বিডি সিলেট নিউজ :: সরকার অনুমতি দিলে প্রয়োজনে পুলিশ ক্রসফায়ার করতেও পিছপা হবে না—পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের এমন বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে জাস্টিস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি পার্টি (জেডিপি)। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বক্তব্য প্রত্যাহার করে জনগণের কাছে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়েছে দলটি। একই সঙ্গে আইজিপির পদত্যাগেরও দাবি উঠেছে প্রতিবাদ সভায়।
সোমবার বিকেলে জাতীয় জাদুঘরের সামনে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের হুমকির প্রতিবাদে আয়োজিত এক সভায় এসব দাবি জানানো হয়। সভায় সভাপতিত্ব ও বক্তব্যের একপর্যায়ে জেডিপির আহ্বায়ক নাঈম আহমাদ বলেন, আইজিপির এমন বক্তব্য মানবাধিকার ও আইনের শাসনের জন্য উদ্বেগজনক।
তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ইঙ্গিত ছাড়া কোনো পুলিশ কর্মকর্তার পক্ষে এ ধরনের মানবাধিকারবিরোধী মন্তব্য করা সম্ভব নয় বলে তাঁরা মনে করেন। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বক্তব্য প্রত্যাহার করে জনগণের কাছে ক্ষমা চাওয়ার জন্য আইজিপির প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
নাঈম আহমাদ আরও বলেন, অতীতে ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’-এর আদলে বিচারবহির্ভূত অভিযান পরিচালনার আশঙ্কা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। আইজিপির সাম্প্রতিক বক্তব্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিকে কাজে লাগিয়ে ক্রসফায়ারের পক্ষে জনমত তৈরির চেষ্টা হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
তিনি বলেন, অপরাধ দমন ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তবে এ দায়িত্ব পালনের নামে বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে কাউকে হত্যার হুমকি দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অপরাধের অভিযোগ থাকলে নিরপেক্ষ তদন্ত ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আদালতে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের অনুমোদনও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দিতে পারে না।
পুলিশ সংস্কারের প্রসঙ্গ তুলে জেডিপির আহ্বায়ক বলেন, স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন করা হলে এ ধরনের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতো না বলে তিনি মনে করেন। তাঁর অভিযোগ, প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নের পরিবর্তে সরকার দমন-পীড়নের পথ প্রশস্ত করছে।
সভায় গণভোট বাস্তবায়ন নাগরিক ফোরামের আহ্বায়ক ফাহিম মাশরুর বলেন, জনগণের করের টাকায় পরিচালিত পুলিশ জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে—এটাই প্রত্যাশা। অথচ ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির বক্তব্য জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। তিনি এ বক্তব্যের জন্য আইজিপিকে দায়িত্ব থেকে অপসারণের দাবি জানান।
জেডিপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আব্দুল আলিম বলেন, রাষ্ট্রের শক্তি কতটি অস্ত্র রয়েছে, তা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না; বরং রাষ্ট্রের সবচেয়ে দুর্বল নাগরিক কতটা নিরাপদ, তার মাধ্যমেই রাষ্ট্রের শক্তি নির্ধারিত হয়। মানুষের মধ্যে ভয় সৃষ্টি না করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারকে মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা পুলিশের দায়িত্ব, কিন্তু আইনের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করার অধিকার কারও নেই। পুলিশকে শত্রু হিসেবে নয়, জনগণের বন্ধু হিসেবে দেখতে চান তাঁরা। অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি নিরপরাধ ও অসহায় মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
প্রতিবাদ সভায় বাংলাদেশ ন্যাপের মহাসচিব এম গোলাম মোস্তফা ভুইয়া বলেন, ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির বক্তব্য জাতিকে আতঙ্কিত করছে। দেশ আবারও দমনমূলক শাসনব্যবস্থার দিকে ফিরে যাচ্ছে কি না, সেই আশঙ্কাও প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর পুলিশ সংস্কারের যেসব সুপারিশ করা হয়েছিল, সেগুলো বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকারকে জবাব দিতে হবে। অতীতের মতো ক্রসফায়ারের সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার কোনো উদ্যোগ জনগণ মেনে নেবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জেডিপির প্রধান সংগঠক আহছান উল্লাহ বলেন, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে পুলিশ ব্যবস্থার সংস্কার জরুরি। ১৮৬১ সালের ঔপনিবেশিক পুলিশ আইন পরিবর্তন করে নতুন আইন প্রণয়নের দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে আইজিপিকে জনগণের কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে তাঁর পদত্যাগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
জেডিপির যুগ্ম সদস্য সচিব আব্দুল হামিদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সভায় আরও বক্তব্য দেন মঞ্চ ২৪-এর আহ্বায়ক ফাহিম ফারুকী, জাতীয় ছাত্রমঞ্চের মুখপাত্র সালমান শরীফসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা।
সভায় বক্তারা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের আশঙ্কা নাকচ করে আইনের শাসন, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং পুলিশ সংস্কার নিশ্চিত করার দাবি জানান
