সৃষ্টির সেবা ও জীবের প্রতি দয়া প্রদর্শন ইসলামের অন্যতম সৌন্দর্য। ইসলাম কেবল মানুষের অধিকার নিয়েই কথা বলে না, বরং প্রাণীর অধিকার ও তাদের প্রতি আচরণের বিষয়েও কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে।
ইসলাম প্রাণীহত্যাকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেনি। জীবনধারণ, খাদ্য বা কুরবানির মতো প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে প্রাণী জবাইয়ের অনুমোদন যেমন রয়েছে তেমনি অহেতুক নির্যাতন বা হত্যাকেও সম্পূর্ণরূপে হারাম বলে ঘোষণা করেছে। মহানবী (সা.)-এর বক্তব্যে এ বিষয়ে অত্যন্ত প্রগাঢ় সতর্কতা বর্ণিত হয়েছে, যার মাধ্যমে বোঝা যায় একটি ক্ষুদ্র প্রাণীর জীবনও ঈমানের পরিপূর্ণতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
এক্ষেত্রে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গির অন্যতম মর্মস্পর্শী হলো ছোট এক চড়ুই পাখিকে বিনা কারণে হত্যার বিষয়ে বর্ণিত হাদিস। মহানবী (সা.) বলেছেন: «مَنْ قَتَلَ عُصْفُورًا عَبَثًا عَجَّ إِلَى اللهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ»
‘যে ব্যক্তি কোনো চড়ুইকে বিনা কারণে হত্যা করে, কিয়ামতের দিন সেই চড়ুই আল্লাহর কাছে আর্তনাদ করবে।’ (সুনানে নাসায়ী আল-কুবরা ৪৩৪৬; আহমদ ২/১৮৫)
‘প্রাণী ক্ষুদ্র হলেও জুলুম ক্ষুদ্র নয়’এই হাদিসে ইসলাম এই নীতি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরেছে।
নামাজ আদায়কালে শরীরের ব্যায়াম হয় কিনামাজ আদায়কালে শরীরের ব্যায়াম হয় কি
এমন আরও একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা হলো সেই নারীকে নিয়ে, যিনি একটি বিড়ালকে বন্দী রেখে খাদ্য-পানীয় না দেওয়ায় জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হন। যা সহিহ বুখারির হাদিস ৩৩১৮ তে বর্ণিত হয়েছে। সেই প্রাণীটিকে হত্যা করেনি কিন্তু উপেক্ষা ও অবহেলায় সে মারা যায়।
ইসলামী নৈতিকতার দৃষ্টিতে এ অবহেলাও বিরাট জুলুম বলে চিহ্নিত হয়েছে।
এমনকি প্রাণীকে খেলার নিশানা বানানোও ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। হাদিসে এসেছে-
عَنْ هِشَامِ بْنِ زَيْدٍ قَالَ دَخَلْتُ مَعَ أَنَسٍ عَلَى الْحَكَمِ بْنِ أَيُّوبَ فَرَأٰى غِلْمَانًا أَوْ فِتْيَانًا نَصَبُوا دَجَاجَةً يَرْمُونَهَا فَقَالَ أَنَسٌ نَهٰى النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم أَنْ تُصْبَرَ الْبَهَائِمُ.
