BD SYLHET NEWS
সিলেটরবিবার, ২৩শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, রাত ১০:১৭
আজকের সর্বশেষ সবখবর

জাতিসংঘ মহাসচিব হওয়ার দৌড়ে ৮ প্রার্থী কারা


আগস্ট ২৩, ২০২৬ ৮:৪৩ অপরাহ্ণ
Link Copied!

কোনো দেশ পরিচালনা করেন না। নেই নিজস্ব সেনাবাহিনী। এমনকি কোনো সরকারকে পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করার ক্ষমতাও নেই। তারপরও জাতিসংঘ মহাসচিবের পদটি বিশ্বমঞ্চে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ।

এ পদে দায়িত্ব পালন করা ব্যক্তিরা একের পর এক যুদ্ধ এড়াতে সহায়তা করেছেন, শান্তিচুক্তি প্রণয়নে ভূমিকা রেখেছেন এবং মানবিক সংকটে বিশ্ব কীভাবে সাড়া দেবে, সেটির দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। বর্তমান মহাসচিব ও পর্তুগালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ শেষ হবে আগামী ৩১ ডিসেম্বর। পরদিন জাতিসংঘের দশম মহাসচিব হিসেবে নতুন কেউ দায়িত্ব নেবেন।

নতুন মহাসচিব বাছাইয়ের জন্য নিরাপত্তা পরিষদে এরই মধ্যে দ্বিতীয় দফায় অনানুষ্ঠানিক ভোট হয়েছে। এতে এখন পর্যন্ত আটজন প্রার্থীর পক্ষে-বিপক্ষে নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে পরিষদের ১৫টি সদস্য দেশ। প্রথম দফার অনানুষ্ঠানিক ভোটে মধ্য আমেরিকা অঞ্চলের এক প্রার্থী এগিয়ে থাকলেও তিনি দ্বিতীয় দফার ভোটে পিছিয়ে গেছেন। বিপরীতে অবস্থান মজবুত হয়েছে দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলের এক প্রার্থীর।

পরিষদে প্রথম দফার ভোটটি হয় জুলাই মাসে। গত শুক্রবার দ্বিতীয় দফার অনানুষ্ঠানিক ভোট হয়েছে। তবে এসব ভোটে এগিয়ে থাকা প্রার্থীই যে মহাসচিব হবেন, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। কারণ পরিষদের ভেটো ক্ষমতাধারী দেশগুলো যেকোনো সমীকরণ বদলে দিতে পারে। সেক্ষেত্রে নতুন কারও মহাসচিব হওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করে দেওয়া যায় না।

কারা প্রার্থী হয়েছেন?
পরবর্তী মহাসচিব হওয়ার দৌড়ে আছেন পাঁচজন নারী ও তিনজন পুরুষ। তাদের মধ্যে ক্যারোলিন রদ্রিগেস-বিরকেট গায়ানার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী। বর্তমানে তিনি জাতিসংঘে নিজ দেশের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি সংস্থাটির বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

আরেক প্রার্থী কোস্টারিকার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট রেবেকা গ্রিনস্প্যান জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার (ইউএনসিটিএডি) প্রধান। রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে কৃষ্ণসাগর শস্য উদ্যোগের সমঝোতা করাতে ২০২২ সালে তিনি ভূমিকা রাখেন। ৭০ বছর বয়সী গ্রিনস্প্যান ইহুদি পরিবারের সন্তান। হলোকাস্টের সময় তাঁর মা-বাবা কোস্টারিকায় আশ্রয় নেন।

চিলির আগুস্তো পিনোশের শাসনামলে নির্যাতনের শিকার হওয়া মিশেল বাশেলেত এবার প্রার্থী হয়েছেন। বাশেলেত চিলির প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট (২০০৬) ছিলেন। পরে তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধানের দায়িত্ব নেন। এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কয়েকটি দেশের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব তৈরি হয়। তিনি চীনের উইঘুর সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলেন।

৭৪ বছর বয়সী বাশেলেতকে সমর্থন দিয়েছে মেক্সিকো ও ব্রাজিল। তবে নিজ দেশের পক্ষ থেকে তিনি কোনো সমর্থন পাননি। গর্ভপাতের অধিকার নিয়ে কথা বলায় যুক্তরাষ্ট্রও তাঁর সমালোচনা করেছে।

বাকি প্রার্থীদের মধ্যে আছেন- ইকুয়েডরের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিয়া ফার্নান্দা এসপিনোসা (৬১)। তিনি এর আগে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনিও নিজ দেশের সমর্থন পাননি। একই দেশ থেকে প্রার্থী হয়েছেন ইভোনে আ-বাকি। ওয়াশিংটনে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালনের সময় ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল। এছাড়া, কাতারে রাষ্ট্রদূত থাকার সময় উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলেন।

