BD SYLHET NEWS
সিলেটরবিবার, ২৩শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, রাত ১১:২৯
আজকের সর্বশেষ সবখবর

যুবকদের মসজিদমুখী করার ১০ উপায়


আগস্ট ২৩, ২০২৬ ৮:৪৮ অপরাহ্ণ
Link Copied!

একটি জাতির ভবিষ্যৎ তার তরুণ প্রজন্মের হাতে। আজকের যুবকই আগামী দিনের শিক্ষক, আলেম, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, উদ্যোক্তা, সমাজনেতা ও রাষ্ট্রের কর্ণধার। তাই তরুণদের ঈমান, চরিত্র ও নৈতিকতা যত শক্তিশালী হবে, সমাজ ও জাতির ভবিষ্যৎও তত সুন্দর হবে। আর এই সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণে মসজিদের ভূমিকা অপরিসীম।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে মসজিদ ছিল ইবাদতের পাশাপাশি শিক্ষা, দাওয়াত, সামাজিক সম্প্রীতি ও মানবিকতার প্রাণকেন্দ্র। তাই যুবসমাজকে মসজিদমুখী করা মানে শুধু তাদের নামাজের কাতারে দাঁড় করানো নয়; বরং তাদের হৃদয়কে আল্লাহর সঙ্গে যুক্ত করা।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহর মসজিদগুলো তো তারাই আবাদ করে, যারা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, সালাত কায়েম করে, জাকাত দেয় এবং আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করে না। আশা করা যায়, তারাই হেদায়েতপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ১৮)
যুবকদের মসজিদমুখী করার গুরুত্ব

যুবক বয়স মানুষের জীবনের শক্তি, উদ্যম ও সম্ভাবনায় ভরা সময়। এই সময়টি যদি ঈমান ও নেক আমলের পথে পরিচালিত করা যায়, তাহলে পুরো জীবনই কল্যাণময় হতে পারে। আর যদি এই শক্তি নেশা, অশ্লীলতা, অপরাধ, অনৈতিক সম্পর্ক ও অর্থহীন বিনোদনে নষ্ট হয়, তাহলে ব্যক্তি যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তেমনি পরিবার ও সমাজও ক্ষতির সম্মুখীন হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) সাত শ্রেণির এমন মানুষকে কিয়ামতের দিন আল্লাহর বিশেষ ছায়ার সুসংবাদ দিয়েছেন, যেদিন তাঁর ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না। তাঁদের একজন হলেন, ‘সে যুবক, যে আল্লাহর ইবাদতের মধ্যে বেড়ে উঠেছে।’ আরেকজন হলেন, ‘সে ব্যক্তি, যার অন্তর মসজিদের সঙ্গে সম্পৃক্ত।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৬০)
এ হাদিস যুবকদের মসজিদমুখী করার মর্যাদা ও গুরুত্ব অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

১. ভালোবাসা দিয়ে কাছে টানতে হবে

যুবকদের মসজিদমুখী করার প্রথম শর্ত হলো—তাদের প্রতি ভালোবাসা ও আন্তরিকতা। শুধু কঠোর ভাষায় ধমক দিয়ে কিংবা ভুলের জন্য অপমান করে তাদের মসজিদে ধরে রাখা যায় না। যে যুবক আজ মসজিদে আসে না, তাকে শত্রু মনে না করে তাকে নিজের ভাই মনে করতে হবে। তার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করতে হবে, তার কথা শুনতে হবে এবং তার সমস্যাগুলো বোঝার চেষ্টা করতে হবে। মসজিদকে তার কাছে ভয়ের জায়গা নয়, ভালোবাসা ও প্রশান্তির জায়গা হিসেবে তুলে ধরতে হবে।

২. ইমাম ও বয়োজ্যেষ্ঠদের আচরণ হতে হবে কোমল

যুবকদের মসজিদ থেকে দূরে সরে যাওয়ার একটি কারণ কখনো কখনো বয়োজ্যেষ্ঠদের কঠোর আচরণও হতে পারে। পোশাক, চুল, কথা বলা কিংবা ছোটখাটো ভুলের কারণে প্রকাশ্যে অপমান করা হলে সে হয়তো মসজিদেই আসা ছেড়ে দেবে। আল্লাহ তাআলা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কোমলতার প্রশংসা করে বলেন, ‘আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ দয়ার কারণেই আপনি তাদের প্রতি কোমল হয়েছেন। আপনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, তাহলে তারা আপনার চারপাশ থেকে সরে যেত।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৫৯)

তাই যুবকদের সংশোধন করতে হবে হিকমত, ভালোবাসা ও ধৈর্যের মাধ্যমে।

৩. মসজিদকে তরুণবান্ধব পরিবেশে পরিণত করতে হবে

মসজিদের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন, সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ হওয়া উচিত। যুবকদের বসার সুযোগ, কুরআন-হাদিস পাঠের ব্যবস্থা, ইসলামি বইয়ের লাইব্রেরি এবং উপকারী আলোচনা তাদের মসজিদের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে পারে। মসজিদে এমন পরিবেশ তৈরি করা দরকার, যেখানে একজন তরুণ নামাজের পাশাপাশি তার দ্বীনি জ্ঞান, ব্যক্তিত্ব ও সামাজিক সম্পর্কও উন্নত করতে পারে।

৪. যুবকদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে

শুধু মিম্বারে দাঁড়িয়ে যুবকদের উদ্দেশে উপদেশ দিলেই হবে না। ইমাম, আলেম ও সমাজের সচেতন ব্যক্তিদের তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। তাদের পড়াশোনা, কর্মজীবন, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, পারিবারিক সমস্যা ও মানসিক চাপের কথা শুনতে হবে। তারা যেন মনে করে—“মসজিদের ইমাম আমার অভিভাবক, আলেমরা আমার শুভাকাঙ্ক্ষী।” এ সম্পর্ক তৈরি হলে দ্বীনি কথা তাদের হৃদয়ে অনেক সহজে পৌঁছাবে।

