০)
ইউসুফ (আ.) প্রতিশোধ নেননি; বরং ক্ষমা করেছেন। আর তাঁর সেই ক্ষমা, উদারতা ও ভালোবাসাই শেষ পর্যন্ত ভেঙে যাওয়া পরিবারকে আবার একত্রিত করেছিল।

ইউসুফ (আ.)-এর কাহিনী প্রতিটি পরিবারের জন্য এক অনন্ত আলোকবর্তিকা। এখানে রয়েছে সন্তানের প্রতি পিতার ভালোবাসা, ভাইদের ঈর্ষার পরিণতি, বিচ্ছেদের বেদনা, ধৈর্যের সৌন্দর্য, আল্লাহর অদৃশ্য পরিকল্পনা এবং ক্ষমার মাধ্যমে পুনর্মিলনের মহান শিক্ষা। এই কাহিনী আমাদের জানিয়ে দেয়—পরিবার কখনো নিখুঁত হয় না; কিন্তু ঈমান, ধৈর্য, ক্ষমা এবং আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা থাকলে সবচেয়ে ভেঙে পড়া পরিবারও আবার নতুন করে গড়ে উঠতে পারে। তাই সুখী, স্থিতিশীল ও কল্যাণময় পরিবার গঠনের জন্য সুরা ইউসুফ এক চিরন্তন কোরআনিক দিকনির্দেশনা, যা যুগে যুগে মানবজাতিকে আলো দেখিয়ে যাবে।

কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।