ইসলাম ডেস্ক : আখিরাত হলো মানুষের চূড়ান্ত গন্তব্য, যেখানে তার ইহজীবনের প্রতিটি কাজের বিচার হবে। ভালো কাজের পুরস্কার জান্নাতের চিরস্থায়ী নিয়ামত আর মন্দ কাজের শাস্তি জাহান্নামের ভয়াবহ আগুন। এই বিশ্বাস মানুষকে সৎ পথে চলতে উদ্বুদ্ধ করে এবং পাপ থেকে বিরত রাখে। আখিরাতের এই পুরস্কার ও শাস্তি আমাদের জীবনের লক্ষ্য ঠিক করে দেয় এবং নৈতিক চরিত্র গঠনে সহায়তা করে।
তাই এ প্রবন্ধে কিয়ামতের দিন মন্দ কাজের শাস্তির নমুনা হিসেবে কয়েকটি হাদিসের ভাষ্য তুলে ধরা হলো, যা পাঠককে মন্দ কাজের পরিণতি সম্পর্কে ভাবতে বাধ্য করবে।
মিথ্যা অপবাদ ও সম্পদ আত্মসাতের ভয়াবহ শাস্তি
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, তোমরা কি জানো নিঃস্ব কে? তারা বলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের মধ্যে নিঃস্ব হচ্ছে ওই ব্যক্তি, যার নগদ অর্থ নেই, কোনো সম্পদও নেই। রাসুল (সা.) বলেন, আমার উম্মতের মধ্যে ওই ব্যক্তি হচ্ছে নিঃস্ব, যে কিয়ামত দিবসে নামাজ, রোজা, জাকাতসহ বহু আমল নিয়ে উপস্থিত হবে এবং এর সঙ্গে সে কাউকে গালি দিয়েছে, কাউকে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে, কারো সম্পদ আত্মসাৎ করেছে, কারো রক্ত প্রবাহিত (হত্যা) করেছে, কাউকে মারধর করেছে ইত্যাদি অপরাধও নিয়ে আসবে। সে তখন বসবে এবং তার নেক আমল থেকে এই ব্যক্তি কিছু নিয়ে যাবে, অন্য ব্যক্তি কিছু নিয়ে যাবে।
এভাবে সম্পূর্ণ বদলা (বিনিময়) নেওয়ার আগেই তার সৎ আমল নিঃশেষ হয়ে গেলে তাদের গুনাহ তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে, তারপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (মুসলিম, হাদিস : ২৫৮১)
যাদের নাড়ি-ভুঁড়ি জাহান্নামে জ্বলবে
জাবের (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, আমার ওপরে (মিরাজে বা স্বপ্নে) জাহান্নামকে হাজির করা হয়। তাতে আমি বনু ইসরাঈলের একজন মহিলাকে দেখলাম, যাকে একটি বিড়ালের কারণে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। সে বিড়ালটিকে বেঁধে রেখেছিল।
তাকে খেতেও দেয়নি, ছেড়েও দেয়নি, যাতে সে জমিনে বিচরণ করে পোকামাকড় ইত্যাদি খেতে পারে। অবশেষে বিড়ালটি ক্ষুধায় মারা যায়। তা ছাড়া আমি সেখানে আমর ইবনু আমের আল-খুজাঈকে দেখলাম। সে জাহান্নামের আগুনের মধ্যে নিজের নাড়ি-ভুঁড়ি টেনে চলেছে। এই ব্যক্তিই সর্বপ্রথম দেব-দেবীর নামে ষাঁড় ছেড়ে দেওয়ার কুপ্রথা চালু করেছিল।(মুসলিম, হাদিস : ৯০১)
বে-আমল বক্তার চূড়ান্ত শাস্তি
নিজে সৎ কাজে অনুগত না থেকে অন্যদের সৎ কাজে আহবান করা এবং অন্যায় থেকে বিরত না থেকে নিষেধ করা একটি বড় অপরাধ, যার শাস্তি অত্যন্ত ভয়াবহ। এই মর্মে উসামা বিন জায়েদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, কিয়ামতের দিন এক ব্যক্তিকে আনা হবে। অতঃপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে, যাতে আগুনে পুড়ে তার নাড়ি-ভুঁড়ি বের হয়ে যাবে এবং গাধা যেমন গম পেষার সময় ঘানির চারপাশে ঘুরতে থাকে, অনুরূপভাবে সেও তার নাড়ি-ভুঁড়ির চারপাশে ঘুরতে থাকবে। এ সময় জাহান্নামবাসীরা সেখানে জমা হয়ে জিজ্ঞেস করবে, হে অমুক! তোমার ব্যাপার কী? তুমি না আমাদের সৎ কাজের আদেশ করতে এবং অন্যায় কাজে নিষেধ করতে? জবাবে সে বলবে, আমি তোমাদের সৎ কাজের আদেশ করতাম, কিন্তু আমি নিজে তা করতাম না। আর তোমাদেরকে অন্যায় কাজে নিষেধ করতাম, কিন্তু আমি নিজে তা করতাম। (বুখারি, হাদিস : ৩২৬৭)
চার শ্রেণির অপরাধের ভয়াবহ শাস্তি
