BD SYLHET NEWS
সিলেটসোমবার, ৫ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, রাত ১০:১০
আজকের সর্বশেষ সবখবর

যে স্বভাব উত্তম চরিত্র অর্জনের পথে প্রধান অন্তরায়


অক্টোবর ৫, ২০২৬ ৭:৩০ অপরাহ্ণ
Link Copied!

মানুষের হৃদয়ের সব রোগের সমুদ্র হলো রাগ। এই বিষয়ে একটি হাদিস রয়েছে, যদিও এর সনদে কিছু দুর্বলতা আছে, তবে এর অর্থ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সামনে এসে জিজ্ঞেস করলেন, আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের জন্য সবচেয়ে ভালো কাজ কোনটি? তিনি উত্তর দিলেন, ভালো চরিত্র। এরপর লোকটি তাঁর ডান পাশে গিয়ে একই প্রশ্ন করলে তিনি একই উত্তর দিলেন। তারপর বাম পাশে এবং পেছনে গিয়েও একই প্রশ্ন করলে তিনি প্রতিবারই বললেন, ভালো চরিত্র। এরপর শেষবার তিনি বললেন, ‘তুমি কি বোঝোনি? রাগ করো না।’

অন্য আরেকটি হাদিসে এসেছে, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞেস করেছিলেন, আল্লাহর কাছে মানুষের কোন বিষয়টি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর? উত্তরে তিনি বললেন, আল্লাহর রাগ। লোকটি জিজ্ঞেস করলেন, তা হলে তা থেকে কীভাবে রক্ষা পাওয়া যাবে? তিনি উত্তর দিলেন, তুমি নিজে রাগ করো না, তাহলে আল্লাহও তোমার ওপর রাগ করবেন না। মানুষ যেমন আচরণ করে, তার প্রতিও তেমনই প্রকাশ পায়। এ ছাড়া আরও একটি বিখ্যাত হাদিসে এক ব্যক্তি এসে বারবার উপদেশ চাইলে নবীজি তাকে প্রতিবারই বললেন, ‘রাগ করো না।’ এই রাগ নিয়ন্ত্রণ করাই হলো ভালো চরিত্রের মূল চাবিকাঠি।

নফসে মুতমাইন্নাহ অর্জনের উপায় কী?
আলেমগণ বলেন, রাসুলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এই কথার অর্থ এই নয় যে রাগ অনুভবই করা যাবে না। কারণ খোদ আল্লাহর রাসুলও বলেছেন যে তিনিও একজন মানুষ এবং সাধারণ মানুষের মতোই তাঁরও রাগ হয়। রাগ হলে তাঁর চেহারায় ও কপালে রগের প্রকাশ ঘটত। অর্থাৎ, রাগ অনুভূতির দিক থেকে কোনো নেতিবাচক বিষয় নয়; বরং এটি মানব চরিত্রের জন্য একটি অপরিহার্য বিষয়। মানুষ যদি রাগ করতে না জানত, তবে অনেক কাজই সম্পন্ন হতো না। তবে সেই রাগ যদি এমন কিছুতে রূপান্তর করা না হয় যা মানুষের জন্য কল্যাণকর, তবে তা তাকে ধ্বংস করে দেবে। আলেমদের মতে, এর অর্থ হলো রাগ যেন তোমার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা না করে, বরং তুমিই তোমার রাগের নিয়ন্ত্রণকর্তা হও।

রাগ অনেকটা শিকারি কুকুরের মতো। তাকে যদি ঠিকমতো প্রশিক্ষণ না দেওয়া হয়, তবে সে আপনার প্রয়োজনের জিনিস শিকার করতে পারবে না। তাই রাগেরও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। কারণ পৃথিবীতে যত অন্যায় ঘটে, মানুষ যদি রাগ করতে না জানত, তবে তার অনেকগুলোরই কোনো প্রতিবাদ হতো না। মানুষ নির্বিঘ্নে অন্যায় করে যেত এবং কেউ তাতে প্রতিবাদী হয়ে উঠত না। আল্লাহ তাআলা চান না যে আমরা এমনটি করি। তিনি চান আমরা রাগ করি, তবে নিজের স্বার্থে নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। অন্যান্য অন্তরের রোগের মতো এই রাগকেও এমনভাবে রূপান্তর করতে হবে যাতে তা আপনার বিরুদ্ধে কাজ না করে আপনার পক্ষে কাজ করে। এটিকে সমুদ্র বলা হয়েছে কারণ এই রাগ ও ক্ষোভের সমুদ্রে বহু মানুষ ডুবে যায় এবং তা তাদের ধ্বংস ও হতাশার দিকে নিয়ে যায়।

মানুষের আত্মার চারটি মৌলিক গুণ বা শক্তি রয়েছে। প্রথম গুণটি হলো জ্ঞান-বুদ্ধি ও যুক্তি। দ্বিতীয় গুণটি হলো ক্রোধ বা রাগ। ইমাম গাজালি (রহ.) একবার বলেছিলেন, মদ পানের বিধান নিষিদ্ধ হওয়ার একটি বড় কারণ হলো বেশিরভাগ মানুষ মদ্যপান করলে তাদের আসল রূপ বা ভেতরের রাগ প্রকাশ পেয়ে যায়। তারা তখন মারমুখী হয়ে ওঠে।

