লিওনেল মেসির চোখে আবার অশ্রু। সাম্প্রতিক সময়ে আর্জেন্টিনার প্রতিটি বড় ম্যাচ শেষে তাকে চোখের জলে দেখা যায়, কিন্তু স্পেনের বিপক্ষে বিশ্বকাপ ফাইনালের পর তার কান্না ছিল ভিন্ন রকম—হয়তো বিদায়ের অশ্রু।
মেটলাইফ স্টেডিয়ামে যদি রোববার হয় মেসির “লাস্ট ড্যান্স,” তবে সেই সমাপ্তিটা ছিল হোঁচট খাওয়া। ৩৯ বছর বয়সে অবিশ্বাস্যভাবে ৮ গোল করে চারটি করিয়ে আর্জেন্টিনাকে বলতে গেলে একাই ফাইনালে তুলেছিলেন তিনি, কিন্তু স্পেনের বিপক্ষে ছিলেন প্রায় অদৃশ্য। পুরো ১২০ মিনিটে মাত্র ৫৪ বার বল স্পর্শ করেছেন, কোনো সুযোগ তৈরি করতে পারেননি, আর একমাত্র শটটি নিয়েছেন ১১৭তম মিনিটে।
ছয় সপ্তাহের টুর্নামেন্টে তিনি যেন ফুটবলের “বেনজামিন বাটন” হয়ে উঠেছিলেন— গ্রুপ পর্বে আলজেরিয়ার বিপক্ষে তার হ্যাটট্রিক, পরের ম্যাচে আবার জোড়া গোল। এভাবে প্রতিটা ম্যাচে হয় গোল করেছেন নয়তো করিয়েছেন। সেমি-ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দলের দুঃসময়ে আবারও এগিয়ে আসে তার পা- বিশ্বকাপের এসব টুকরো স্মৃতি কি ভোলা যায়?
কিন্তু সময়ের কাছে তিনি অবশেষে হার মানলেন ফাইনালে এসে। আর্জেন্টিনা যখন সবচেয়ে বেশি তার জাদু চাইছিল, তখন তিনি ছিলেন নিস্তেজ।
স্পেনের দল ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। লুইস দে লা ফুয়েন্তের শিষ্যরা আবেগে নয়, নিয়ন্ত্রণে জয়ী হয়। তাদের ৩৮ ম্যাচের অপরাজিত রেকর্ডই প্রমাণ করে তারা প্রতিপক্ষকে ধীরে ধীরে দমিয়ে রাখে। আর্জেন্টিনার আবেগ, বিশৃঙ্খলা আর লড়াইয়ের বিপরীতে স্পেন ছিল ঠাণ্ডা দক্ষতার প্রতীক।
তবু যদি এটি হয় মেসির শেষ ম্যাচ, তার কান্নাই শেষ স্মৃতি হয়ে থাকবে না। ২০৭ আন্তর্জাতিক ম্যাচে ১২৫ গোল ও ৬৮ অ্যাসিস্ট দিয়েছেন তিনি। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে লাউতারো মার্তিনেজকে গোল করানো ছিল তার শেষ অ্যাসিস্ট—সেই ম্যাচ শেষে আনন্দের অশ্রু ঝরেছিল তার চোখে।
অথচ অপ্রাপ্তির বেদনা বইতে না পেরে একসময় তিনি অবসরও নিয়েছিলেন। সেই ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালে হেরে। কিন্তু পরে ফিরে এসে ২০২১ কোপা আমেরিকা ও ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ জিতে আর্জেন্টিনাকে আবার গৌরবে ফিরিয়েছিলেন। কাতারে তিনি ছিলেন নায়ক, আর যুক্তরাষ্ট্রে এই বিশ্বকাপে তার পারফরম্যান্স তাকে হয়তো মারাদোনার থেকেও উঁচুতে তুলেছে।
পেলে, মারাদোনা, রোনালদো—সবাইকে ছাড়িয়ে মেসি এখন সর্বকালের সেরা ফুটবলার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। তিনি সাধারণ একটা দলকে গ্রেট করে তুলতে পারেন, আর সেটিই প্রকৃত মহত্ত্বের পরিচয়।
ফাইনালের পর ফিফা গোল্ডেন বল পেলেন স্পেনের রদ্রি, কিন্তু দর্শকরা গাইছিলেন “মেসি, মেসি, মেসি।” রদ্রির হাতে ট্রফি থাকলেও স্মৃতিগুলো মেসির। অনেকে এবারও গোল্ডেন বল দেখছিলেন মেসির হাতে। তিনি আগেই অবশ্য দুইবার গোল্ডেন বল ও একটি বিশ্বকাপ জিতেছেন, এ নিয়ে তিনবার খেললেন ফাইনাল— সুতরাংতার আর কিছুই প্রমাণ করার নেই।
সম্ভবত ২০৩০ সালের বিশ্বকাপে ৪৩ বছর বয়সে তাকে আবার দেখা যাবে না। তাই এই ফাইনালই হয়তো তার বিদায়। ফলাফল যাই হোক, এটি ছিল এক কিংবদন্তির এক মহিমান্বিত সমাপ্তি। ৩৯ বছর বয়সে এসেও বিশ্বকাপে আলো ছড়িয়ে সিলভার বল ও সিলভার বুট জেতাও তো সাধারণ কোনো অর্জন নয়।
