BD SYLHET NEWS
সিলেটমঙ্গলবার, ২১শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, বিকাল ৪:২৭
আজকের সর্বশেষ সবখবর

শিক্ষার্থীদের স্বাক্ষর জাল করে অনুদান আত্মসাতের অভিযোগ


মার্চ ১১, ২০২৬ ১০:১৪ অপরাহ্ণ
Link Copied!

বরগুনার বামনা উপজেলার বামনা মহিলা দাখিল মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের স্বাক্ষর জাল করে সরকারি অনুদানের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির সুপার ও সভাপতির বিরুদ্ধে।

জানা গেছে, ২০২৩ সালে প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট (পিবিজিএসআই) -এর আওতায় মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থী সহায়তা, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী, লাইব্রেরি ও শিক্ষা উপকরণ, অবকাঠামো, বিশুদ্ধ পানি ও শৌচাগার সংস্কারের জন্য সরকার থেকে পাঁচ লক্ষ টাকা অনুদান আসে। এই অর্থ ব্যয়ের জন্য তিন সদস্যের একটি সাব-কমিটি গঠন করা হয়।

মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক মোঃ আজিজুল রহমানের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিনি ওই তহবিল ব্যবস্থাপনা কমিটির একজন সদস্য ছিলেন। পরে তহবিলে উল্লেখিত শিক্ষার্থীদের তালিকা নিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বললে বেরিয়ে আসে ভিন্ন চিত্র।

তালিকায় থাকা ছনিয়া আক্তার (পিতা: জামাল) তথ্য অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের অংশ থেকে পাঁচ হাজার টাকা পাওয়ার কথা। কিন্তু তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিনি কোনো টাকা পাননি এবং কোথাও স্বাক্ষরও করেননি। একই অভিযোগ করেন তালিকায় থাকা মোসা. তন্নী (পিতা: ইউনুছ), তামান্না আক্তার (পিতা: রুস্তম আলী), নার্গিস আক্তার (পিতা: আনছার আলী) ও খাদিজা আক্তারসহ আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী। তাদের দাবি, তাদের নামে টাকা এসেছে বলে শুনলেও এখন পর্যন্ত কোনো অর্থ তারা পাননি।

হাত-পা বাঁধা অবস্থায় ছিলাম, কাঠের পুতুলের মতো যা বলা হয়েছে তাই করেছি। – মোঃ আলমগীর হোসেন, সুপার

শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, টাকা বিতরণের বিষয়ে বারবার জানতে চাইলে মাদ্রাসার সুপার তাদের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আশ্বাস দিয়েছেন—কখনো বলেছেন পরে দেওয়া হবে, আবার কখনো বলেছেন সভাপতি এলে অনুষ্ঠান করে বিতরণ করা হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তারা কোনো টাকা পাননি। অথচ কাগজপত্রে দেখা যায়, তাদের নামে টাকা গ্রহণের রশিদে স্বাক্ষর রয়েছে।

তথ্য অনুযায়ী, অসহায় শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ ৭৫ হাজার টাকা এবং প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ ৫০ হাজার টাকা—মোট ১ লাখ ২৫ হাজার টাকার কোনো বাস্তব বিতরণের প্রমাণ মেলেনি।

এ বিষয়ে মাদ্রাসার সুপার মোঃ আলমগীর হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিন সদস্যের সাব-কমিটি বিষয়টি ভালো বলতে পারবেন। তিনি দাবি করেন, তিনি শুধু টাকা উত্তোলন করে তহবিলে জমা দিয়েছেন এবং প্রধান হিসেবে কাগজে স্বাক্ষর করেছেন।

অন্যদিকে সাব-কমিটির সদস্য মোঃ আজিজুর রহমান (গণিত শিক্ষক), ফিরোজা বেগম (সামাজিক বিজ্ঞান) ও মোঃ সাইদুর রহমান (অফিস সহকারী) জানান, তারা আদৌ জানতেন না যে তারা কোনো আয়-ব্যয় কমিটির সদস্য হয়েছেন। তাদের অভিযোগ, সুপার তাদের মতামত ছাড়াই কমিটি গঠন করেন।

তারা আরও দাবি করেন, রেজুলেশনে স্বাক্ষর দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। সভাপতির মেজ ভাই, তৎকালীন বামনা থানা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক হাজী মোঃ ইউসুফ আলী হাওলাদার এবং সুপার আলমগীর হোসেন তাদের ভয়ভীতি দেখান এবং চাকরি হারানোর হুমকি দেন। পরে বাধ্য হয়ে তারা স্বাক্ষর করেন বলে জানান।

পরে আবার মাদ্রাসার সুপার আলমগীর হোসেনের মুখোমুখি হলে তিনি প্রথমে সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে ক্যামেরা বন্ধ রাখার শর্তে তিনি বলেন, হাত-পা বাঁধা অবস্থায় ছিলাম, কাঠের পুতুলের মতো যা বলা হয়েছে তাই করেছি।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ২০২৩ সালের ৩০ নভেম্বর সভাপতি ও সুপারের যৌথ স্বাক্ষরে পাঁচ লক্ষ টাকা উত্তোলন করা হয়। এরমধ্যে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে অর্থ দেওয়ার কথাও জানা গেছে।

প্রতিবেদকের হাতে আসা একটি টপশিট থেকে দেখা যায়, মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে মাদ্রাসাটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব ও বোর্ডে চাকরির সুবাদে তিনি মাদ্রাসাটিতে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে নানা অনিয়ম করে আসছেন।

আরও অভিযোগ রয়েছে, মাদ্রাসার দুটি টিনের ঘরসহ মাটি, বালু ও ইট ব্যক্তিগতভাবে নিয়ে নেওয়া হয়েছে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় চার লক্ষ টাকা। এছাড়া বিভিন্ন খাত দেখিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে।

এদিকে সুপার আরও দাবি করেন, অনৈতিক উপায়ে ঘুষের বিনিময়ে দুই শিক্ষককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দরকষাকষির মাধ্যমে প্রায় সাত লক্ষ টাকা ব্যাংক লেনদেনের মাধ্যমে তাদের চাকরি দেওয়া হয়।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মাদ্রাসার সভাপতি মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান, যিনি ঢাকা মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে সেকশন অফিসার পদে কর্মরত। মুঠোফোনে তিনি বলেন, পুরো ঘটনাটি তথ্যগত ভুল। বিষয়টি বিভিন্ন পর্যায়ে তদন্ত চলছে। আমি কোনো টাকা আত্মসাৎ করিনি।

বরগুনা জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা) মোঃ আতিকুল ইসলাম ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি না হলেও জানান, এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।