সিলেট প্রতিনিধি:: স্বাধীনতা দিবসের দিনে যখন সারা দেশ বিজয়ের আনন্দে মুখর, ঠিক তখনই সিলেট নগরীতে ঘটল এক হৃদয়বিদারক ও ভয়াবহ ঘটনা। বুধবার (২৬ মার্চ) রাত সাড়ে ৮টার দিকে সিলেট সরকারি মহিলা কলেজ সংলগ্ন গৌরব স্মৃতিস্তম্ভের পাশে অবস্থিত একটি হিন্দু মন্দিরে পরিকল্পিতভাবে হামলা চালানোর অভিযোগ উঠেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের একটি মিছিল বের হয়। মিছিলটি সরকারি মহিলা কলেজ অতিক্রম করার সময় হঠাৎ করেই মন্দির লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ছোড়া শুরু হয়। মুহূর্তেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। মন্দিরে অবস্থানরত পুরোহিত ও উপাসনাকারীরা প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে যান। এরপর হামলাকারীরা ভেতরে ঢুকে মন্দিরের স্থাপনা ভাঙচুর করে, ধর্মীয় উপকরণ গুঁড়িয়ে দেয় এবং একসময় নীরব প্রার্থনালয়কে পরিণত করে ধ্বংসস্তূপে।
ঘটনার পর কোতোয়ালী মডেল থানার এসআই মো. জুনেদ আহমদ বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন। মামলায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ১৩ জন নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং আরও একশোর বেশি অজ্ঞাত আসামিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে বলা হয়েছে, হামলাটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত এবং সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট করার একটি ষড়যন্ত্র।
আসামিদের মধ্যে রয়েছেন—সাইফুল ইসলাম খান লিটন (সভাপতি, ২নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ), আব্দুল মুমিন সৌরভ (সভাপতি, ১৪নং ওয়ার্ড ছাত্রলীগ), রিয়াদ আহমদ রুবেল (সাংগঠনিক সম্পাদক, মহানগর যুবলীগ), তাহমিনা চৌধুরী (ছাত্রীবিষয়ক সম্পাদক, সিলেট সরকারি মহিলা কলেজ ছাত্রলীগ), সানজিদা ইসলাম নাবিলা (উপ-ছাত্রীবিষয়ক সম্পাদক, একই কলেজ ছাত্রলীগ), জাহাঙ্গীর (কাউন্সিলর, ৩৫নং ওয়ার্ড, সিলেট সিটি করপোরেশন), রুহেল (ছাত্রলীগ নেতা), মিজানুর রহমান (আওয়ামী লীগ নেতা), রাজন আহমদ (সহ-সভাপতি, জালালাবাদ থানা ছাত্রলীগ), আফরুজা সুলতানা শিমু (তথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক, সিলেট জেলা মহিলা আওয়ামী লীগ), আব্দুল খালিক লাভলু (মুক্তিযোদ্ধাবিষয়ক সম্পাদক, সিলেট মহানগর যুবলীগ), হেলাল আহমদ (আওয়ামী লীগ নেতা, ১১নং ওয়ার্ড) এবং মতিউর রহমান মতি (মহানগর ছাত্রলীগ)।
কোতোয়ালী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ জিয়াউল হক বলেন-“এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি ঘটনা। আমরা তদন্ত শুরু করেছি এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অন্যদিকে হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ ঘটনাটিকে সরাসরি সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের ক্যাডাররা বারবার সংখ্যালঘুদের উপর হামলা চালাচ্ছে, অথচ প্রশাসনের পক্ষ থেকে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।
এই হামলার পর স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও সংখ্যালঘু কমিশন দ্রুত বিচার, দোষীদের শাস্তি এবং ক্ষতিগ্রস্ত মন্দির ও সম্প্রদায়ের জন্য ক্ষতিপূরণ প্রদানের দাবি জানিয়েছে।
স্বাধীনতার দিনে যখন দেশজুড়ে লাখো মানুষ মুক্তির গানে উল্লাস করছিল, তখন সিলেটের এক মন্দিরে নেমে আসে বিভীষিকার অন্ধকার। ভেঙে যায় শুধু একটি প্রার্থনালয়ের দেয়াল নয়—ভেঙে যায় শান্তি, নিরাপত্তা আর সম্প্রীতির ভিত্তি।
