BD SYLHET NEWS
সিলেটসোমবার, ১৮ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, রাত ৯:১৮
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বিয়ানীবাজারে অনলাইন জুয়ার বিস্তারের সঙ্গে বাড়ছে কিশোর গ্যাং আতঙ্ক


মে ১৮, ২০২৬ ৪:২৭ অপরাহ্ণ
Link Copied!

সিলেটের বিয়ানীবাজারে অনলাইন জুয়ার ভয়াবহ বিস্তারের পাশাপাশি উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা। প্রযুক্তির অপব্যবহার, অনলাইন জুয়ার আসক্তি, সামাজিক অবক্ষয় ও পারিবারিক নজরদারির অভাবকে কেন্দ্র করে এক শ্রেণির কিশোর-তরুণ জড়িয়ে পড়ছে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে। এতে উদ্বেগ বাড়ছে অভিভাবক, শিক্ষক, সমাজসেবী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে।স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কয়েকটি কিশোর গ্যাং গড়ে উঠেছে। এসব গ্যাংয়ের সদস্যদের অনেকেই স্কুল-কলেজ পড়ুয়া। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গ্রুপ তৈরি করে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার, মারামারি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিয়ানীবাজার পৌর শহর থেকে শুরু করে উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতেও এখন অনলাইন জুয়ার বিস্তার ঘটেছে। সহজে বেশি টাকা আয়ের আশায় অনেকেই প্রথমে কৌতূহলবশত এসব অ্যাপসে যুক্ত হলেও পরে নেশার মতো আসক্ত হয়ে পড়ছেন। শুরুতে কিছু লাভ দেখিয়ে খেলোয়াড়দের আকৃষ্ট করা হলেও পরবর্তীতে তারা হারাচ্ছেন হাজার হাজার টাকা। কেউ কেউ সর্বস্বান্ত হয়ে আত্মগোপনেও চলে যাচ্ছেন।

জুয়ার সঙ্গে জড়িত কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, স্মার্টফোনে নির্দিষ্ট কিছু অ্যাপস ডাউনলোড করে এসব খেলা পরিচালিত হয়। বর্তমানে প্রায় ১০ থেকে ১২টি অ্যাপসের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি অনলাইন জুয়া খেলা হচ্ছে। মাত্র ১০ টাকা দিয়েও খেলা শুরু করা যায়। ক্যাসিনো ও বিভিন্ন ধরনের বাজিভিত্তিক এই জুয়ার মাধ্যমে প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন হচ্ছে।

তারা জানান, এসব অ্যাপসের বেশিরভাগই বিদেশ থেকে পরিচালিত হয়। বিশেষ করে রাশিয়া, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে নিয়ন্ত্রিত কিছু প্ল্যাটফর্মের স্থানীয় প্রতিনিধি বা এজেন্ট রয়েছে বাংলাদেশে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে এসব এজেন্ট খেলোয়াড়দের কাছ থেকে টাকা গ্রহণ ও প্রদান করে থাকে। কমিশনের বিনিময়ে তারা বিদেশে অর্থ পাচারেও সহযোগিতা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক মাসে অনলাইন জুয়ার নেশায় পড়ে বিয়ানীবাজারের অন্তত কয়েকজন তরুণ আত্মগোপনে চলে যান। পরে তারা ফিরে এলেও পরিবারগুলোকে পড়তে হয়েছে চরম উদ্বেগ ও আর্থিক সংকটে। কেউ মোটরসাইকেল বিক্রি করেছেন, কেউ ধারদেনায় জড়িয়ে পড়েছেন। সম্প্রতি গত বছর এক তরুণ ব্যবসায়ীর রহস্যজনক নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। পরে তিনিও ফিরে আসেন। অনলাইন জুয়ার টাকার লোভে অনেক কিশোর প্রথমে মোবাইল গেমস ও বাজিভিত্তিক অ্যাপসে যুক্ত হয়। পরে অর্থের সংকট দেখা দিলে তারা বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। কেউ পরিবার থেকে টাকা চুরি করছে, কেউ ছিনতাই ও মারামারিতে অংশ নিচ্ছে, আবার কেউ স্থানীয়ভাবে গ্যাং সংস্কৃতির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, অনলাইন জুয়া এক ধরনের আচরণগত আসক্তি, যা মাদকের মতোই ভয়াবহ। এতে আসক্ত ব্যক্তি ধীরে ধীরে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে হতাশা, উদ্বেগ ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতায় ভুগতে পারেন।

একজন মনোবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ বলেন, “অনলাইন জুয়ার সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো এটি গোপনে খেলা যায়। পরিবারের সদস্যরা অনেক সময় বুঝতেই পারেন না সন্তান বা স্বজন কখন আসক্ত হয়ে পড়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি আত্মহত্যাপ্রবণতা, অপরাধ ও পারিবারিক ভাঙনের ঝুঁকি বাড়ায়।”

তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষকরাও বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে টার্গেটেড বিজ্ঞাপন ও বিভিন্ন অফারের মাধ্যমে তরুণদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে। অনলাইনভিত্তিক হওয়ায় এই জুয়ার কার্যক্রম শনাক্ত করা অনেক কঠিন। সাধারণ মোবাইল গেমের মতো দেখতে হওয়ায় প্রকাশ্যে খেললেও সহজে বোঝা যায় না এটি জুয়া। ফলে অভিভাবকরাও অনেক সময় বিষয়টি বুঝতে পারেন না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশেষ করে ফেসবুকে বাংলায় বিজ্ঞাপন ও আকর্ষণীয় অফারের মাধ্যমে তরুণদের টার্গেট করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে সম্প্রতি অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে তিন যুবককে গ্রেপ্তার করেছে বিয়ানীবাজার থানা পুলিশ। বুধবার (১৭ মে) রাতে উপজেলার পিএচজি উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠের কোনে রাতের আধারে জুয়া খেলা চলছে এমন গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে নাবিদ আহমদ সৌরভ, আবিদুর রহমান রানা ও সানজিদ করিম তাপাদার শুভ নামে তিনজনকে আটক করা হয়।

পুলিশ সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে একটি চক্র অনলাইনের মাধ্যমে জুয়ার কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাদের ব্যবহৃত কয়েকটি মোবাইল ফোন ওঅনলাইন লেনদেন সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জব্দ করা হয়েছে।

বিয়ানীবাজার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ওমর ফারুক বলেন, “অনলাইন জুয়া, কিশোর গ্যাং ও সামাজিক অপরাধ এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা এসব বিষয়ে নজরদারি বাড়িয়েছি এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”তিনি আরও বলেন, “অভিভাবকদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো সন্তানদের সময় দেওয়া এবং তাদের চলাফেরা ও মোবাইল ব্যবহারের বিষয়ে খোঁজ রাখা। পরিবার থেকে নৈতিক শিক্ষা নিশ্চিত করা গেলে অনেক অপরাধ প্রতিরোধ সম্ভব। অনলাইন জুয়ার সিন্ডিকেট ও কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্তে পুলিশ কাজ করছে এবং প্রয়োজনে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হবে।

সচেতন মহলের মতে, কিশোর গ্যাং ও অনলাইন জুয়ার বিস্তার ঠেকাতে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান যথেষ্ট নয়। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি তরুণদের জন্য খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।