BD SYLHET NEWS
সিলেটবুধবার, ৫ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, রাত ১০:১০
আজকের সর্বশেষ সবখবর

জুলাই জাদুঘর কোনো একক রাজনৈতিক ভাষ্যের স্থান হবে না: প্রধানমন্ত্রী


আগস্ট ৫, ২০২৬ ২:৩০ অপরাহ্ণ
Link Copied!

‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ কোনো দল, গোষ্ঠী বা ব্যক্তির একক রাজনৈতিক ভাষ্য প্রতিষ্ঠার স্থান হবে না বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

বৃহস্পতিবার সকালে শেরেবাংলা নগরে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণ আশা করে, এই জাদুঘর কোনো একটি দল, গোষ্ঠী বা ব্যক্তির একক রাজনৈতিক ভাষ্য প্রতিষ্ঠার স্থান হবে না। কারণ, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান কোনো একক ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা দলের নয়। এই অভ্যুত্থানের মহানায়ক দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণ।”

তিনি বলেন, “আমি প্রায়ই একটি কথা বলি, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল স্বাধীনতা অর্জনের, আর ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার। জনগণ যেমন মুক্তিযোদ্ধাদের ভুলে যায়নি, তেমনি ২০২৪ সালে দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষায় যারা শহীদ হয়েছেন, তাদেরও ভুলবে না।”

অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী জাদুঘরের ফলক উন্মোচন করেন। এ সময় সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস উপস্থিত ছিলেন।

জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। পরে কোরআন, গীতা, ত্রিপিটক ও বাইবেল থেকে পাঠ করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে শহীদদের নামে তাদের নিজ নিজ এলাকায় সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কিংবা সড়কের নামকরণ করা হবে।”

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহতদের জন্য সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, সরকারি হাসপাতালে আহতদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। গুরুতর আহতদের উন্নত চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, তুরস্ক ও রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয়েছে।

“বর্তমানে ৫০ জন জুলাই যোদ্ধা বিদেশে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। গেজেটভুক্ত জুলাই যোদ্ধাদের মধ্যে ১৩ হাজারের বেশি ব্যক্তিকে তাদের নিজস্ব ব্যাংক হিসাবে শ্রেণিভিত্তিক মাসিক সম্মানী ভাতা দেওয়া হচ্ছে।”

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি বর্তমান সরকার শহীদদের ‘কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠার কাজও শুরু করেছে।

“দেশ পুনর্গঠনের লক্ষ্যে ৩১ দফা নির্বাচনি ইশতেহারের পাশাপাশি জাতীয় সংসদের সাউথ প্লাজায় স্বাক্ষরিত জুলাই সনদের পর্যায়ক্রমিক বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে।”

তিনি বলেন, গণভোটসংক্রান্ত প্রত্যাশা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদের ‘সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’ও কাজ শুরু করেছে।

“দেশ পুনর্গঠনের মাধ্যমে একটি সনির্ভর সমৃদ্ধ নিরাপদ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আমরা শহীদদের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়বো ইনশাআল্লাহ।”

বিরোধ দলকে ইংগিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমি আজ এই অনুষ্ঠানে একটি বিষয়ে জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে কেউ কেউ অহেতুক ইস্যু তৈরি করে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির অপচেষ্টা শুরু করেছেন।

“এসব পরিস্থিতিতে তৈরি করে তারা নিজেদের অজান্তেই পতিত পরাজিত পলাতক স্বৈরাচারের পুনরুত্থানের পথ সুগম করছেন কিনা, সেটি ভেবে দেখা প্রয়োজন আমাদের।”

জুলাই অভ্যুত্থান এবং তার পরের সময়ে ‘গণতন্ত্র ও জনগণের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার” সশস্ত্র বাহিনীকে ধন্যবাদ দেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, “এই বাংলাদেশ আর কখনোই তাবেদার রাষ্ট্রে পরিণত হবে না—এই প্রত্যাশায় ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’-এর শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করছি।”

জাদুঘর প্রতিষ্ঠায় যুক্ত স্থপতি, ইতিহাসবিদ, গবেষক, জাদুঘর বিশেষজ্ঞ, শিল্পী, সংগ্রাহক, কারিগর, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান সরকারপ্রধান।

২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে চলে যান।

সেই খবর পেয়ে তখনকার প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন গণভবনের দখল নেয় জনতা। আনন্দ উৎসবের আমেজে সরকারপ্রধানের বাসভবনে ভাঙচুর, লুটপাট চলে।

পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গণভবনকে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ হিসেবে রূপান্তরের উদ্যোগ শুরু হয়। উপদেষ্টা পরিষদ ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর এ প্রস্তাবে অনুমোদন দেয়।

