আল্লাহ তাআলা ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি হিসেবে হজকে ফরজ করেছেন। সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য জীবনে একবার হজ পালন করা আবশ্যক। হজ এমন একটি ইবাদত, যা ঈমান, আমল, ত্যাগ, ধৈর্য, অর্থব্যয় ও আত্মসমর্পণের অপূর্ব সমন্বয়। কিন্তু পৃথিবীর সব মুসলমানের পক্ষে প্রতি বছর হজে যাওয়া সম্ভব হয় না। আল্লাহ তাআলার অসীম দয়া ও অনুগ্রহ হলো— তিনি কিছু নেক আমলকে এমন মর্যাদা দিয়েছেন, যার মাধ্যমে বান্দা হজ বা উমরার সমপরিমাণ সওয়াব লাভ করতে পারে। অবশ্যই এসব আমল হজের বিকল্প নয়; বরং সওয়াব ও মর্যাদার দিক থেকে হজের সমতুল্য প্রতিদান লাভের সুসংবাদ।
এক. জামাতের সঙ্গে ফজর আদায় করে সূর্যোদয় পর্যন্ত জিকির করা
রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জামাতের সঙ্গে ফজরের সালাত আদায় করল, তারপর সূর্যোদয় পর্যন্ত বসে আল্লাহর জিকির করল এবং অতঃপর দুই রাকাত সালাত আদায় করল, সে একটি পূর্ণ হজ ও উমরার সওয়াব পাবে।’ অতঃপর তিনি তিনবার বললেন, ‘পূর্ণ, পূর্ণ, পূর্ণ।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৫৮৬)
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, ফজরের পর জিকির, তিলাওয়াত ও ইবাদতে সময় কাটিয়ে ইশরাকের দুই রাকাত নামাজ আদায় করলে আল্লাহ তাআলা হজ ও উমরার সমপরিমাণ সওয়াব দান করেন।
দুই. মসজিদে গিয়ে ফরজ ইলম শিক্ষা করা বা শিক্ষা দেওয়া
রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মসজিদে আসে শুধুমাত্র কল্যাণকর জ্ঞান শিক্ষা করার জন্য অথবা শিক্ষা দেওয়ার জন্য, তার জন্য একটি পূর্ণ হজ আদায়কারীর সমপরিমাণ সওয়াব রয়েছে।’ (তাবারানি, হাদিস : ৭৪৭৩)
ইসলামে জ্ঞান অর্জনের গুরুত্ব অপরিসীম। দ্বীনি জ্ঞান শিক্ষা করা এবং অন্যকে শিক্ষা দেওয়া এতই মর্যাদাপূর্ণ যে এর জন্য হজের সমপরিমাণ প্রতিদানের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
তিন. পিতা-মাতার সেবা করা
এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সা.-এর কাছে এসে জিহাদে অংশগ্রহণের আগ্রহ প্রকাশ করেন। নবীজি সা. তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার মা-বাবা জীবিত আছেন?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ।’ তখন রাসুল সা. বললেন, ‘তাহলে তাদের সেবাতেই সচেষ্ট হও।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৯৭২)
অন্য বর্ণনায় এসেছে, একজন সাহাবি হজে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলে তাকে মায়ের সেবার প্রতি উৎসাহিত করে বলা হয় যে, মায়ের সেবা অনেক বড় নেকির কাজ। পিতা-মাতার সন্তুষ্টি অর্জন আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের অন্যতম মাধ্যম।
চার. নারীদের জন্য উত্তমভাবে ঘর-সংসার পরিচালনা
নারীদের জন্য হজ ও জিহাদের সমতুল্য মর্যাদাসম্পন্ন আমলের কথা হাদিসে উল্লেখ রয়েছে। রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘নারীর উত্তম জিহাদ হলো কবুল হজ।’ (বুখারি, হাদিস : ১৫২০)
অন্যদিকে স্বামীর আনুগত্য, সন্তান লালন-পালন এবং ইসলামি বিধান অনুযায়ী সংসার পরিচালনার মাধ্যমে নারী বিপুল সওয়াব লাভ করে। অনেক আলেম উল্লেখ করেছেন, একজন নেককার নারীর ঘরোয়া দায়িত্ব পালনও তার জন্য বড় ইবাদত।