হিশাম ইবনু যায়দ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন: আমি আনাস-এর সঙ্গে হাকাম ইবনু আইয়ূবের কাছে গেলাম। তখন আনাস (রা.) দেখলেন, কয়েকজন তরুণ একটি মুরগী বেঁধে তার দিকে তীর ছুঁড়ছে।
আনাস (রা.) বললেনঃ মহানবী (সা.) জীবজন্তুকে বেঁধে এভাবে তীর ছুঁড়তে নিষেধ করেছেন। (বুখারি, হাদিস ৫৫১৩)
এ নির্দেশনার মাধ্যমে ইসলাম জীবন্ত প্রাণী দিয়ে খেলা, কসরত বা বিনোদনমূলক সহিংসতার সব রূপকে নিষেধ করে দিয়েছে।
অন্যের জন্য দোয়া করলে ফজলিতঅন্যের জন্য দোয়া করলে ফজলিত
আবার অন্যদিকে প্রয়োজনীয় জবাইয়ের ক্ষেত্রেও দয়া ও সৌন্দর্য বজায় রেখে তা সম্পাদন করার ব্যাপারেও ইসলামের নির্দেশ রয়েছে। মহানবী (সা.) বলেছেন-«إِذَا ذَبَحْتُمْ فَأَحْسِنُوا الذِّبْحَ»
‘যখন তোমরা জবাই করবে, তখন সুন্দরভাবে জবাই কর।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৯৫৫)
সুন্দরভাবে জবাই করার মধ্যে রয়েছে ধারালো ছুরি ব্যবহার, প্রাণীকে কোনো ধরনের ভয় না দেখানো, তার সামনে অন্য প্রাণীকে জবাই না করা ইত্যাদি। যার সবগুলোই ইসলামের মহৎ প্রাণীনীতিকে অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।
আমাদের মনে রাখতে হবে ইসলাম প্রাণীদের উপর অত্যাচারকে কেবল অন্যায় নয়, বরং আধ্যাত্মিক অপরাধ হিসেবেও নিরূপণ করে। তাই কোনো প্রাণীকে ক্ষুধায় কষ্ট দেওয়া, তার উপর অতিরিক্ত বোঝা চাপানো, কোনো প্রাণীকে ভয় দেখানো; এগুলোও দৃঢ়ভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। ইসলামের প্রাণীনীতিতে জান্নাতপ্রাপ্ত সেই ব্যক্তির হাদিসটি স্মরণীয়, যিনি পিপাসায় কাতর একটি কুকুরকে পানি পান করানোর কারণে মহানবী (সা.) তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছিলেন-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ ” بَيْنَمَا رَجُلٌ يَمْشِي بِطَرِيقٍ اشْتَدَّ عَلَيْهِ الْعَطَشُ فَوَجَدَ بِئْرًا فَنَزَلَ فِيهَا فَشَرِبَ ثُمَّ خَرَجَ فَإِذَا كَلْبٌ يَلْهَثُ يَأْكُلُ الثَّرَى مِنَ الْعَطَشِ فَقَالَ الرَّجُلُ لَقَدْ بَلَغَ هَذَا الْكَلْبَ مِنَ الْعَطَشِ مِثْلُ الَّذِي كَانَ بَلَغَ مِنِّي . فَنَزَلَ الْبِئْرَ فَمَلأَ خُفَّهُ مَاءً ثُمَّ أَمْسَكَهُ بِفِيهِ حَتَّى رَقِيَ فَسَقَى الْكَلْبَ فَشَكَرَ اللَّهُ لَهُ فَغَفَرَ لَهُ ” . قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ وَإِنَّ لَنَا فِي هَذِهِ الْبَهَائِمِ لأَجْرًا فَقَالَ ” فِي كُلِّ كَبِدٍ رَطْبَةٍ أَجْرٌ ”
আবূ হুরাইরাহ (রা.) হতে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: জনৈক লোক কোন রাস্তা দিয়ে হাঁটছিল, এমতাবস্থায় সে খুব তৃষ্ণার্ত হলো। সে একটি কূপ দেখতে পেয়ে তাতে নেমে পড়ল এবং পানি পান করল। তারপর সে বেরিয়ে এলো। সে সময় দেখতে পেল যে, (তৃষ্ণায় কাতর) একটি কুকুর জিভ বের করে হাপাচ্ছে আর মাটি চাটছে। লোকটি (মনে মনে) বলল, কুকুরটিকে আমার মতো তীব্র তৃষ্ণায় পেয়েছে। তখন সে কুয়ায় নামল এবং তার (চামড়ার) মোজায় পানি ভরল। তারপরে সে তার মুখে বন্ধ করে উপরে উঠল এবং কুকুরটিকে পান করাল। মহান আল্লাহ তার (এ আমলের) কদর করলেন এবং তাকে মাফ করে দিলেন। (সাহাবীগণ) প্রশ্ন করলেন, হে আল্লাহর রসূল! তাহলে কি আমাদের জন্য এসব প্রাণীর ব্যাপারেও (সদাচরণে) সাওয়াব রয়েছে? তিনি বললেন, প্রতিটি তাজা কলিজায় সাওয়াব রয়েছে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২২৪৪)
