রুমানা আক্তার লিজা (২৪)। বাড়ি সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলায়। তার বিরুদ্ধে অ্যাডভোকেট পরিচয়ের অপব্যাবহার, হানিট্র্যাপে ফেলে প্রতারণা, চোরাকারবার, হত্যার হুমকিসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির একজন সদস্য তার ব্যাপারে ছবিসহ ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। জানা গেছে, একটি প্রতারক চক্রের অন্যতম প্রধান এই লিজা।
সম্প্রতি লিজা ও তার দলবলের বিরুদ্ধে ঢাকায় অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনায় মামলাদায়ের করে বিপদে পড়েছেন সিলেটের ব্যবসায়ী নাজিম উদ্দিন। মামলাটি তুলে না নিলে তাকে এবং তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার হুমকি দিচ্ছে আসামিরা। তারা এখন চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
এ ব্যাপরে গত ২৫ মার্চ সিলেট মহানগর পুলিশের জালালাবাদ থানায় একটি সাধারণ ডায়রির আবেদন করছেন তিনি।
নাজিম উদ্দিন (৬০) সিলেটের জালালাবাদ থানার নোয়াপাড়া বন্ধন-ডি ১৪ নং বাসার ছবর আলী ও মমতা বেগমের ছেলে।
জিডি সূত্র যায়, তিনি পেশায় একজন পাথর ও ফিসারি ব্যবসায়ী। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি দুপুর আড়াইটা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত ঢাকার মতিঝিল থানার পূর্বানী আবাসিক হোটেল সংলগ্ন পাট দপ্তর ভবনের ৭ম তলায় তাকে আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং মুক্তিপণ আদায় করে একটি চক্র। তারা স্ট্যাম্পে তার স্বাক্ষর ও রেখে দেয়। পরে এ ঘটনায় নিজেই বাদি হয়ে গত ৫ মার্চ মতিঝিল থানায় একটি মামলা (নং ৮) দায়ের করেন নাজিম।
এ মামলায় আসামি করা হয়েছে ৭ জনকে। তারা হলেন, জৈন্তাপুর থানার কেন্দ্রী এলাকার আহমেদ আলী ও ফাতেমা বেগমের মেয়ে রুমানা আক্তার লিজা (২৪), দক্ষিণ সুরমার শাহ সিকান্দর গ্রামের মৃত কিরন মিয়া চৌধুরীর ছেলে, বর্তমানে উপশহর এইচ ব্লকের ১০৩নং বাসার বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন (৫০), কোতোয়ালী থানাধীন সোবহানীঘাট এলাকার জোনাকী রেস্টুরেন্টে কর্মরত শরিফ বাউলী মিন্টু (৩৫), দক্ষিণ সুরমার নাজিরেরগাঁও এলাকার মৃত আকল মিয়ার ছেলে মো মকবুল হোসেন (৪১), দক্ষিণ সুরমার নাজিরেরগাঁওয়ের মৃত কচি মিয়ার ছেলে দুলাল আহমদ (৩৮), বিশ্বনাথ থানার কামালবাজার বেতুরগাঁওয়ের লিয়াকত হাসেন (৪২)। তিনি বর্তমানে ঢাকার মতিঝিল এলাকার পাটভবন ৭ম তলার বাসিন্দা। সিলেটের জকিগঞ্জ থানা এলাকার মো. কুতুব উদ্দিন (৩৫)। তিনি বর্তমানে কোতোয়ালি থানার মুন্সীপাড়ার (কেওয়াপাড়া) ৩৫নং বাসার বাসিন্দাসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৩/৪ জনকে।
মামলা দায়েরের পর থেকে তারা বিভিন্ন মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে কল দিয়ে, কখনোবা লোকমারফত বা অন্যান্যভাবে নাজিমকে হত্যার হুমকি দিয়ে যাচ্ছে বলেও তিনি জিডিতে উল্লেখ করেন। তারই ধারাবাহিকতায় গত ২২ মার্চ সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় আসামি কুতুব উদ্দিন ০১৭১৫৬৪৪৭৩৪ নম্বর থেকে নাজিমকে হোয়াটসঅ্যাপে মামলা তুলে না নিলে হত্যার হুমকি দেন। এমনকি তার পরিবারের সদস্যদেরকেও যেখানে পাওয়া যাবে সেখানেই তারা হত্যার হুমকি দিচ্ছে।এই চক্রটির বিরুদ্ধে জালিয়াতি প্রতারণা এবং হানিট্র্যাপে ফেলে সর্বনাশের জোরালো অভিযোগও তুলেছেন নাজিম। আর ওই চক্রের কেন্দ্রে আছেন লিজা। মূলত: তাকে দিয়েই সহজ-সরল লোকজনকে ফাঁদে ফেলা হয়।লিজার বাড়ি সীমান্তবর্তী এলাকায় হলেও সিলেটের উপশহরসহ জৈন্তাপুরের আরও ২/৩ বাড়ির ঠিকানা ব্যবহার করেন তিনি।তিনি তার ভাইদের নিয়ে চোরাকারবারের সঙ্গে জড়িত বলেও অভিযোগও রয়েছে।
অ্যাডভোকেট পরিচয়ে তিনি বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে প্রতারণা করেন, এমন অভিযোগ সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতিতেও দিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
অতিসম্প্রতি লিজাকে সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির কয়েকজন সদস্য অভিযোগের প্রেক্ষিতে ‘আমি টাউট, আইনজীবী নহে’ শিরোনামে একটি লেখা সংবলিত ছবি এবং উকিলের গাউন পরা ছবিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করে তার ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
বিষয়টি এ প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে স্বীকারও করেছেন সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জোবায়ের বখত জুবের। তিনি জানান, অনেক আগে থেকেই তার বিরুদ্ধে আমাদের অফিসে অভিযোগ ছিল। সম্প্রতি কয়েকজন আইনজীবী তাকে নিয়ে আমার কাছে এলে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দিতে বলেছি। মহিলা হিসাবে আমরা আর তাকে পুলিশে দেইনি।তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন লিজা। জানিয়েছেন, নাজিমের কাছে তার টাকা পাওনা আছে। সেটা আদায় করার চেষ্টা করেছেন ঢাকায় তার স্বজনদের নিয়ে। তিনি অ্যাডভোকেট পরিচয়ে প্রতারণার বিষয়টিও অস্বীকার করেছেন। আইনজীবী সমিতিতে টাউট পরিচয় স্বীকার করে ছবি তোলার বিষয়টি সত্য বলে জানিয়েছেন তিনি। বলেছেন, আমার মা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাই দ্রুত তার কাছে যাওয়ার জন্য আমি ছবি তুলতে রাজি হয়েছি। তবে মুচলেকায় স্বাক্ষর করিনি।