পাঁচ. রমজানে উমরা পালন
রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘রমজান মাসে একটি উমরা আমার সঙ্গে একটি হজের সমতুল্য।’ (বুখারি, হাদিস : ১৭৮২; মুসলিম, হাদিস : ১২৫৬) এখানে হজের সওয়াবের সমতুল্য প্রতিদানের কথা বলা হয়েছে। এটি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ, যা রমজানের মর্যাদা ও উমরার ফজিলতকে আরও বৃদ্ধি করেছে।
ছয়. মুসলমানের প্রয়োজন পূরণে সহযোগিতা করা
ইসলাম মানুষের কল্যাণ ও সহযোগিতার ধর্ম। রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণে নিয়োজিত থাকে, আল্লাহ তার প্রয়োজন পূরণ করেন।’ (বুখারি, হাদিস : ২৪৪২)
অন্য বর্ণনায় এসেছে, কোনো মুসলমানের প্রয়োজন পূরণে চেষ্টা করা বহু নফল ইবাদতের চেয়েও উত্তম। মানুষের উপকারে আত্মনিয়োগ করা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয় আমল।
সাত. পাঁচ ওয়াক্ত সালাত যথাযথভাবে আদায় করা
সালাত ইসলামের দ্বিতীয় স্তম্ভ। যে ব্যক্তি নিষ্ঠার সঙ্গে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে, তার জন্য বিপুল সওয়াবের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। হজের মতোই সালাত মানুষকে গুনাহ থেকে পবিত্র করে এবং আল্লাহর নৈকট্য দান করে। কুরআনে আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই সালাত অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।’ (সুরা আনকাবুত : ৪৫) সালাতের মাধ্যমে বান্দা প্রতিদিন আল্লাহর দরবারে হাজির হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করে।
আট. আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দান-সদকা করা
হজে যেমন অর্থব্যয় করতে হয়, তেমনি আল্লাহর পথে দান-সদকাও বড় ইবাদত। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা আল্লাহর পথে তাদের সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উদাহরণ একটি শস্যবীজের মতো, যা সাতটি শীষ উৎপন্ন করে; প্রতিটি শীষে একশত দানা থাকে।’ (সুরা বাকারা : ২৬১)
অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, এতিম-দরিদ্রকে সাহায্য করা এবং দ্বীনের খাতে ব্যয় করা মহান সওয়াবের কাজ।
হজের বিকল্প নেই
হজ ইসলামের এক মহান ফরজ ইবাদত, যার বিকল্প কোনো কিছু নয়। তবে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের জন্য অসংখ্য কল্যাণের দরজা খুলে রেখেছেন। জামাতের সঙ্গে ফজর আদায় করে ইশরাকের নামাজ পড়া, দ্বীনি জ্ঞান অর্জন ও শিক্ষা দেওয়া, পিতা-মাতার সেবা, রমজানে উমরা পালন, মানুষের উপকার করা, নিয়মিত সালাত আদায় এবং দান-সদকার মতো আমলগুলো হজের সমপরিমাণ সওয়াব লাভের সুযোগ এনে দেয়। এসব আমলের মাধ্যমে একজন মুসলমান আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে পারে এবং নিজের আমলনামাকে সমৃদ্ধ করতে পারে। তাই আমাদের উচিত হজের আকাঙ্ক্ষা হৃদয়ে লালন করার পাশাপাশি এসব ফজিলতপূর্ণ আমলের প্রতিও যত্নবান হওয়া। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কবুল হজের সওয়াব অর্জনের মতো নেক আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
