BD SYLHET NEWS
সিলেটরবিবার, ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, সন্ধ্যা ৬:২৪
আজকের সর্বশেষ সবখবর

নদীর দুই পাড়েই চাঁদা, দিনে ১৫০ টাকা দেন মাঝিরা


সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬ ৩:৪৯ অপরাহ্ণ
Link Copied!

বুড়িগঙ্গার এক পাড়ে পুরান ঢাকা, অন্য পাড়ে কেরানীগঞ্জ। তিন দশকের বেশি সময় ধরে এই নদীতে ডিঙিনৌকায় যাত্রী পারাপার করেন রহমত আলী (ছদ্মনাম)। গত ৫ জুলাই কেরানীগঞ্জ থেকে তাঁর নৌকায় উঠলাম। জানতে চাইলাম, কত টাকা আয় হয়, কত খরচ হয়।

রহমত বললেন, আয় ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। এর মধ্যে নৌকার ভাড়া দিনে ১২০ টাকা। মাঝিরা যদি ধোপাঘাট থেকে যাত্রী ওঠান, তাহলে চাঁদা দিতে হয় দিনে ১০০ টাকা। আর যদি বাদামতলী থেকে যাত্রী ওঠান, তাহলে দিতে হয় ৫০ টাকা। দুই পাড় থেকে ওঠালে ১৫০ টাকা। কোনো কোনো মাঝি তাই দুই ঘাট থেকে যাত্রী না নিয়ে এক ঘাট থেকে নেন এবং ওপারে নামিয়ে খালি নৌকা নিয়ে চলে আসেন। আর দিনে ১৫ টাকা দিতে হয় নৌকা পাহারার নামে।

নৌকার মাঝিদের কাছ থেকে এই চাঁদাবাজি চলছে বছরের পর বছর ধরে। সরকার বদলালে দেশজুড়ে চাঁদাবাজির যেমন হাত বদলায়, তেমনি বুড়িগঙ্গার ঘাটগুলোতেও চাঁদা নেওয়ার লোক বদলে যায়।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) সূত্রে জানা গেছে, বুড়িগঙ্গা নদীর নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে কেরানীগঞ্জের জিনজিরা টিনপট্টিঘাট পর্যন্ত মোট ১৭টি ঘাট রয়েছে। এসব ঘাটে পণ্যবাহী ও যাত্রীবাহী নৌযান থামে। এর মধ্যে ১৫টি ঘাটের ৪৪টি জায়গা থেকে ডিঙিনৌকায় করে যাত্রী পারাপার করা হয়। কোনো কোনো ঘাটে ইঞ্জিনচালিত নৌকাও চলে।

রহমত বললেন, আয় ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। এর মধ্যে নৌকার ভাড়া দিনে ১২০ টাকা। মাঝিরা যদি ধোপাঘাট থেকে যাত্রী ওঠান, তাহলে চাঁদা দিতে হয় দিনে ১০০ টাকা। আর যদি বাদামতলী থেকে যাত্রী ওঠান, তাহলে দিতে হয় ৫০ টাকা। দুই পাড় থেকে ওঠালে ১৫০ টাকা।

বিআইডব্লিউটিএ ঘাটগুলো ইজারা দেয়। তাদের ট্যারিফ শিডিউলে ডিঙিনৌকা থেকে টাকা আদায়ের কথা বলা হয়নি। অন্যান্য নৌযানের ক্ষেত্রে নির্ধারিত ফি থাকলেও ডিঙিনৌকার ক্ষেত্রে তা নেই।

অবশ্য ঘাটের ইজারাদারেরা মাঝিদের কাছ থেকে ইচ্ছেমতো হারে টাকা আদায় করেন। গত ৫ ও ৬ জুলাই এবং ৩ ও ৬ সেপ্টেম্বর বুড়িগঙ্গা নদীর ১৫টি ঘাটের ১৮টি জায়গায় গিয়ে মাঝিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চাঁদার পরিমাণ ৩৫ থেকে ১৫০ টাকা।

