BD SYLHET NEWS
সিলেটবুধবার, ২৮শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, বিকাল ৪:০৫
আজকের সর্বশেষ সবখবর

গর্ভাবস্থার প্রথম ৩ মাসে যে খাবারগুলো খাওয়া জরুরি


অক্টোবর ২৮, ২০২৬ ২:০৯ অপরাহ্ণ
Link Copied!

গর্ভাবস্থার প্রথম ১২ সপ্তাহ নিয়ে গঠিত প্রথম ট্রাইমেস্টারটি শিশুর বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়। এই শুরুর সপ্তাহগুলোতে শিশুর মস্তিষ্ক, মেরুদণ্ড, হৃদপিণ্ড এবং অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ গঠিত হতে শুরু করে। সুষম খাদ্যাভ্যাস এই বিকাশে সহায়তা করার পাশাপাশি মায়ের পরিবর্তিত পুষ্টির চাহিদাও পূরণ করতে পারে।

তবে গর্ভাবস্থায় পুষ্টির অর্থ এই নয় যে আপনাকে দুজন মানুষের সমান খাবার খেতে হবে। বরং এর অর্থ হলো পুষ্টিগুণে ভরপুর খাবার নির্বাচন করা, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা এবং নিরাপদ খাদ্যাভ্যাস মেনে চলা।

মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডের বিকাশের জন্য ফলিক অ্যাসিড

গর্ভাবস্থার শুরুর দিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদানগুলোর মধ্যে একটি হলো ফলিক অ্যাসিড। ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড এক্সপেরিমেন্টাল অবস্টেট্রিক্স অ্যান্ড গাইনোকোলজি (Clinical and Experimental Obstetrics & Gynecology) জার্নালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, এটি নিউরাল টিউব ডিফেক্ট (neural tube defects) প্রতিরোধে সাহায্য করে, যা শিশুর মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডের বিকাশের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। যেহেতু গর্ভাবস্থার প্রথম কয়েক সপ্তাহেই নিউরাল টিউব গঠিত হয়, তাই গর্ভাবস্থা নিশ্চিত হওয়ার আগেই পর্যাপ্ত পরিমাণে ফলিক অ্যাসিড গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।

কী কী খাবেন: সবুজ শাক-সবজি, শিম জাতীয় বীজ, ডাল, লেবুজাতীয় ফল এবং ফর্টিফাইড (পুষ্টি উপাদান যুক্ত) সিরিয়াল বা শস্যজাতীয় খাবার।

গর্ভবতী নারীদের অথবা যারা গর্ভধারণের পরিকল্পনা করছেন, তাদের সাধারণত প্রতিদিন ৪০০ মাইক্রোগ্রাম ফলিক অ্যাসিডযুক্ত সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়। গর্ভধারণের আগে থেকেই এটি শুরু করা এবং গর্ভাবস্থার প্রথম ১২ সপ্তাহ পর্যন্ত চালিয়ে যাওয়া সবচেয়ে ভালো।

কারও কারও শারীরিক ইতিহাসের ওপর ভিত্তি করে উচ্চ মাত্রার ফলিক অ্যাসিডের প্রয়োজন হতে পারে; সেক্ষেত্রে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলতে হবে।

রক্ত তৈরিতে সহায়তার জন্য আয়রন

গর্ভাবস্থায় শরীরে হিমোগ্লোবিন তৈরির জন্য আরও বেশি আয়রনের প্রয়োজন হয়; হিমোগ্লোবিন হলো রক্তে অক্সিজেন বহনকারী প্রোটিন। পর্যাপ্ত আয়রন গ্রহণ করলে আয়রনের ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতা (অ্যানিমিয়া) প্রতিরোধ করা যায়, যা ক্লান্তি, দুর্বলতা, মাথা ঘোরা এবং শ্বাসকষ্টের কারণ হতে পারে।

কী কী খাবেন: ডাল, ছোলা, শিম জাতীয় বীজ, পালং শাক, চর্বিহীন মাংস এবং আয়রনসমৃদ্ধ সিরিয়াল। উদ্ভিজ্জ উৎস থেকে পাওয়া আয়রন শরীরে ভালোভাবে শোষিত হওয়ার জন্য এর সাথে ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ খাবার- যেমন আমলকী, কমলা, পেয়ারা বা টমেটো খেতে পারেন। চা ও কফি খাবার থেকে আয়রন শোষণের হার কমিয়ে দিতে পারে, তাই আয়রনসমৃদ্ধ খাবার বা চিকিৎসকের দেওয়া আয়রন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের সময় চা বা কফি পান করা এড়িয়ে চলাই ভালো। গর্ভাবস্থায় স্থানীয় নির্দেশিকা এবং ব্যক্তিগত চাহিদার ওপর ভিত্তি করে আয়রন সাপ্লিমেন্ট বা পরিপূরক গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হতে পারে। নিজে থেকে উচ্চ মাত্রার সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ না করে আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলুন।

