ঢালিউডে ইদানীং অনেকেই ‘শিকার’ করতে বেরিয়েছেন। কেউ সিনেমা নিয়ে, কেউ মিউজিক ভিডিও নিয়ে, কেউ আবার ওয়েব ফিল্ম নিয়ে। মজার ব্যাপার হলো—শিকার আলাদা, শিকারিও আলাদা, কিন্তু নামের ‘জঙ্গলে’ ঢুকলে সবাইকে বেশ কাছাকাছিই মনে হয়!
সম্প্রতি অপু বিশ্বাস নেপালে গিয়েছেন ‘শিকার’ সিনেমার শুটিংয়ে। এর পরপরই জায়েদ খান হাজির ‘শিকারি’ শিরোনামের মিউজিক ভিডিও নিয়ে। এরইমধ্যে মৌ খান ঘোষণা দিয়েছেন ‘শিকারি’ নামে নতুন ওয়েব ফিল্মের। ফলে প্রশ্ন জাগতেই পারে—ঢালিউডে এখন কি শিকারের মৌসুম চলছে?
অবশ্য, ঘটনাটা একেবারেই নতুন নয়। ‘শিকার’ কিংবা ‘শিকারি’ নাম দুটি বাংলা বিনোদন জগতে বহুদিন ধরেই ঘুরে বেড়াচ্ছে। অর্থাৎ বর্তমানে এই নাম-সাদৃশ্যকে নিছক কাকতালীয় বললেও পুরো গল্পটা শেষ হয় না। বরং পুরোনো পাতাগুলো উল্টালে দেখা যায়, এই দুই শব্দের প্রতি নির্মাতাদের আলাদা দুর্বলতা আছে।
১৯৫৮ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ন্যাশনাল ফিল্মসের ব্যানারে মুক্তি পেয়েছিল ‘শিকার’। মঙ্গল চক্রবর্তীর পরিচালিত সিনেমাটিতে অভিনয় করেছিলেন উত্তম কুমার, অরুন্ধতী দেবী, অসিতবরণ মুখোপাধ্যায়, দীপক মুখোপাধ্যায় ও নির্মল কুমারের মতো তারকারা। সংগীত পরিচালনায় ছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। অর্থাৎ ‘শিকার’ নামের গল্পের শুরুটাও বেশ তারকাবহুল।
এর কয়েক দশক পর অর্থাৎ আশির দশকে ঢাকাই চলচ্চিত্রেও তৈরি হয় ‘শিকার’। এম এম সরকার পরিচালিত সিনেমাটিতে ছিলেন অঞ্জু ঘোষ, জাফর ইকবাল, ইলিয়াস কাঞ্চন ও রাজীবের মতো জনপ্রিয় তারকারা। দুই বাংলার দুই সময়ে ‘শিকার’—নাম একই, কিন্তু সময়, গল্প ও তারকারা আলাদা।
টেলিভিশনেও ‘শিকার’ কম যায়নি। জাকিয়া বারী মম, জিয়াউল ফারুক অপূর্ব ও মৌসুমী হামিদ অভিনীত ‘শিকার’ নাটক প্রচারিত হয়েছে এটিএন বাংলায়। এর বাইরে দুই বাংলায় ‘শিকার’ নামে আরো নাটক, শর্টফিল্ম কিংবা পথনাটক নির্মিত হয়েছে। অর্থাৎ সিনেমার পর্দা থেকে টেলিভিশন, সেখান থেকে মঞ্চ—শিকার সর্বত্রই ঘুরে বেড়িয়েছে।
তবে ‘শিকারি’ শব্দটিও পিছিয়ে নেই। ২০০১ সালে এম এন ইস্পাহানী নির্মাণ করেন ‘শিকারি’। এতে শাকিব খানের বিপরীতে ছিলেন পূর্ণিমা। আর ২০১৬ সালে সেই শাকিব খানই আবার বড়পর্দায় হাজির হন ‘শিকারি’ নিয়ে। বাংলাদেশ-ভারত যৌথ প্রযোজনার এই সিনেমায় তার বিপরীতে ছিলেন শ্রাবন্তী চ্যাটার্জি। জাজ মাল্টিমিডিয়া ও এসকে মুভিজের প্রযোজনায় নির্মিত সিনেমাটি পরিচালনা করেন জাকির হোসেন সীমান্ত ও জয়দীপ মুখার্জি।