জানতে চাইলে বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক মোবারক হোসেন মজুমদার বলেন, ট্যারিফ শিডিউলে ডিঙিনৌকায় যাত্রী পারাপারের বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কোনো কিছু বলা নেই। তবে নৌকায় মালামাল বহনের বিষয়ে উল্লেখ আছে। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে নৌকার মাঝি ও ইজারাদারেরা সমঝোতার ভিত্তিতে একটা ফি নির্ধারণ করে নৌকা চালান। আমার কাছে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার কোনো অভিযোগ আসেনি।’

অবশ্য নৌকার মাঝিদের ভাষ্য, চাঁদা না দিয়ে তাঁদের উপায় নেই। যদি কোনো মাঝি চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানান, তাহলে মারধর করার ঘটনাও ঘটে। শিডিউলে সুনির্দিষ্টভাবে ফি নির্ধারণ না করে বিআইডব্লিউটিএ চাঁদাবাজির সুযোগ করে দিয়েছে।

অবশ্য ঘাটের ইজারাদারেরা মাঝিদের কাছ থেকে ইচ্ছেমতো হারে টাকা আদায় করেন। গত ৫ ও ৬ জুলাই এবং ৩ ও ৬ সেপ্টেম্বর বুড়িগঙ্গা নদীর ১৫টি ঘাটের ১৮টি জায়গায় গিয়ে মাঝিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চাঁদার পরিমাণ ৩৫ থেকে ১৫০ টাকা।

ঢুকতেও টাকা, বের হতেও টাকা
বুড়িগঙ্গার ওপার থেকে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা কাজে ঢাকা মহানগরে আসেন বহু মানুষ। আবার এপার থেকে অনেকে ওপারে যান। সহজে যাতায়াতের জন্য ভরসা নৌকা। কারণ, সেতু দিয়ে যাতায়াত করতে গেলে অনেক পথ ঘুরে তাঁদের গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়। সদরঘাটের আশপাশের ঘাটগুলোতে নৌকা ভাড়া প্রতিজন ১০ টাকা। কিছু ঘাটে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় প্রতিজন ৫ টাকা নেওয়া হয়।

সদরঘাটের আশপাশে কিছু ঘাটে ঢোকার সময়ই টোল দিতে হয়। যেমন সদরঘাটের ওয়াইজঘাট-আগা নগর খেয়াঘাটে প্রতিজন প্রবেশ ফি ৫ টাকা। বের হওয়ার ক্ষেত্রেও প্রতিজন ৫ টাকা করে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে।

বিআইডব্লিউটিএর ট্যারিফ শিডিউল অনুযায়ী খেয়াঘাটে প্রবেশের জন্য যাত্রীর কাছ থেকে দুই টাকা করে টোল দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু তা অনেক ক্ষেত্রেই মানা যায় না।

কেরানীগঞ্জের আগা নগরের বাসিন্দা মো. ইব্রাহীম পুরান ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালের কর্মচারী। প্রতিদিন তিনি ডিঙিনৌকা দিয়ে বুড়িগঙ্গা নদী পার হয়ে কর্মস্থলে যান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ঘাটে অবস্থা এমন যে ঘুরতে–ফিরতে টাকা দেওয়া লাগে। ঘাটের লোকদের সঙ্গে এসব নিয়ে প্রায়ই ঝগড়া করতে হয়।

মাঝিরা জানিয়েছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আগে দিতে হতো দিনে ৬০ টাকা করে। অভ্যুত্থানের পর কয়েক মাস টাকা নেওয়া বন্ধ ছিল। এরপর ২০ টাকা করে নেওয়া শুরু হয়। বাড়তে বাড়তে তা ১০০ টাকায় উঠেছে।