বৃদ্ধি ও টিস্যু গঠনের জন্য প্রোটিন

এক্সপেরিমেন্টাল বায়োলজি অ্যান্ড মেডিসিন (Experimental Biology and Medicine) জার্নালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রোটিন শিশুর কোষ ও টিস্যুর বৃদ্ধিতে সহায়তা করে এবং গর্ভাবস্থা এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে মায়ের শরীরের টিস্যুগুলোকে ভালো রাখতে সাহায্য করে।

কী কী অন্তর্ভুক্ত করবেন: ডিম, দুধ, দই, পনির, ডাল, শিম বা মটরশুঁটি জাতীয় খাবার, টোফু, বাদাম, বীজ এবং ভালোভাবে রান্না করা মাছ বা চর্বিহীন মাংস। আপনার প্রধান খাবারগুলোতে প্রোটিনের উৎস রাখার চেষ্টা করুন। উদাহরণস্বরূপ, রুটির সঙ্গে ডাল, সবজি খাবারের সঙ্গে দই, অথবা হোল-হুইট টোস্টের (আটার তৈরি টোস্ট) সাথে ডিম খেতে পারেন। যারা নিরামিষাশী, তারা ডাল, দুগ্ধজাত খাবার, সয়া-ভিত্তিক খাবার, বাদাম এবং বিভিন্ন বীজের সমন্বয়ে তাদের প্রোটিনের চাহিদা পূরণ করতে পারেন।

হাড় ও দাঁতের জন্য ক্যালসিয়াম

শিশুর হাড় ও দাঁত গঠনের জন্য ক্যালসিয়াম অপরিহার্য। এটি মায়ের হাড়ের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে এবং পেশি ও স্নায়ুর স্বাভাবিক কার্যকারিতা বজায় রাখতেও সাহায্য করে।

কী কী অন্তর্ভুক্ত করবেন: দুধ, দই, পনির, ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ উদ্ভিদ-ভিত্তিক দুধ, তিল এবং ক্যালসিয়াম যোগ করে তৈরি টোফু।

ভিটামিন ডি শরীরকে ক্যালসিয়াম শোষণে সাহায্য করে, তাই গর্ভাবস্থায় এই দুটি পুষ্টি উপাদানই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপনার খাদ্যাভ্যাস, স্বাস্থ্য এবং গর্ভাবস্থা বিষয়ক স্থানীয় নির্দেশিকার ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসক আপনাকে সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের পরামর্শ দিতে পারেন।

হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য ভিটামিন ডি

ভিটামিন ডি ক্যালসিয়াম শোষণে সহায়তা করে এবং হাড়ের সুস্থ গঠনে অবদান রাখে। ফুড সায়েন্স অ্যান্ড নিউট্রিশন (Food Science & Nutrition) জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণা অনুযায়ী, শরীরে ভিটামিন ডি-এর মাত্রা কম থাকলে তা মায়ের স্বাস্থ্য এবং শিশুর বিকাশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

কী কী অন্তর্ভুক্ত করবেন: ডিম, চর্বিযুক্ত মাছ, ফর্টিফাইড (পুষ্টি উপাদান যোগ করা হয়েছে এমন) খাবার এবং যেখানে পাওয়া যায়, সেখানে ভিটামিন ডি যুক্ত দুধ।

সূর্যালোক শরীরকে ভিটামিন ডি তৈরিতে সাহায্য করে, তবে ত্বকের ধরন, ঋতু, ভৌগোলিক অবস্থান এবং সূর্যের আলোতে থাকার সময়ের ওপর ভিত্তি করে শরীরে ভিটামিন ডি তৈরির পরিমাণ ভিন্ন হতে পারে। আপনার শরীরে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি থাকার ঝুঁকি থাকলে, পরীক্ষা করানো বা সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের বিষয়ে চিকিৎসকের সাথে আলোচনা করুন।

মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য আয়োডিন

থাইরয়েড হরমোন তৈরির জন্য আয়োডিন প্রয়োজন, যা শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ ও বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যা অন্তর্ভুক্ত করবেন: পরিমিত পরিমাণে আয়োডিনযুক্ত লবণ, দুগ্ধজাত খাবার, ডিম এবং সামুদ্রিক খাবার।

আয়োডিনবিহীন বিশেষ ধরনের লবণের ওপর নির্ভর না করে আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার করুন। শরীরে আয়োডিনের মাত্রা বাড়ানোর জন্য লবণের গ্রহণ বাড়াবেন না এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া উচ্চমাত্রার আয়োডিন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করবেন না।

ভিটামিন বি ১২ (Vitamin B12) এবং ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড

ভিটামিন বি১২ লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে এবং স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশে সহায়তা করে। যারা নিরামিষ বা ভেগান (সম্পূর্ণ উদ্ভিদভিত্তিক) খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করেন, তাদের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; কারণ ভিটামিন বি১২-এর প্রাকৃতিক উৎসগুলো মূলত প্রাণিজ।

যা অন্তর্ভুক্ত করবেন: দুধ, দই, ডিম, মাছ, মাংস এবং ভিটামিন বি১২ সমৃদ্ধ (ফর্টিফাইড) খাবার। যারা ভেগান খাদ্যাভ্যাস মেনে চলেন, তাদের সাধারণত ভিটামিন বি১২-এর কোনো নির্ভরযোগ্য ফর্টিফাইড উৎস বা সাপ্লিমেন্টের প্রয়োজন হয়।

ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, বিশেষ করে ডিএইচএ (DHA), শিশুর মস্তিষ্ক ও চোখের বিকাশে সহায়তা করে। সার্ডিন ও স্যামনের মতো কম পারদযুক্ত তৈলাক্ত মাছ থেকে ডিএইচএ পাওয়া যেতে পারে। যে সব গর্ভবতী নারী মাছ খান না, তারা চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে শৈবাল (algae) থেকে তৈরি ডিএইচএ সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করতে পারেন।

তরল খাবার, ফাইবার এবং খাদ্য নিরাপত্তা

গর্ভাবস্থার শুরুর দিকে কোষ্ঠকাঠিন্য, বমি বমি ভাব এবং বমি হওয়া খুবই সাধারণ বিষয়। পর্যাপ্ত পানি পান করা, ফাইবার বা আঁশযুক্ত খাবার খাওয়া এবং অল্প অল্প করে বারবার খাবার খেলে এই সমস্যাগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়।

কী কী খাবেন: পানি, স্যুপ, ফলমূল, শাক-সবজি, শস্যদানা, ডাল এবং অন্যান্য ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার।

ফল ও শাক-সবজি ভালোভাবে ধুয়ে নিন, ডিম ও মাংস পুরোপুরি রান্না করে খান, পাস্তুরিত নয় এমন দুগ্ধজাত পণ্য এড়িয়ে চলুন এবং কাঁচা বা আধা-সিদ্ধ সামুদ্রিক খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকুন। গর্ভাবস্থায় অ্যালকোহল পান করবেন না এবং ক্যাফেইন গ্রহণের পরিমাণ দিনে ২০০ মিলিগ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখুন (যদি না আপনার চিকিৎসক অন্য কোনো পরামর্শ দেন)।

বিভিন্ন ধরনের পুষ্টিকর ও সুষম খাবার এবং সঠিক সাপ্লিমেন্ট গর্ভাবস্থার শুরু থেকেই একটি সুস্থ গর্ভাবস্থা বজায় রাখতে সাহায্য করে। আপনার পুষ্টির চাহিদা পূরণের জন্য খুব ব্যয়বহুল খাবার বা বিশেষ কোনো খাদ্যের প্রয়োজন নেই। যদি বমি বমি ভাবের কারণে খাওয়া-দাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, ওজন কমতে থাকে অথবা কোনো কিছু খেলে বমি হয়ে বেরিয়ে যায়, তবে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। আপনার স্বাস্থ্য, খাদ্যাভ্যাস এবং পুষ্টির চাহিদার ওপর ভিত্তি করে আপনার জন্য উপযুক্ত খাদ্যাভ্যাস ও সাপ্লিমেন্ট নির্ধারণ করতে চিকিৎসক আপনাকে সাহায্য করতে পারেন।

কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।