ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন হয়েছে। ছাত্র-জনতার যে আন্দোলনে প্রবাসীরাও অংশ নিয়েছিল। আন্দোলনের সময় রেমিট্যান্স পাঠানো বন্ধ এবং বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ করে প্রবাসীরা। যার প্রেক্ষিতে অনেক দেশে গ্রেপ্তারও হতে হয় প্রবাসীদের।
ছাত্র-জনতা ও প্রবাসীদের ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত নতুন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রবাসীদের সমস্যা সমাধানে নানা উদ্যোগ নিচ্ছে। যার দৃশ্যমান প্রভাব পড়েছে রেমিট্যান্স পাঠানোরে ক্ষেত্রে। প্রবাসীরা আগের থেকে অধিক হারে বৈধ পন্থায় রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন।
তবে প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখলেও ভোটাধিকার প্রয়োগে তারা বঞ্চিত। তাই প্রবাসীরা যাতে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে সেজন্য উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। যে সিদ্ধান্তে খুশি ফ্রান্সে বসবাসরত বাংলাদেশিরা।
নির্বাচন কমিশন বলছে, প্রবাসীদের ভোটাধিকার কার্যকর করতে তিনটি বিকল্প পদ্ধতি বিবেচনায় রাখা হয়েছে—পোস্টাল ব্যালট, অনলাইন ভোটিং ও প্রক্সি ভোট। এই উদ্যোগ ঘিরে ফ্রান্সে অবস্থানরত বাংলাদেশিরা মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন।
প্রবাসীদের ভোটাধিকার বাস্তবায়নকে দীর্ঘদিনের দাবি উল্লেখ করে ফ্রান্স-বাংলাদেশ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের (এফবিজেএ) কো-অর্ডিনেটর মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিগত সরকারগুলো কেবল আশ্বাস দিয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে। চব্বিশের আন্দোলনের পর এই দাবি আবার সামনে এসেছে। দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড হিসেবে প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। আমি মনে করি, বিদেশে বাংলাদেশি মিশনের তত্ত্বাবধানে অনলাইন ভোটিং চালু হলে তা সবচেয়ে কার্যকর হবে।’
এছাড়া অনলাইন ও সরাসরি ভোটের সমন্বিত ব্যবস্থার দাবি জানিয়ে ফ্রান্স বিএনপির সদ্য সাবেক সাধারণ সম্পাদক এম. এ. তাহের কালের কণ্ঠকে বলেন,‘প্রবাসীদের ভোটাধিকার সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত। বর্তমান সরকারের এই উদ্যোগ সময়োপযোগী। তবে কেবল একটি পদ্ধতিতে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। দূতাবাসে সরাসরি ভোটের পাশাপাশি অনলাইন ভোটিংয়ের বিকল্প পথও রাখতে হবে। বিশেষ করে দূরবর্তী এলাকার ভোটারদের জন্য।’
পোস্টাল ব্যালট পদ্ধতিতেকে সময় ও নিরাপত্তার ঘাটতি বিষয়কে সামনে এনে এবং অনলাইন ভোটিং পদ্ধতিকে সমর্থন জানিয়ে বাংলাদেশ কমিউনিটি ইন ফ্রান্স (বিসিএফ)-এর প্রেসিডেন্ট এম. ডি. নূর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অনলাইন পদ্ধতি সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর। ডাকযোগে ভোটে সময় ও নিরাপত্তা দুটোই প্রশ্নবিদ্ধ। এস্তোনিয়ার অনলাইন ভোটিং মডেল আমাদের জন্য একটি উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হতে পারে। বিশ্বব্যাপী যখন ব্যাংকিংসহ অধিকাংশ সেবা অনলাইনে, ভোট কেন নয়?”।
প্রতিটি পদ্ধতির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উপর গুরুত্বআরোপ করে ফ্রান্স দূতাবাসের ইউনেস্কো বিভাগের সাবেক গবেষণা ও যোগাযোগ কর্মকর্তা ফাতেমা-তুজ-জোহরা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকারের আন্তরিকতাকে ধন্যবাদ জানাই। তবে ভোট পদ্ধতি বাছাইয়ে প্রতিটি দেশের বাস্তবতা ভিন্ন। যেসব দেশে দূতাবাস নেই, সেখানকার জন্য পোস্টাল ব্যালট কার্যকর হতে পারে। তবে যেকোনো পদ্ধতির আগে সম্ভাব্যতা যাচাই অপরিহার্য।’
প্রক্সি ভোটে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার লঙ্ঘনের আশঙ্কা করে অনলাইন ভোটিং কিংবা পোস্টাল ভোটিং পদ্ধতিতেকে সমর্থন জানিয়ে প্যারিস অবজারভেটরির পিএইচডি গবেষক ও জাতীয় নাগরিক কমিটির ডায়াস্পোরা বিভাগের সদস্য ইশতিয়াক আকিব বলেন, ‘প্রথমবারের মতো প্রবাসীদের ভোটাধিকারের সম্ভাবনা আনন্দের। তবে প্রক্সি ভোটে গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। অনেকে পরিবারসহ প্রবাসে, ফলে বিশ্বস্ত প্রতিনিধি নির্বাচন করা কঠিন। অনলাইন বা পোস্টাল ব্যালট হলে নিজের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যাবে।’
ফ্রান্সের বসবাসরত বাংলাদেশিরা মনে করেন, নির্বাচনী ব্যবস্থায় তাদের অন্তর্ভুক্তি শুধু গণতন্ত্রকে সুসংহত করবেই না; পাশাপাশি রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রবাসীদের সম্পর্কও হবে আরো দৃঢ়। তবে কোন পদ্ধতিটি সবচেয়ে কার্যকর হবে তা নির্ভর করবে সুচিন্তিত পরিকল্পনা ও প্রযুক্তি-নির্ভর বাস্তবায়নের ওপর।