ইজারাদার কারা
কেরানীগঞ্জের ধোপাঘাটে গত ৫ জুলাই বিকেল চারটার দিকে গিয়ে দেখা যায়, প্রবীণ এক ব্যক্তি খাতা হাতে নৌকার মাঝিদের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছেন। তাঁর নাম চিত্তরঞ্জন। জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনি ঘাটের ব্যবস্থাপক। ঘাটের ‘খাজনা’ ও নৌকাভাড়ার টাকা আদায় করেন তিনি।

ধোপাঘাট থেকে যাত্রী নিলে নৌকার মাঝিদের দিনে ১০০ টাকা করে দিতে হয়, যেটা বিআইডব্লিউটিএর ট্যারিফ শিডিউলে নেই। মাঝিরা জানিয়েছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আগে দিতে হতো দিনে ৬০ টাকা করে। অভ্যুত্থানের পর কয়েক মাস টাকা নেওয়া বন্ধ ছিল। এরপর ২০ টাকা করে নেওয়া শুরু হয়। বাড়তে বাড়তে তা ১০০ টাকায় উঠেছে।

ঘাটটির ইজারাদার আগা নগর ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক মেরাজ হোসেন (জুম্মন)। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘গতবার (২০২৫-২৬) আমি ঘাট ইজারা নিয়ে লোকসান গুনেছি। তাই এবার মাঝিদের সঙ্গে আলোচনা করে খাজনা বৃদ্ধি করেছি।’

ওয়াইজ ঘাট থেকে যাত্রী নিতে নৌকাপ্রতি দৈনিক চাঁদা ৩৫ টাকা। আর ইঞ্জিনচালিত নৌকায় প্রতিবার দিতে হয় ৩০ টাকা। ঘাটের ইজারাদার ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শ্রমিক দলের আহ্বায়ক সুমন ভূঁইয়া। তাঁর মুঠোফোনে যোগাযোগ করেও সাড়া পাওয়া যায়নি।

নৌকার মাঝি ও বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা গেছে, ঘাটগুলোর ইজারাদারেরা বেশির ভাগই ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মী।

মাঝিরা নৌকার মালিক হতে পারেন না
১৯৯৮ সালে বরিশাল থেকে এসে বুড়িগঙ্গা নদীতে নৌকা চালানো শুরু করেন রমজান আলী। তাঁর নিজের কোনো নৌকা নেই। অন্যের নৌকা ভাড়া চালান। যদিও ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকায় একটি নৌকা কেনা যায়।

নিজের নৌকা নেই কেন, জানতে চাইলে রমজান আলী বলেন, টাকা থাকলেও মাঝিরা নৌকা কিনতে পারেন না। এখানে নৌকা নামাতেও প্রভাব থাকতে হয়। যদি মাঝিদের কেউ নৌকা কেনেন, তাহলে তা চুরি হয়ে যাবে।

মাঝিদের সূত্রে জানা যায়, ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা দামের একটি নৌকা থেকে দিনে ১২০ টাকা করে মাসে আয় ৩ হাজার ৬০০ টাকা। এ কারণে নৌকার মালিকানা লাভজনক ব্যবসা। তাই স্থানীয় প্রভাবশালীরা নৌকার মালিকানা ধরে রাখেন। যেমন আগা নগর ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের মেরাজুল হোসেনের একারই রয়েছে ৪০টি নৌকা।

দেশজুড়ে অপ্রাতিষ্ঠানিক ব্যবসাগুলো নিয়ন্ত্রিত হয় রাজনৈতিক ও পেশিশক্তি দিয়ে। বুড়িগঙ্গার ডিঙিনৌকার ঘাটগুলো সেটার একটা উদাহরণ মাত্র। চাঁদাবাজি ঠেকিয়ে স্বল্প খরচে মানুষের যাতায়াতের সুবিধা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাঁদের, তাঁরা ‘অভিযোগ যায়নি’ বলে দায় এড়ান।

কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।