একই বছর ‘শিকারি’ নামে প্রতিবাদী পথনাটকও নির্মাণ করেন নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু। অর্থাৎ ‘শিকারি’ শুধু বিনোদনের চরিত্র নয়, কখনো প্রতিবাদের ভাষাও হয়েছে।
এখন আবার ফিরে আসা যাক বর্তমান সময়ে। অপু বিশ্বাসের ‘শিকার’, জায়েদ খানের ‘শিকারি’, মৌ খানের ‘শিকারি’—তিনটি আলাদা মাধ্যমের আলাদা আলাদা কাজ। কিন্তু নামের মিল এমন যে দর্শকের মনে স্বাভাবিকভাবেই কৌতূহল তৈরি হয়। বিশেষ করে একই সময়ে যখন ‘শিকার’ ও ‘শিকারি’ পাশাপাশি হাজির হয়, তখন মনে হয় ঢালিউড বুঝি নামের ক্ষেত্রেও কোনো সিনেমাটিক ইউনিভার্স তৈরি করেছে!
তবে বিষয়টি শুধু মজার নয়, এর মধ্যে একটা বাস্তবতাও আছে। চলচ্চিত্র, নাটক কিংবা ওয়েব কনটেন্টে এমন কিছু শব্দ আছে, যেগুলো নির্মাতাদের কাছে দীর্ঘদিন ধরে আকর্ষণীয়। ‘রাজা’, ‘বাদশা’, ‘প্রেম’, ‘ভালোবাসা’, ‘নিশি’, ‘অপরাধ’, ‘খেলা’—এ ধরনের শব্দের মতো ‘শিকার’ও সহজে কৌতূহল তৈরি করে। কারণ শব্দটির মধ্যেই আছে টানটান উত্তেজনা! কে শিকার করছে, কাকে করছে, কেন করছে, শেষ পর্যন্ত কে শিকার হচ্ছেন?
আর এখানেই মজাটা সবচেয়ে বেশি। যদি প্রশ্ন করা হয়, ‘শিকারি কে?’—উত্তর দিতে গেলেই বিপদ। শাকিব খান একসময় ‘শিকারি’, জায়েদ খান এখন ‘শিকারি’, মৌ খানও ‘শিকারি’। আর অপু বিশ্বাসের সিনেমার নাম ‘শিকার’। ফলে দর্শক চাইলে মজা করে পাল্টা প্রশ্ন করতেই পারেন—এত শিকারি যখন মাঠে, শিকারটা আসলে কে?
এ প্রশ্নের সহজ উত্তর হয়তো দর্শক। কারণ শেষ পর্যন্ত সিনেমা, গান কিংবা ওয়েব ফিল্মের আসল শিকার তো দর্শকের মনোযোগই। নামের চমক দিয়ে তাকে টানতে পারলে প্রথম ধাপের শিকার সম্পন্ন। এরপর গল্প ভালো হলে দর্শক থাকবেন, না হলে শিকারি যত বড়ই হোক—শিকার হাতছাড়া!
তাই ঢালিউডে ‘শিকার’ ও ‘শিকারি’-এর এই ফিরে আসাকে শুধু নামের পুনরাবৃত্তি হিসেবে দেখলে পুরো গল্পটা ধরা পড়ে না। এর মধ্যে আছে বাংলা বিনোদন জগতের পুরোনো নাম-নির্ভরতার সংস্কৃতি, পরিচিত শব্দে দর্শক টানার কৌশল এবং একই সঙ্গে কাকতালীয়ও বটে!
একদিকে নেপালে ‘শিকার’, অন্যদিকে মিউজিক ভিডিওতে ‘শিকারি’, আবার ওয়েব ফিল্মেও ‘শিকারি’। অতীতের পাতায় উত্তম কুমার, অঞ্জু ঘোষ, শাকিব খান, পূর্ণিমা থেকে বর্তমানের তারকারা—শিকার আর শিকারি বারবার ফিরে আসছে।