তৃতীয় গুণটি হলো প্রবৃত্তি বা কামবাসনা। চতুর্থ গুণটি হলো এমন এক সামঞ্জস্যপূর্ণ শক্তি, যা এই তিনটি শক্তিকে ভারসাম্যপূর্ণ রাখে, যাতে মানুষ সুস্থভাবে জীবনযাপন করতে পারে এবং এর কোনোটিই যেন ভারসাম্য হারিয়ে না ফেলে।

পশ্চিমা ও ইসলামী উভয় ঐতিহ্যেই এই গুণগুলোর কথা বলা হয়েছে। যখন মানুষের যুক্তিবাদী আত্মা ভারসাম্যপূর্ণ থাকে, তখন তার ফলশ্রুতিতে প্রজ্ঞা বা হিকমাহ অর্জিত হয়। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, যাকে প্রজ্ঞা দেওয়া হয়েছে তাকে প্রচুর কল্যাণ দান করা হয়েছে। ইমাম গাজালির মতে, প্রজ্ঞা হলো অজ্ঞতা এবং চতুরতার মধ্যবর্তী একটি বিষয়। মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মা যদি ভারসাম্যহীন হয়, তবে তার পরিণাম হয় বোকামি। মানুষ তখন নানা ধরনের নির্বোধের মতো কাজ করতে শুরু করে। যদি তা মাত্রাতিরিক্ত হয়, তবে তার ফল দাঁড়ায় ফন্দিফিকির ও প্রতারণা। মানুষ তখন নিজের বুদ্ধিকে অপব্যবহার করে অন্যকে ঠকাতে ও শোষণ করতে শুরু করে। বর্তমান যুগের বড় বড় প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীদের মধ্যে এই মাত্রাতিরিক্ত বুদ্ধিবৃত্তিক চতুরতা বা কৌশল প্রায়ই দেখা যায়।

মানুষের ক্রোধ যখন নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং দুটি চরম সীমার মাঝে ভারসাম্য বজায় রাখে, তখন তা হয় সঠিক মাত্রা। এর এক প্রান্তে রয়েছে হঠকারিতা বা উন্মত্ততা, যেখানে মানুষ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং পরে অনুশোচনা করতে হয় এমন কাজ করে। অন্য প্রান্তে রয়েছে চরম কাপুরুষতা, যেখানে মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার সাহস পায় না।

তৃতীয় শক্তি অর্থাৎ কামবাসনার প্রতি মানুষ যদি পুরোপুরি উদাসীন হয়ে যায় এবং তাতে কোনো আগ্রহ না থাকে, তবে তা ইসলামের দৃষ্টিতে স্বাস্থ্যকর নয় এবং নবীজি (সা.) এটি পছন্দ করতেন না। এর অন্য প্রান্তটি হলো পাপাচার বা ফিসক, যেখানে মানুষ নিজের প্রবৃত্তির গোলাম হয়ে পড়ে এবং ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে।

চতুর্থ বিষয়টি হলো ইনসাফ বা ন্যায়বিচার, যা অন্য কোনো গুণের মধ্যবর্তী কোনো বিষয় নয়, বরং এটি নিজেই একটি স্বতন্ত্র মানদণ্ড। এই গুণগুলো যখন ভারসাম্যে থাকে, তখন মানুষ ন্যায়পরায়ণ হয়। যখন এগুলো ভারসাম্য হারায়, তখন মানুষ নিজের ওপর এবং অন্যের ওপর অবিচার বা জুলুম করে।

উদাহরণস্বরূপ, কেউ যদি তার প্রবৃত্তিকে মাত্রাতিরিক্ত সুযোগ দেয়, তবে সে তার নিজের আত্মাকেই নিপীড়ন করছে, কারণ আত্মা এমন কাজের জন্য সৃষ্টি হয়নি। আল্লাহ তাআলা বলেন, খাও এবং পান করো, কিন্তু অপচয় করো না। পরিমিত আহারের বিষয়টি এখন একটি বিজ্ঞান। মানুষের শরীরের আকার অনুযায়ী ক্যালোরির হিসাব নির্ধারণ করা সম্ভব। এর চেয়ে বেশি বা কম খেলে তা শরীরের ওপর এক ধরনের জুলুম হয়ে দাঁড়ায়।

আল্লাহ তাআলা মানুষের স্বভাবের মধ্যে এমন এক প্রাকৃতিক ভারসাম্য রেখেছেন যে, সুস্থ অবস্থায় মানুষ প্রয়োজন অনুপাতে খেয়েই তৃপ্তিবোধ করে। এর বেশি খেলে তা আত্মার জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণেই নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, মানুষ পেটের চেয়ে খারাপ কোনো পাত্র ভরাট করে না। খাওয়ার সঠিক নিয়ম হলো পেটের এক ভাগ খাবার, এক ভাগ পানি এবং এক ভাগ বাতাসের জন্য খালি রাখা। এর বেশি খাওয়া মানে খাওয়ার পরিমিত সীমা লঙ্ঘন করা। একইভাবে জৈবিক চাহিদার ক্ষেত্রেও যদি স্বাভাবিক সীমারেখা লঙ্ঘন করা হয়, তবে তা বিশৃঙ্খলা ডেকে আনে। বর্তমান সমাজের দিকে তাকালে দেখা যায়, বয়সের সাথে সাথে মানুষের জৈবিক চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই হ্রাসের কথা থাকলেও অনেকে তা কৃত্রিম উপায়ে ধরে রাখতে চান এবং মানসিক বাসনার মোহে নানা অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়েন।

কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।