আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশ আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) দুপুর ৩টার দিকে বাংলাদেশ বিশ্বের পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশগুলোর তালিকায় ৩৩তম দেশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। তিনি পদ্মার তীর ঘেঁষা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নাম শুনলেই আধুনিক প্রযুক্তির এক নতুন যুগের কথা মনে হয়। কারণ, বিশ্বের খুব কম দেশেই এই ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে।
ওয়ার্ল্ড নিউক্লিয়ার অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৩১টি দেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম। এসব দেশের মোট ৪১৫টি রিয়্যাক্টর থেকে বৈশ্বিক বিদ্যুতের প্রায় ৯ শতাংশ উৎপন্ন হয়। মোট উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৩৮২ গিগাওয়াট। তবে এই শক্তির বণ্টন সমান নয়- কিছু দেশ অনেক এগিয়ে, আবার কিছু দেশ নতুনভাবে এই খাতে প্রবেশ করছে।
পারমাণবিক যুগে বাংলাদেশ
২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার রোসাটম এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার মাধ্যমে ঢাকার প্রায় ১৬০ কিলোমিটার দূরে রূপপুরে দুটি রিয়্যাক্টর নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। প্রায় ১২.৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের এই প্রকল্পের চূড়ান্ত চুক্তি ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে স্বাক্ষরিত হয়।
২০১৬ সালের জুনে বাংলাদেশ পরমাণু নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ রূপপুর প্রকল্পের জন্য প্রথম সাইট লাইসেন্স প্রদান করে। এরপর ভূতাত্ত্বিক জরিপসহ প্রাথমিক কাজ শুরু হয়।
প্রথম ইউনিটের নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৭ সালের নভেম্বরে এবং দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালের জুলাইয়ে। প্রতিটি ইউনিটের প্রাথমিক আয়ুষ্কাল ৬০ বছর, যা আরও ২০ বছর বাড়ানো সম্ভব।
২০২৩ সালের অক্টোবরে রাশিয়া থেকে পারমাণবিক জ্বালানির প্রথম চালান রূপপুরে পৌঁছায়। এর মাধ্যমে প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে একটি পারমাণবিক স্থাপনার মর্যাদা লাভ করে। ২০২৪ সালের মার্চে প্রথম ইউনিটের টারবাইন স্থাপন সম্পন্ন হয় এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা পরিচালিত হয়।
বর্তমানে প্রকল্পের পরবর্তী ধাপ হলো ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’, যেখানে রিয়্যাক্টর কোরে পারমাণবিক জ্বালানি লোড করা হবে। এরপর ধাপে ধাপে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করে জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত করা হবে।
অন্যান্য পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশ
বিশ্বে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারে শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যেখানে ৯৪টি রিয়্যাক্টর চালু রয়েছে। চীনে ৫০টিরও বেশি রিয়্যাক্টর রয়েছে এবং দেশটি দ্রুত নতুন কেন্দ্র নির্মাণ করছে। ফ্রান্সে প্রায় ৫৭টি রিয়্যাক্টর রয়েছে এবং তাদের মোট বিদ্যুতের প্রায় ৭০ শতাংশ পারমাণবিক উৎস থেকে আসে।
ইউরোপের যুক্তরাজ্য, ইউক্রেন, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, স্পেন, বেলজিয়ামসহ প্রায় ১৩টি দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। এশিয়ায় জাপান, ভারত, পাকিস্তান, ইরান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত এই তালিকায় রয়েছে।
জাপান একসময় এই খাতে শীর্ষে থাকলেও ফুকুশিমা দুর্ঘটনার পর তাদের কার্যক্রম কমে যায়। তবে বর্তমানে তারা আবার ধীরে ধীরে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহারে ফিরে আসছে।
আমেরিকা মহাদেশে কানাডা, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা এবং মেক্সিকো পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে।
রাশিয়া শুধু নিজ দেশে নয়, অন্যান্য দেশেও পারমাণবিক প্রযুক্তি ও সহায়তা প্রদান করছে। দক্ষিণ কোরিয়াও এই খাতে উল্লেখযোগ্য, বিশেষ করে প্রযুক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে।
চীন ২০৩০ সালের মধ্যে ৭০ হাজার মেগাওয়াট পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। অন্যদিকে, পাকিস্তান ২০৩০ সালের মধ্যে তাদের উৎপাদন ক্ষমতা ৮ হাজার ৮০০ মেগাওয়াটে উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়েছে।
বর্তমানে কিছু দেশ নতুন করে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে। বাংলাদেশ, তুরস্ক এবং মিশর এই তালিকায় উল্লেখযোগ্য। এছাড়া সৌদি আরব, নাইজেরিয়া এবং পোল্যান্ড পরিকল্পনার পর্যায়ে রয়েছে।
এসব দেশের মূল লক্ষ্য হলো জ্বালানি ঘাটতি কমানো এবং ভবিষ্যতের জন্য নির্ভরযোগ্য ও স্থিতিশীল বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা।