৫. যুবকদের দায়িত্ব দিতে হবে

যুবকদের শুধু শ্রোতা বানিয়ে রাখলে হবে না; তাদের মসজিদের বিভিন্ন ভালো কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে। যেমন— মসজিদ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় অংশগ্রহণ, কোরআন শিক্ষা কার্যক্রমে সহযোগিতা, দাওয়াতি কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ, অসহায় মানুষের সাহায্যে যুক্ত হওয়া, ইসলামি অনুষ্ঠান পরিচালনায় সহযোগিতা ও সামাজিক সেবামূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ ইত্যাদী। আর এভাবে দায়িত্ব পেলে তাদের মধ্যে মসজিদের প্রতি আপনত্ব ও দায়বদ্ধতা সৃষ্টি হবে।

৬. যুবকদের জন্য আলাদা শিক্ষামূলক কার্যক্রম চালু করা

বর্তমান যুগের তরুণদের প্রশ্ন, চিন্তা ও চ্যালেঞ্জ আগের সময়ের তুলনায় অনেক বিস্তৃত। তাই তাদের জন্য নিয়মিত কুরআন-হাদিসের পাশাপাশি সমসাময়িক বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করা যেতে পারে। যেমন, যুবকদের ইসলামি জীবনযাপন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের আদব, হারাম সম্পর্ক থেকে বাঁচার উপায়, নেশা থেকে মুক্তির পথ, ক্যারিয়ার ও ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি, অর্থ উপার্জনে হালাল-হারাম ইত্যাদি। এ ধরনের বাস্তবমুখী আলোচনা তরুণদের কাছে মসজিদের প্রাসঙ্গিকতা বাড়িয়ে দেবে।

৭. খেলাধুলা ও সামাজিক কার্যক্রমের সুযোগ তৈরি করা

ইসলাম যুবকদের স্বাভাবিক আনন্দ-বিনোদনকে নিষিদ্ধ করেনি। বৈধ ও শালীন বিনোদনের সুযোগ রেখে তাদের দ্বীনের সঙ্গে যুক্ত করা দরকার। মসজিদকেন্দ্রিক সামাজিক উদ্যোগ, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, শিক্ষামূলক প্রতিযোগিতা, কুইজ, কুরআন তিলাওয়াত ও হিফজ প্রতিযোগিতা, রক্তদান বা মানবিক সহায়তা কর্মসূচি তরুণদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব তৈরি করতে পারে। তবে এসব কার্যক্রমের উদ্দেশ্য হবে মসজিদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা এবং নেক কাজে উৎসাহিত করা।

৮. নামাজের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করতে হবে

যুবকদের শুধু বলতে হবে না—‘নামাজ পড়ো।’ বরং বোঝাতে হবে, নামাজ কেন মানুষের জীবনের প্রশান্তির উৎস। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই সালাত অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।’ (সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ৪৫)

যে তরুণ বুঝতে পারবে নামাজ তাকে পাপ থেকে রক্ষা করে, আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করে এবং অন্তরে প্রশান্তি আনে, সে নামাজ ও মসজিদের প্রতি আগ্রহী হবে।

৯. আদর্শ যুবকদের সামনে তুলে ধরতে হবে

যুবকদের সামনে সাহাবায়ে কেরাম ও ইসলামের ইতিহাসের তরুণ আদর্শগুলো তুলে ধরা অত্যন্ত কার্যকর। তাঁদের ঈমান, ত্যাগ, জ্ঞান, সাহস ও চরিত্রের ঘটনা তরুণদের অনুপ্রাণিত করতে পারে। বিশেষ করে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবিদের মধ্যে যারা অল্প বয়সে ইসলাম গ্রহণ করে দ্বীনের জন্য অসাধারণ ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের জীবন তরুণদের সামনে তুলে ধরা উচিত।

১০. প্রযুক্তির যুগে প্রযুক্তিকে দাওয়াতের কাজে ব্যবহার করতে হবে

বর্তমান সময়ে যুবকদের একটি বড় অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সক্রিয়। তাই তাদের কাছে পৌঁছাতে মসজিদ ও ইসলামি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহার করতে হবে। মসজিদের কার্যক্রম, সংক্ষিপ্ত দ্বীনি আলোচনা, কোরআন-হাদিসের শিক্ষা, যুবকদের জন্য উপকারী পরামর্শ এবং সামাজিক সেবামূলক কার্যক্রম অনলাইনে প্রচার করা যেতে পারে। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে—ডিজিটাল মাধ্যম যেন মসজিদের বিকল্প না হয়; বরং মসজিদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির সেতু হয়।

সুতরাং যুবকদের মসজিদমুখী করা কোনো একদিনের কর্মসূচি নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও ঈমানি দায়িত্ব। তাদের ধমক দিয়ে নয়, ভালোবাসা দিয়ে কাছে টানতে হবে; অপমান করে নয়, সম্মান দিয়ে সংশোধন করতে হবে; শুধু উপদেশ দিয়ে নয়, নিজেদের আদর্শ দিয়ে পথ দেখাতে হবে। আর মসজিদের সঙ্গে যে তরুণের হৃদয়ের বন্ধন তৈরি হবে, তার ভবিষ্যৎ আল্লাহর ইচ্ছায় অনেক অন্ধকার পথ থেকে সুরক্ষিত থেকে থাকবে। ইনশাআল্লাহ।

কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।