বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে কোরবানিকে কেন্দ্র করে আমাদের সমাজে এক অদ্ভুত ও উদ্বেগজনক প্রতিযোগিতার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। পশুর হাট এখন আর শুধু পশু কেনার স্থান নেই বরং তা হয়ে উঠেছে সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের মঞ্চ।
লাখ লাখ টাকা দিয়ে হাটের সবচেয়ে বড় বা দামি গরুটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার ছবি বা ভিডিও পোস্ট করা, কে কার চেয়ে দামি পশু কিনল এই নিয়ে প্রতিবেশী ও আত্মীয়দের মধ্যে এক অলিখিত প্রতিযোগিতা চলে। এক শ্রেণির ইউটিউবার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটাররা অতিরিক্ত দামে পশু কেনাকে প্রমোট করে সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের হীনমন্যতা তৈরি করে। অথচ কোরবানি যেখানে ছিল অহংকার বিসর্জনের ইবাদাত সেখানে এটি এখন অনেকের কাছে অহংকার প্রকাশের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না ওগুলোর গোশত এবং রক্ত, বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া। ’ (সুরা : হজ, আয়াত : ৩৭)
আজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে এই রিয়া আরো সূক্ষ্ম ও বিপজ্জনক রূপ ধারণ করেছে। আমরা অনেকে হয়তো অজান্তেই নিজের ইবাদতকে মানুষের বাহবা পাওয়ার মাধ্যম বানিয়ে ফেলছি। অথচ মহানবী (সা.) বলেন, ‘আমি তোমাদের ওপর যে বিষয়ে সবচেয়ে বেশি ভয় পাই, তা হলো ছোট শিরক। সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! ছোট শিরক কী? তিনি বললেন, রিয়া (লোকদেখানো আমল)।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং : ২৩৬৮১)
মূলত কোরবানি হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রিয় জিনিস ত্যাগ করার এক মহান ইবাদত। এই ইবাদতের ভেতরে লুকিয়ে আছে আত্মশুদ্ধি, বিনয়, তাকওয়া ও নিঃস্বার্থ আনুগত্যের শিক্ষা। ইবরাহিম (আ.) যখন আল্লাহর আদেশে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় জিনিস পর্যন্ত কোরবানি করতে প্রস্তুত হয়েছিলেন, তখন তিনি আমাদের জন্য শিখিয়ে গেছেন—আল্লাহর পথে ত্যাগ মানে শুধু সম্পদ ব্যয় নয়, বরং নিজের অহংকার, আত্মপ্রদর্শন ও দুনিয়াবি গৌরবের আকাঙ্ক্ষাকেও বিসর্জন দেওয়া। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতএব দুর্ভোগ সেই নামাজিদের জন্য, যারা তাদের সালাত সম্পর্কে উদাসীন, যারা লোক দেখানোর জন্য আমল করে।’ (সুরা : মাউন, আয়াত : ৪-৬)
ইসলাম আমাদের শিখায়, যে আমলের মধ্যে লোকদেখানো মনোভাব প্রবেশ করে, সেই আমলের সৌন্দর্য ও বরকত নষ্ট হয়ে যায়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) রিয়াকে অত্যন্ত ভয়াবহ একটি বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কারণ মানুষ যখন আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিবর্তে মানুষের প্রশংসা অর্জনের জন্য ইবাদত করে, তখন তার আমলের পবিত্রতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাইতো মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের চেহারা ও সম্পদের দিকে তাকান না; বরং তিনি তাকান তোমাদের অন্তর ও আমলের দিকে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ২৫৬৪)
তাই আমাদের মনে রাখতে হবে, কোরবানির প্রকৃত সৌন্দর্য পশুর দামে নয়, বরং তাকওয়ার গভীরতায়; সামাজিক প্রশংসায় নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টিতে। হাটের কোলাহল, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ ও মানুষের বাহবার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই নিভৃত হৃদয়, যে হৃদয় কোরবানির মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে চায়। আসুন, আমরা কোরবানিকে প্রতিযোগিতা, অপচয় ও লোকদেখানো সংস্কৃতি থেকে মুক্ত রেখে ইবরাহিমি আত্মত্যাগ, বিনয় ও ইখলাসের চেতনায় উজ্জীবিত করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকল আমলকে রিয়া ও অহংকারমুক্ত করে খাঁটি ইখলাসের সাথে কবুল করুন। আমিন।
