BD SYLHET NEWS
সিলেটসোমবার, ১৪ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, বিকাল ৫:৩৩
আজকের সর্বশেষ সবখবর

জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিবের দৌড়ে ৮ প্রার্থী


সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২৬ ৪:১৪ অপরাহ্ণ
Link Copied!

জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আগামী ১ জানুয়ারি নতুন মহাসচিব দায়িত্ব নেবেন।

বিশ্লেষকদের ধারণা, এবারের নির্বাচনে পরবর্তী মহাসচিব লাতিন আমেরিকা থেকে আসতে পারেন। কারণ মহাসচিবের পদটি সাধারণত বিভিন্ন মহাদেশের মধ্যে পালাক্রমে বণ্টন করা হয়। সর্বশেষ লাতিন আমেরিকার মহাসচিব ছিলেন পেরুর হাভিয়ের পেরেজ দে কুয়েলার, যিনি ১৯৯২ সালে দায়িত্ব ছাড়েন।

এবার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার ৮০ বছরে এখনো কোনো নারী মহাসচিব হননি। তাই প্রথমবারের মতো একজন নারীকে এই পদে বসানোর জন্যও দীর্ঘদিন ধরে অনানুষ্ঠানিকভাবে দাবি রয়েছে। তবে নতুন মহাসচিব এমন একটি জাতিসংঘের দায়িত্ব নেবেন, যা নানা সংকটে চাপে রয়েছে। জাতিসংঘের সবচেয়ে বড় অর্থদাতা যুক্তরাষ্ট্র স্বেচ্ছা তহবিলে অর্থ কমিয়েছে এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে বেরিয়ে গেছে। একই সঙ্গে সদস্য দেশগুলোর বকেয়া চাঁদা ও আর্থিক সংকটে জাতিসংঘের তারল্য পরিস্থিতিও কঠিন হয়ে উঠেছে।

বর্তমান মহাসচিব গুতেরেসের সময়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ গাজা ও সুদানে সংঘাত এবং ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে নতুন মহাসচিবের সামনে জাতিসংঘকে আরও কার্যকর করার বড় চ্যালেঞ্জ থাকবে।

কীভাবে নির্বাচিত হন জাতিসংঘের মহাসচিব?

পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০২৫ সালের নভেম্বরের শেষ দিকে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ও নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতিরা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থীদের মনোনয়ন আহ্বান করেন।

জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী, ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদ একজন প্রার্থীকে সুপারিশ করে। এরপর ১৯৩ সদস্যের সাধারণ পরিষদ সেই প্রার্থীর নিয়োগ অনুমোদন করে।

তবে মূল লড়াই হয় নিরাপত্তা পরিষদে। কোনো প্রার্থীকে নির্বাচিত হতে নিরাপত্তা পরিষদের অন্তত ৯ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। একই সঙ্গে পাঁচ স্থায়ী সদস্য—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন—কেউ ভেটো দিতে পারবে না।

নিরাপত্তা পরিষদ প্রথমে গোপন ও অনানুষ্ঠানিক ভোটের মাধ্যমে প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা যাচাই করে। এসব ভোটে কোনো প্রার্থীর জন্য ‘উৎসাহিত’, ‘মতামত নেই’ অথবা ‘নিরুৎসাহিত’—এই তিন ধরনের অবস্থান জানানো হয়।

এখন পর্যন্ত দুই দফা এমন ভোট হয়েছে। দ্বিতীয় দফার ভোটের পর গায়ানার প্রার্থী ক্যারোলিন রড্রিগেস-বিরকেট এগিয়ে রয়েছেন। তার পরেই রয়েছেন কোস্টারিকার রেবেকা গ্রিনস্প্যান এবং আর্জেন্টিনার রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসি।

ক্যারোলিন রড্রিগেস-বিরকেট— গায়ানা

জাতিসংঘে গায়ানার রাষ্ট্রদূত ক্যারোলিন রড্রিগেস-বিরকেট আগে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও আদিবাসীবিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৪-২৫ সালে তিনি নিরাপত্তা পরিষদে গায়ানার প্রতিনিধিত্ব করেন।

তার নির্বাচনি অঙ্গীকারের মূল বিষয় ছোট দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষা, শান্তি ও নিরাপত্তা, উন্নয়ন এবং মানবাধিকারকে সমান গুরুত্ব দেওয়া। দ্বিতীয় দফার ভোটে তিনি ৮টি ‘উৎসাহিত’, ৩টি ‘নিরুৎসাহিত’ এবং ৪টি ‘মতামত নেই’ ভোট পেয়েছেন। ফলে বর্তমানে তিনিই সবচেয়ে এগিয়ে থাকা প্রার্থী।

রেবেকা গ্রিনস্প্যান— কোস্টারিকা

রেবেকা গ্রিনস্প্যান জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা UNCTAD-এর মহাসচিব। এর আগে তিনি কোস্টারিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট ও উপ-অর্থমন্ত্রী ছিলেন।

২০২২ সালের ব্ল্যাক সি গ্রেইন ইনিশিয়েটিভ বাস্তবায়নে জাতিসংঘের নেতৃত্বাধীন আলোচনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি মহাসচিবের কার্যালয় পুনর্গঠন, মধ্যস্থতার সক্ষমতা বাড়ানো, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার ওভারলেপিং দায়িত্ব কমানো এবং প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ানোর পক্ষে।

