মানুষের জীবন মহান আল্লাহর দেওয়া এক অমূল্য আমানত। এই জীবনকে সুস্থ, নিরাপদ ও কল্যাণময় রাখার দায়িত্বও মানুষের ওপর অর্পিত হয়েছে। তাই একজন মুমিন শুধু ইবাদতের ক্ষেত্রেই নয়, নিজের স্বাস্থ্য, শরীর ও জীবন রক্ষার ক্ষেত্রেও সচেতন ও দায়িত্বশীল হবে। অসুস্থ হলে চিকিৎসা গ্রহণ করবে, প্রয়োজনীয় ওষুধ সঠিক নিয়মে সেবন করবে এবং এমন কোনো কাজ করবে না, যা জেনে-বুঝে নিজের জীবনকে বিপদের মুখে ঠেলে দেয়।
প্রতিবছর ৩১ আগস্ট পালিত হয় আন্তর্জাতিক ওভারডোজ সচেতনতা দিবস। এ দিবস অতিরিক্ত মাদক বা ওষুধ গ্রহণের কারণে মৃত্যুর ঝুঁকি সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ এবং ওভারডোজ প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানায়। ২০০১ সালে অস্ট্রেলিয়ায় এ উদ্যোগের সূচনা হয়; ২০২৬ সালে এটি ২৫ বছরে পদার্পণ করেছে।
জীবন আল্লাহর দেওয়া আমানত
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান যেখানে অতিরিক্ত ওষুধ বা মাদক গ্রহণের ভয়াবহতা থেকে মানুষকে সতর্ক করছে, ইসলাম বহু শতাব্দী আগেই মানুষকে আত্মসংযম, ক্ষতি থেকে বেঁচে থাকা এবং নিজের জীবন রক্ষার নীতি শিক্ষা দিয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা নিজেদের হত্যা কোরো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ২৯)
মানুষ নিজের জীবনের প্রকৃত মালিক নয়; সে আল্লাহর বান্দা এবং তার জীবন আল্লাহর দেওয়া আমানত। তাই ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের জীবনকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া যেমন নিষিদ্ধ, তেমনি চরম অসতর্কতার মাধ্যমে নিজের জীবনকে বিপন্ন করাও একজন মুমিনের জন্য কাম্য নয়। আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, ‘তোমরা নিজেদের হাতে নিজেদের ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ কোরো না।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৯৫)
সুতরাং কোনো ওষুধ নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি গ্রহণ করা, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া মাত্রা বাড়ানো, অন্যের প্রেসক্রিপশন নিজের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা কিংবা নেশাজাতীয় পদার্থ গ্রহণ করে নিজের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলা—এসব ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক থাকা জরুরি। ওষুধ উপকারী হতে পারে, আবার ভুল মাত্রায় সেটিই ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই চিকিৎসা যেমন প্রয়োজন, তেমনি চিকিৎসাবিধি মেনে চলাও প্রয়োজন।
ইসলাম চিকিৎসা গ্রহণকে নিরুৎসাহিত করেনি; বরং রোগের চিকিৎসা গ্রহণের প্রতি উৎসাহ দিয়েছে। একই সঙ্গে চিকিৎসার ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতাও জরুরি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমার শরীরেরও তোমার ওপর অধিকার রয়েছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫১৯৯)
এই হাদিসের শিক্ষা অত্যন্ত ব্যাপক। শরীরের অধিকার হলো তাকে যথাযথ বিশ্রাম দেওয়া, সুস্থ রাখা এবং ক্ষতিকর বিষয় থেকে রক্ষা করা। তাই একজন মুমিনের উচিত প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করা, চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা এবং ওষুধ ব্যবহারে সতর্ক থাকা।
ইসলামী শরিয়তের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো—কাউকে ক্ষতি করা যাবে না এবং ক্ষতির জবাবে ক্ষতিও করা যাবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ক্ষতি করা যাবে না এবং ক্ষতির জবাবে ক্ষতি করা যাবে না।’ (সুনান ইবনু মাজাহ, হাদিস : ২৩৪১)
এই নীতির আলোকে নিজের শরীরের প্রতি অযথা ক্ষতিকর আচরণ থেকেও সতর্ক থাকা উচিত। তবে এ হাদিসের সনদ নিয়ে মুহাদ্দিসদের মধ্যে আলোচনা আছে; তাই এটিকে ইসলামী শরিয়তের একটি বহুল ব্যবহৃত নীতিবাক্য হিসেবে উল্লেখ করাই অধিক সতর্কতাপূর্ণ।
মাদক ও নেশার ব্যাপারে ইসলামের কঠোর অবস্থান
ওভারডোজের সঙ্গে মাদক ও নেশাজাতীয় পদার্থের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। ইসলাম মানুষের বিবেক, বুদ্ধি, জীবন ও সম্পদ রক্ষাকে গুরুত্ব দিয়েছে। এ কারণেই মাদক ও নেশাজাতীয় দ্রব্যের ব্যাপারে ইসলামের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! মদ, জুয়া, মূর্তি ও ভাগ্যনির্ধারক শর—এসব শয়তানের অপবিত্র কাজ। সুতরাং তোমরা তা পরিহার করো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৯০)
পরের আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘শয়তান তো মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে এবং আল্লাহর স্মরণ ও সালাত থেকে তোমাদের বিরত রাখতে চায়।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৯১)
অতিরিক্ত মাদক বা ওষুধ গ্রহণের পরিণতি শুধু হাসপাতালের জরুরি বিভাগে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পড়ে একটি পরিবারে, একটি সমাজে এবং কখনো কখনো একটি পুরো প্রজন্মের ওপর। একজন মানুষের ওভারডোজে মৃত্যু মানে তার পরিবারে একজন প্রিয় মানুষের অনুপস্থিতি। বাবা-মা হারাতে পারেন সন্তানকে, সন্তান হারাতে পারে অভিভাবককে, স্বামী বা স্ত্রী হারাতে পারেন জীবনসঙ্গীকে। তাই ওভারডোজ প্রতিরোধ শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিষয় নয়; এটি মানবিক ও সামাজিক দায়িত্বও।
আন্তর্জাতিক ওভারডোজ সচেতনতা দিবস আমাদের নিজেদের এবং প্রিয়জনদের জীবন সম্পর্কে নতুন করে ভাবার একটি সুযোগ। ৩১ আগস্ট বিশ্বজুড়ে মানুষ ওভারডোজে হারিয়ে যাওয়া জীবনগুলোকে স্মরণ করছে এবং প্রতিরোধ ও সচেতনতার আহ্বান জানাচ্ছে।
ইসলাম আমাদের বহু আগেই শিখিয়েছে—জীবনকে অবহেলা করা যাবে না, নিজের শরীরের অধিকার আদায় করতে হবে, ক্ষতিকর বিষয় থেকে দূরে থাকতে হবে এবং নিজেদের ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া যাবে না। কেননা একটি সচেতন সিদ্ধান্ত একটি জীবন বাঁচাতে পারে; আর একটি জীবন বাঁচানো মানে একটি পরিবারকে বাঁচানো, একটি ভবিষ্যৎকে বাঁচানো।
