মানুষের জীবনে এমন সময় আসে, যখন চারপাশের কোলাহল, প্রতিযোগিতা ও বিভ্রান্তি ঈমানের জন্য বড় হুমকিতে পরিণত হয়। তখন সম্পদ, প্রভাব বা সামাজিক অবস্থান নয়—বরং নিজের দ্বীনকে রক্ষা করাই হয়ে ওঠে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নবী করিম ﷺ সাহাবায়ে কেরামকে এমন এক সময়ের কথা আগেই জানিয়ে গিয়েছেন, যখন ঈমান নিয়ে টিকে থাকাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ، أَنَّهُ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم “ يُوشِكُ أَنْ يَكُونَ خَيْرَ مَالِ الْمُسْلِمِ غَنَمٌ يَتْبَعُ بِهَا شَعَفَ الْجِبَالِ وَمَوَاقِعَ الْقَطْرِ، يَفِرُّ بِدِينِهِ مِنَ الْفِتَنِ ”. আবূ সাঈদ খুদরী (রা.) হতে বর্ণিত।
তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সেদিন দূরে নয়, যেদিন মুসলিমের উত্তম সম্পদ হবে কয়েকটি বকরী, যা নিয়ে সে পাহাড়ের চূড়ায় অথবা বৃষ্টিপাতের স্থানে চলে যাবে। ফিতনা হতে সে তার ধর্ম সহকারে পলায়ন করবে। (বুখারি, হাদিস : ১৯)
এই হাদিসে রাসুল (সা.) ভবিষ্যতের এমন এক সামাজিক বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরেছেন, যখন চারদিকে ফিতনা ছড়িয়ে পড়বে। ‘ফিতনা’ শব্দটি এখানে কেবল রাজনৈতিক অস্থিরতা নয়; বরং দ্বীনের ওপর আঘাত, নৈতিক অবক্ষয়, বিভ্রান্ত চিন্তা, হারামকে হালাল বানানোর প্রবণতা এবং ঈমানকে দুর্বল করে দেয় এমন সব পরিস্থিতিকে বোঝায়।
“মুসলিমের উত্তম সম্পদ হবে কয়েকটি বকরী” এ কথার অর্থ, সে বিলাসী জীবন, বড় ব্যবসা বা নগরকেন্দ্রিক প্রভাবশালী অবস্থানকে অগ্রাধিকার দেবে না। বরং অল্প সম্পদ নিয়েই দূরবর্তী পাহাড়ে বা নির্জন স্থানে বসবাস করবে। কারণ সেখানে সে অন্তত নিজের ঈমান, নামাজ, সন্তানদের আকিদা ও নৈতিকতা রক্ষা করতে পারবে। বকরী এখানে সরল ও স্বনির্ভর জীবনের প্রতীক।
অর্থাৎ, এমন এক সময় আসবে যখন সামাজিক স্রোতে ভেসে যাওয়ার চেয়ে নিরিবিলি জীবনই দ্বীনের জন্য নিরাপদ হবে।
তবে এই হাদিসের অর্থ সমাজবিমুখতা নয়। ইসলাম মূলত জামাআতের দ্বীন। রাসুল (সা.) ও সাহাবাগণ সমাজ গড়েছেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু যখন এমন অবস্থা সৃষ্টি হবে যে সমাজে অবস্থান করলে ঈমান টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে, তখন নিজের দ্বীন রক্ষার জন্য স্থান পরিবর্তন করা বৈধ বরং কখনও জরুরি হয়ে যেতে পারে।
ইতিহাসে দেখা যায়, অনেক সাহাবি মক্কার নির্যাতন থেকে বাঁচতে হাবশায় হিজরত করেছিলেন। সেটিও ছিল দ্বীন রক্ষার পদক্ষেপ।
হাদিসটি আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন তোলে যে, আমাদের জীবনের অগ্রাধিকার কী? সম্পদ, ক্যারিয়ার ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, নাকি ঈমানের নিরাপত্তা? যদি এমন পরিস্থিতি আসে যেখানে একটিকে বেছে নিতে হয়, একজন মুমিন দ্বীনকেই প্রাধান্য দেবে।
আজকের বাস্তবতায়ও এই হাদিস গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। চারপাশে বিভ্রান্ত মতবাদ, অনৈতিক বিনোদন, সুদের সংস্কৃতি, বিশ্বাসহীনতার প্রচার—সব মিলিয়ে এক অদৃশ্য ফিতনার জাল বিস্তৃত। প্রত্যেকের জন্য পাহাড়ে চলে যাওয়া সম্ভব নয়, প্রয়োজনও নয়। কিন্তু অন্তত নিজের পরিবারে ঈমানি পরিবেশ গড়ে তোলা, হারাম থেকে দূরে থাকা, সন্তানদের সঠিক আকিদা শেখানো এবং প্রয়োজনে ক্ষতির মুখে পড়েও দ্বীনকে আঁকড়ে ধরা—এটাই এই হাদিসের মূল শিক্ষা।
সবশেষে বলা যায়, প্রকৃত সফলতা বড় সম্পদে নয়; বরং বিশুদ্ধ ঈমানে। যে ব্যক্তি ফিতনার ভিড়ে নিজের দ্বীন অক্ষুণ্ণ রাখতে পারে, সে-ই আল্লাহর কাছে প্রকৃত বিজয়ী। এই হাদিস আমাদের সেই অগ্রাধিকারের শিক্ষা দেয় যে, দুনিয়া নয়, দ্বীনই হোক জীবনের আসল সম্পদ।