জুলাইয়ের প্রথম ভোটে তিনি ১০টি ‘উৎসাহিত’ ভোট পেলেও আগস্টের দ্বিতীয় ভোটে তা কমে ৭টিতে নেমে আসে।

রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসি— আর্জেন্টিনা

রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসি বর্তমানে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা-এর মহাপরিচালক। প্রায় চার দশকের কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। গ্রোসি জাতিসংঘকে আরও কার্যকর করার জন্য শান্তি ও নিরাপত্তা, উন্নয়ন, মানবাধিকার, প্রশাসনিক সংস্কার এবং বাস্তববাদী বহুপাক্ষিকতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

আগস্টের ভোটে তিনি সাতটি ‘উৎসাহিত’ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলেন। তবে ছয়টি ‘নিরুৎসাহিত’ ভোটও পেয়েছেন।

তার প্রার্থিতা নিয়ে আরেকটি সমস্যা তৈরি হয়েছে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা নিয়ে আর্জেন্টিনার সঙ্গে যুক্তরাজ্যের বিরোধ। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য যুক্তরাজ্য চাইলে তার প্রার্থিতায় ভেটো দিতে পারে।

মারিয়া ফার্নান্দা এসপিনোসা— ইকুয়েডর

ইকুয়েডরের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিয়া ফার্নান্দা এসপিনোসা ২০১৮–১৯ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি ছিলেন। তিনি ছিলেন ওই পদে দায়িত্ব নেওয়া চতুর্থ নারী এবং লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের প্রথম নারী।

তার অন্যতম প্রধান প্রস্তাব হলো ‘প্রিভেনশন অ্যান্ড আর্লি অ্যাকশন হাব’ গঠন করা। এর মাধ্যমে বিভিন্ন সংকট বড় আকার ধারণ করার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

আগস্টের ভোটে তিনি মাত্র ৪টি ‘উৎসাহিত’ ভোট পান। ফলে বর্তমানে তিনি বেশ পিছিয়ে রয়েছেন।

মিশেল ব্যাশেলে— চিলি

চিলির সাবেক প্রেসিডেন্ট মিশেল ব্যাশেলে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি জাতিসংঘের অভ্যন্তরীণ আমলাতন্ত্র সংস্কার, সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংযোগ বাড়ানো এবং ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবিলায় আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে। তবে আগস্টের ভোটে তার সমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। তিনি মাত্র ২টি ‘উৎসাহিত’ এবং ৬টি ‘নিরুৎসাহিত’ ভোট পান।

ম্যাকি সাল — সেনেগাল

সেনেগালের ২০১২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ছিলেন ম্যাকি সাল। তার নির্বাচনি প্রচারের মূল বক্তব্য হলো ‘নতুন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বহুপাক্ষিকতা’। তিনি জাতিসংঘের সংঘাত প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, প্রশাসনিক কাঠামো পর্যালোচনা এবং মানবাধিকার ও উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন।

তবে তার সামনে বড় বাধা হলো—পরবর্তী মহাসচিব লাতিন আমেরিকা থেকে আসবেন, এমন প্রত্যাশা এবং প্রথম নারী মহাসচিব নির্বাচনের চাপ।

ওলারা ওতুনু— উগান্ডা

উগান্ডার অভিজ্ঞ কূটনীতিক ওলারা ওতুনু চার দশকের বেশি সময় আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে কাজ করেছেন। তিনি জাতিসংঘে উগান্ডার রাষ্ট্রদূত এবং দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন।

তিনি দায়িত্বের প্রথম দিন থেকেই ইউক্রেন, গাজা, কঙ্গো, সুদান ও ইরানের মতো সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছেন।

জুলাই থেকে আগস্টের মধ্যে নিরাপত্তা পরিষদের ভোটে তার সমর্থন সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। তবে লাতিন আমেরিকার নারী প্রার্থী না হওয়ায় তিনিও রাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকতে পারেন।

ইভোনে এ-বাকি— ইকুয়েডর

ইকুয়েডরের কূটনীতিক ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ইভোনে এ-বাকি টোঙ্গার মনোনয়নে এই দৌড়ে যুক্ত হয়েছেন। তার মূল লক্ষ্য সংঘাত প্রতিরোধ এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার। তিনি আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের মতো ঐতিহাসিকভাবে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলোর জন্য নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী প্রতিনিধিত্বের পক্ষে।

তবে আগস্টের ভোটে তিনি কোনো ‘উৎসাহিত’ ভোট পাননি। তার বিপক্ষে ৮টি ‘নিরুৎসাহিত’ এবং ৭টি ‘মতামত নেই’ ভোট পড়ে। ফলে তার প্রার্থিতা বর্তমানে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে।

সামনে কী হবে?

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে প্রার্থীদের নিয়ে আলোচনা ও লবিং আরও বাড়বে। শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের সম্মতি পাওয়া হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে গায়ানার ক্যারোলিন রড্রিগেস-বিরকেট সবচেয়ে এগিয়ে থাকলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি। আগামী কয়েক সপ্তাহে ভোটের সমীকরণ বদলে যেতে পারে।

কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।