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আলোকচিত্র, বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্ন, নিহতদের পোশাক, চিঠিপত্র, গুরুত্বপূর্ণ দলিল, সে সময়ের সংবাদপত্রের কাটিং এবং অডিও-ভিডিওসহ বিভিন্ন উপকরণ সংরক্ষণ করা হয়েছে এ জাদুঘরে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ঘটনাবলীও চিত্রায়িত করা হয়েছে।

অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে সেই জাদুঘরের উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “আজকের দিনটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে আরেকটি যুগান্তকারী মাইলফলক।”

তিনি বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী’ আন্দোলনে হাজারো মানুষ গুম, অপহরণ, নির্যাতন ও রাজনৈতিক মামলার শিকার হয়েছেন। জুলাই-আগাস্টের গণঅভ্যুত্থানে হাজারো ছাত্র-জনতা, নারী ও শিশু নিহত হয়েছেন এবং অন্তত ৩০ হাজার মানুষ আহত হয়েছেন।

“আমি ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সব শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। হতাহতদের পরিবারের প্রতি জানাই গভীর সমবেদনা,” বলেন তারেক রহমান।

তিনি বলেন, “জুলাই-অগাস্টের গণঅভ্যুত্থন ঠেকাতে ফ্যাসিস্ট চক্র হেলিকপ্টার থেকে গুলি করেও গণতন্ত্রকামী জনগণকে হত্যা করেছিল। পতিত পরাজিত বিতাড়িত ফ্যাসিস্টদের এমন নৃশংসতা, এমন বর্বরতা সভ্য জগতে বিরল।

“ফ্যাসিবাদী শাসনামলে গুম খুন অপহরণকে স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত করে ফেলা হয়েছিল। দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে চলা এই নৃশংসতা শুধুমাত্র স্বাধীনতা পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে তিন বছরের দুঃশাসনের সঙ্গেই তুলনা চলে।”

তারেক রহমান বলেন, “এমন বাস্তবতায়, আজকের ঐতিহাসিক ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে তাদের পূর্বসূরিদের সাহসী ইতিহাস যেমন তুলে ধরবে, অপরদিকে তাদের সামনে উম্মোচিত হবে বিতাড়িত ফ্যাসিস্টদের মুখোশ।”

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই জাদুঘর শুধু ২০২৪ সালের ঘটনার স্মারক নয়, বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার ধারাবাহিক ইতিহাসেরও দলিল হওয়া উচিত।

“শুধু জুলাই গণঅভ্যুত্থান নয়, বাংলাদেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাসও এখানে সংরক্ষিত থাকা জরুরি।”

তিনি বলেন, জাদুঘরে জুলাই-গাস্টের শহীদদের জীবনকথা, আহতদের সাক্ষ্য, আন্দোলনে অংশ নেওয়া মানুষের অভিজ্ঞতা, আলোকচিত্র, ভিডিও, সংবাদ প্রতিবেদন, পোস্টার, দেয়াললিখন, গ্রাফিতি, কার্টুন, কবিতা, গান, নাটক, চিত্রকর্ম, ব্যক্তিগত স্মারক এবং ডিজিটাল উপকরণ সংরক্ষণ করা উচিত।

“আমি বিশ্বাস করি, অসম্পূর্ণ, অতিরঞ্জিত বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বয়ান ইতিহাসকে শক্তিশালী করে না; বরং ইতিহাসের বিশ্বাসযোগ্যতাকে দুর্বল করে এবং ভবিষ্যতে বিভেদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই প্রতিটি বিষয়ে যথাসম্ভব সত্যতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।”

জাদুঘরের তথ্য বাংলা ভাষার পাশাপাশি ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষায় উপস্থাপনেরও আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে যারা হতাহত হয়েছেন, পর্যায়ক্রমে প্রতিটি ঘটনার বিচার হবে। আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সেই বিচার হবে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য।”

তিনি বলেন, “আইনের শাসন নিশ্চিত করতে প্রতিটি অপরাধের বিচার হওয়া জরুরি।”

সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায়ের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, প্রধানমন্ত্রীর সংস্কৃতি ও তথ্য-সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান এবং সংস্কৃতি সচিব কানিজ মাওলা।

জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদ আবদুল্লাহ বিন জাহিদের মা ফাতেমাতুজ্জোহরা, শাহরিয়ার খান আনসের মা সানজিদা খান দীপ্তি এবং জুলাই যোদ্ধা নিশাত তাবাসসুম প্রাপ্তিও অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন।

মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, প্রধান হুইপ, সংসদ সদস্য, তিন বাহিনীর প্রধান, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার, কূটনীতিক, বিশিষ্ট নাগরিক, শিক্ষাবিদ এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রীর কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমানও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।