এরপর আছেন আর্জেন্টিনার রাফায়েল গ্রোসি। তিনি জাতিসংঘের পরমাণু পর্যবেক্ষণ সংস্থার প্রধান। লাতিন আমেরিকা অঞ্চলের বাইরে থেকে প্রার্থী হয়েছেন মাকি সাল (৬৪)। তিনি সেনেগালের সাবেক প্রেসিডেন্ট। ২০২১ থেকে ২০২৪ সালে রাজনৈতিক বিক্ষোভ দমনে তাঁর বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের অভিযোগ আছে। এতে বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারী নিহত হন। এছাড়া, কফি আনানের সময় আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করা ওলারা ওতুনু (৭৫) এবার প্রার্থী হয়েছেন। তিনি উগান্ডার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

কোন দেশের প্রার্থীরা এগিয়ে?
শুক্রবার অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় দফার অনানুষ্ঠানিক ভোটে এগিয়ে আছেন গায়ানার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্যারোলিন রদ্রিগেস-বিরকেট। কূটনীতিক সূত্রের বরাত দিয়ে এমন তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি। নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্য দেশের প্রতিনিধিদের গোপন ভোটে পিছিয়ে গেছেন আগের মাসে এগিয়ে থাকা কোস্টারিকার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট রেবেকা গ্রিনস্প্যান।

প্রথম ও দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা প্রার্থীদের ভোটের ব্যবধান খুব বেশি নয়। তৃতীয় স্থানে আছেন, আর্জেন্টিনার রাফায়েল গ্রোসি। এরপরের অবস্থানে আছেন পর্যায়ক্রমে সেনেগালের মাকি সাল, চিলির মিশেল বেশেলেত, ইকুয়েডরের মারিয়া ফার্নান্দা এসপিনোসা ও উগান্ডার ওলারা ওতুনু।

জাতিসংঘের শীর্ষ পদটি বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে পর্যায়ক্রমে বণ্টনের একটি রীতি আছে। সে অনুযায়ী এবার লাতিন আমেরিকা থেকে কারও মহাসচিব হওয়ার কথা। দক্ষিণ আমেরিকার দেশ গায়ানা ছাড়াও এগিয়ে থাকা প্রার্থীদের অধিকাংশই এই অঞ্চলের।

নতুন প্রার্থী যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে?
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জাতিসংঘ বিষয়ক প্রধান ড্যানিয়েল ফোর্তি সম্প্রতি এএফপিকে বলেন, ‘ভেটো ক্ষমতাধারী পাঁচ দেশ নিজেদের অবস্থান জানাতে আরও সময় নিতে পারে। একইসঙ্গে নতুন প্রার্থীরাও এই দৌড়ে যোগ দিতে পারেন।’

একই ইঙ্গিত দিয়েছেন জাতিসংঘে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ভাসিলি নেবেনজিয়া। তিনি বলেন, ‘আমরা বর্তমানে যে প্রার্থীদের দেখছি, তাদের কাউকে নিয়ে যদি অচলাবস্থা তৈরি হয়, যদি কেউই এগিয়ে যেতে না পারেন, তাহলে আরও কিছু প্রার্থীকে এই দৌড়ে দেখা যেতে পারে।’

কীভাবে চূড়ান্ত প্রার্থী বাছাই
নিরাপত্তা পরিষদে এমন আরও অনানুষ্ঠানিক ভোট হওয়ার কথা আছে। সভাপতি দেশ ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টিনা লাসেন বলেছেন, পরবর্তী অনানুষ্ঠানিক ভোটের সময় নির্ধারণ নিয়ে পরিষদে আলোচনা চলছে। আর সদস্য দেশ কঙ্গোর রাষ্ট্রদূত জেনন এনগাই মুকঙ্গো বলেছেন, এখনই ঐকমত্যে পৌঁছানোর সময় আসেনি।

নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্যের মধ্যে একজন প্রার্থীকে অন্তত ৯টি ভোট পেতে হবে। একইসঙ্গে তাঁর বিপক্ষে স্থায়ী সদস্যদের ভেটো থাকা যাবে না। এই দুই বাধা পার হতে পারলে সেই প্রার্থীর নাম অনুমোদনের জন্য সাধারণ পরিষদে তোলা হয়।

১৯৮০-এর দশকের শুরুতে দুই প্রার্থীকে ভেটো দেওয়া নিয়ে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল। এ ধরনের অবস্থা যাতে পরবর্তীতে তৈরি না হয় সেজন্য চূড়ান্ত প্রার্থীকে বাছাইয়ের আগে অনানুষ্ঠানিক ভোটের ব্যবস্থা চালু হয়। স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে বিভিন্ন দেশের সমালোচনা থাকলেও প্রক্রিয়াটি এখনো চালু আছে।

নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্য কোনো প্রার্থীর বিপরীতে তিনটি মতামতের যেকোনো একটি দিতে পারে। সেগুলো হলো- সমর্থন, বিরোধিতা অথবা কোনো মত নেই। এই প্রক্রিয়ার শুরুর দিকে ব্যালটের রং একই রকম থাকে। নির্দিষ্ট সংখ্যক ভোটের পর পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের জন্য ব্যালটের রং আলাদা করা হয়। ওই সময় কোনো প্রার্থীর বিপক্ষে ভেটো থাকার বিষয়টি বোঝা যায়। তবে কোন দেশ ভেটো দিয়েছে তা জানা যায় না।

উল্লেখ্য, পরিষদের স্থায়ী পাঁচ সদস্য দেশ ভেটো ক্ষমতার অধিকারী। সেগুলো হলো- চীন, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্স। ১০টি দেশ দুই বছরের জন্য অস্থায়ী সদস্য হয়।

আগের মহাসচিবরা কেমন ছিলেন
জাতিসংঘ সনদে (১৯৪৫) মহাসচিবকে রাজনৈতিক নেতা নয়; বরং সংস্থাটি প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি জাতিসংঘ সচিবালয়ের প্রধান। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই পদে নির্বাচিত ব্যক্তিরা এমন দেশ থেকে এসেছেন, যেসব দেশকে বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয় না।

সংস্থাটির প্রথম মহাসচিব ছিলেন নরওয়ের ত্রিগভে লি। তিনি ১৯৪৬ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। কোরীয় যুদ্ধ নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরোধিতার মধ্যে তিনি পদত্যাগ করেন। এরপর ১৯৫৩ সালে দায়িত্ব পান সুইডেনের দাগ হ্যামারশোল্ড। কোনো বিষয়ে বড় শক্তিগুলোর মধ্যে মতবিরোধ থাকলে তিনি মধ্যস্থতা ও পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য মহাসচিবের কার্যালয়কে কাজে লাগাতেন।

পরবর্তী মহাসচিবরা শান্তিরক্ষায় এই পদের ভূমিকা আরও বিস্তৃত করেন। মিয়ানমারের উ থান্ট (১৯৬১-১৯৭১) কিউবার ক্ষেপণাস্ত্র সংকট ঘিরে কূটনৈতিক তৎপরতায় যুক্ত ছিলেন। অস্ট্রিয়ার কার্ট ভাল্ডহাইম (১৯৭২-১৯৮১) মধ্যপ্রাচ্য, সাইপ্রাস ও নামিবিয়ায় কাজের মাধ্যমে ‘শাটল কূটনীতি’র ধারণা এগিয়ে নেন।

পেরুর হাভিয়ের পেরেস দে কুয়েলার (১৯৮২-১৯৯১) ইরান-ইরাক যুদ্ধ অবসানে মধ্যস্থতা করেন। মিসরের বুতরোস বুতরোস-ঘালি (১৯৯২-১৯৯৬) স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের জন্য একটি কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন। ঘানার কফি আনান (১৯৯৭-২০০৬) জাতিসংঘের নিজস্ব কাঠামোর ভেতর থেকে ধাপে ধাপে উঠে এসে মহাসচিব হওয়া প্রথম ব্যক্তি।

দক্ষিণ কোরিয়ার বান কি-মুন (২০০৭-২০১৬) জলবায়ু পরিবর্তনকে অগ্রাধিকার দেন। বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সময় জাতিসংঘকে অর্থায়ন কমে যাওয়া এবং গাজা, ইউক্রেন, সুদান ও ইরান যুদ্ধের পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে। এসব যুদ্ধে স্থায়ী সদস্যদের ভেটোর কারণে বাধ্যতামূলক প্রস্তাব বারবার আটকে গেছে।

মহাসচিবের কী কী ক্ষমতা আছে
সনদের ৯৯ নম্বর অনুচ্ছেদে জাতিসংঘ মহাসচিবের রাজনৈতিক ক্ষমতার কথা বলা আছে। আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে- এমন যেকোনো বিষয়কে তিনি নিরাপত্তা পরিষদের নজরে আনতে পারেন। মিডল ইস্ট আইয়ের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাস্তবে এই ক্ষমতা খুব অল্প কয়েকবার ব্যবহার হয়েছে।

মহাসচিবের চারটি প্রধান দায়িত্বের মধ্যে আছে- মধ্যস্থতা, নেতৃত্ব, প্রশাসন ও সতর্ক করা। তিনি বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে প্রকাশ্যে বা গোপনে মধ্যস্থতা করতে পারেন। পুরো জাতিসংঘের পক্ষে কথা বলার একমাত্র কর্মকর্তা তিনি। একইসঙ্গে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের প্রধান। এছাড়া, কোনো বিষয়ে নিরাপত্তা পরিষদে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর আগে, বিভিন্ন প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে মহাসচিব ওই বিষয় সংশ্লিষ্ট পক্ষকে সতর্ক করতে পারেন।

তবে এসব দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতা প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।