সামুরাহ বিন জুনদুব (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) সালাত শেষে আমাদের দিকে মুখ ফিরিয়ে বসতেন। একদিন তিনি বললেন, তোমাদের মধ্যে আজ কেউ স্বপ্ন দেখেছ কি? কেননা আমাদের কেউ এরূপ দেখে থাকলে তা বর্ণনা করত এবং তিনি আল্লাহ যা চাইতেন সে অনুযায়ী ব্যাখ্যা করে দিতেন।
যথারীতি একদিন (ফজর সালাত শেষে) তিনি আমাদের জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের কেউ আজ কোনো স্বপ্ন দেখেছ কি? আমরা বললাম, না। তিনি বললেন, কিন্তু আমি দেখেছি যে দুজন ব্যক্তি আমার কাছে এলো। অতঃপর তারা আমাকে পবিত্র ভূমির (শাম বা বায়তুল মুকাদ্দাসের) দিকে নিয়ে গেল। সেখানে গিয়ে দেখলাম—
১. একজন ব্যক্তি বসে আছে এবং অপর ব্যক্তি একমুখ বাঁকানো ধারালো লোহার সাঁড়াশি হাতে দাঁড়িয়ে আছে। সে ওই বসা ব্যক্তির গালের এক পাশ দিয়ে ওটা ঢুকিয়ে দিয়ে ঘাড়ের পেছন পর্যন্ত চিরে দিচ্ছে। অতঃপর গালের অন্য পাশ দিয়ে ঢুকিয়ে দিয়ে ঘাড়ের পেছন পর্যন্ত চিরে দিচ্ছে। এরই মধ্যে গালের প্রথমাংশ ভালো হয়ে যায়। তখন আবার সে তা-ই করে (এভাবে একবার এগাল, একবার ওগাল চিরতে থাকে)। আমি বললাম এটা কী? তারা দুজন বলল, সামনে চলো।
২. অতঃপর আমরা এমন এক ব্যক্তির কাছে গিয়ে পৌঁছলাম, যে চিত হয়ে শুয়ে আছে। অন্য ব্যক্তি একটা ভারী পাথর নিয়ে তার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। সে ওই পাথর ছুড়ে শায়িত ব্যক্তির মাথা চূর্ণ করে দিচ্ছে। অতঃপর পাথরটি দূরে গড়িয়ে যায়। তখন লোকটি পাথরটি কুড়িয়ে আনতে যায়। এরই মধ্যে তার মাথা পূর্বের ন্যায় ঠিক হয়ে যায়। তখন পুনরায় সে পাথর ছুড়ে তার মাথা চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এটা কী? তারা বলল, সামনে চলো।
৩. আমরা সামনের দিকে চললাম। অবশেষে একটা গর্তের কাছে গেলাম, যা ছিল বড় একটা চুলার মতো। এর উপরাংশ সংকীর্ণ এবং নিচের অংশ প্রশস্ত, যার তলদেশে আগুন জ্বলছিল। আগুনের লেলিহান শিখা যখন ওপরে উঠত, তখন তার ভেতরে যারা আছে, তারাও ওপরের দিকে উঠে আসত এবং তারা গর্ত থেকে বাইরে ছিটকে পড়ার উপক্রম হতো। আবার যখন আগুন নিচে নামত, তখন তারাও নিচে নেমে যেত। এর মধ্যে ছিল একদল উলঙ্গ নারী ও পুরুষ। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এটা কী? তারা বলল, সামনে চলো।
৪. অতঃপর আমরা অগ্রসর হয়ে একটা রক্তের নদীর কিনারে এসে পৌঁছলাম। দেখলাম নদীর মাঝখানে একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে এবং নদীর কিনারে একজন দাঁড়িয়ে, যার সামনে রয়েছে একটি পাথরের খণ্ড। অতঃপর নদীর মাঝের লোকটি যখনই তীরে ওঠার জন্য অগ্রসর হচ্ছে, তখনই তীরে দাঁড়ানো লোকটি তার চেহারা লক্ষ্য করে পাথর ছুড়ে মারছে। ফলে লোকটি আবার সেখানে ফিরে যাচ্ছে, যেখানে সে আগে ছিল। এভাবে যখনই লোকটি তীরের দিকে আসার চেষ্টা করে, তখনই কিনারে দাঁড়ানো লোকটি তার মুখের ওপর পাথর মেরে তাকে পূর্বের স্থানে ফিরিয়ে দেয়, যেখানে সে ছিল। আমি বললাম, এটা কী? তারা বলল, সামনে চলো।…অতঃপর তারা আমাকে ব্যাখ্যা দিল—
১. প্রথম ব্যক্তি, যাকে সাঁড়াশি দিয়ে গাল চেরা হচ্ছিল, ওটা হলো মিথ্যাবাদী। তার কাছ থেকে মিথ্যা রটনা করা হতো। এমনকি তা সর্বত্র পৌঁছে যেত। ফলে তার সঙ্গে কিয়ামত পর্যন্ত (কবরে) ওই রকম আচরণ করা হবে, যা তুমি দেখেছ।
২. যে ব্যক্তির মাথা পাথর ছুড়ে চূর্ণ করা হচ্ছে, ওটা হলো সেই ব্যক্তি, আল্লাহ যাকে কোরআন শিক্ষা দিয়েছিলেন, অতঃপর সে কোরআন থেকে গাফেল হয়ে রাতে ঘুমাত এবং দিনেও সে অনুযায়ী আমল করত না। অতএব তার সঙ্গে কিয়ামত পর্যন্ত (কবরে) ওই রকম আচরণ করা হবে, যা তুমি দেখেছ।
৩. আগুনের চুলার গর্তে তুমি যাদের দেখেছ, ওরা হলো জেনাকার।
৪. রক্তের নদীর মধ্যে তুমি যাদের দেখেছ, ওরা হলো সুদখোর।…আর আমি হলাম জিবরিল এবং ইনি হলেন মিকাঈল। (বুখারি, হাদিস : ১৩৮৬)
