সিলেটের মুরারিচাঁদ কলেজে (এমসি কলেজ) ছাত্রাবাসে স্বামীকে আটকে রেখে গৃহবধূকে দলবদ্ধ ধর্ষণের মামলার রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। রায়ে একজনকে মৃত্যুদণ্ড ও তিনজনের যাবজ্জীবন সাজা দেন আদালত। এই মামলায় চারজনকে খালাস দেওয়া হয়েছে। ঘটনার পাঁচ বছর নয় মাস পর আজ মঙ্গলবার সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক বিশেষ জজ স্বপন কুমার সরকার এ রায় প্রদান করেন।
প্রধান অভিযুক্ত সাইফুর রহমানকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন— শাহ মাহবুবুর রহমান ওরফে রনি, তারেকুল ইসলাম ওরফে তারেক ও অর্জুন লস্কর। খালাস পেয়েছেন— মিসবাউল ইসলাম ওরফে রাজন, রবিউল হাসান ও মাহফুজুর রহমান মাসুম। দণ্ড ও খালাসপ্রাপ্ত সবাই নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের কর্মী।
২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ধর্ষণের ঘটনাটি ঘটে। এ ঘটনায় শাহপরাণ থানায় ছয়জনের নাম উল্লেখসহ আটজনের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন ভুক্তভোগীর স্বামী। পরে অভিযান চালিয়ে আসামিদের গ্রেপ্তার করে পুলিশ ও র্যাব।
ছাত্রাবাস থেকে অভিযুক্ত সাইফুর রহমানের কক্ষে তল্লাশি চালিয়ে একটি পাইপগান, ৪টি রামদা, ২টি চাকু উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় শাহপরান থানায় অস্ত্র আইনে পৃথক মামলা করা হয়। এছাড়া অপহরণ ও চাঁদাবাজির ঘটনায় আরেকটি মামলা করে পুলিশ। তিনটি মামলারই চার্জশিট দেওয়া হয় ওই সময়।
বর্তমানে আসামিরা কারাগারে বন্দী রয়েছেন। ডিএনএ পরীক্ষায় আট আসামির মধ্যে ছয়জনের ধর্ষণের আলামতের সাথে মিল পাওয়া যায়। ২০২১ সালের ৩ ডিসেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহপরাণ থানার পরিদর্শক ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য আটজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেন।
অভিযোগপত্রভুক্ত আসামিরা হলেন—নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ কর্মী সাইফুর রহমান, শাহ মাহবুবুর রহমান ওরফে রনি, তারেকুল ইসলাম ওরফে তারেক, অর্জুন লস্কর, আইনুদ্দিন ওরফে আইনুল, মিসবাউল ইসলাম ওরফে রাজন, রবিউল হাসান ও মাহফুজুর রহমান মাসুম। তাঁদের মধ্যে আসামি সাইফুর, রনি, মাসুম ও রবিউল এমসি কলেজের ছাত্র হওয়ায় ওই সময় কলেজ কর্তৃপক্ষ তাঁদের বহিষ্কার ও ছাত্রত্ব বাতিল করে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ও ৪ জনের ছাত্রত্ব ও সার্টিফিকেট বাতিল করে।
২০২২ সালে চাঞ্চল্যকর এই মামলাটি সিলেটের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতে চলাকালে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরের জন্য উচ্চ আদালতে আবেদন করেন বাদী। ওই বছরের ১৫ ডিসেম্বর বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি আহমেদ সোহেলের হাইকোর্ট বেঞ্চ দলবদ্ধ ধর্ষণ ও চাঁদাবাজির মামলা দুটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর আদেশ দেন। ওই আদেশে ৩০ দিনের মধ্যে এ বিষয়ে গেজেট জারি করতেও বলা হয়েছিল। তবে তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল উচ্চ আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন না করে ওই আদেশের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করেন; যা ছিল নজিরবিহীন।
আইনজীবীরা সে সময় রাষ্ট্রপক্ষের ওই আপিলকে ‘বিচার না চাওয়ার’ সঙ্গে তুলনা করেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সরকার পরিবর্তনের পর গতবছর রাষ্ট্রপক্ষ সেই আপিল আবেদন তুলে নিলে মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়।
গত বছরের ৬ মে ট্রাইব্যুনালে এই মামলার প্রথম শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। একই বছরের ১৩ মে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে গত বৃহস্পতিবার উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হয়। এই মামলায় ধর্ষণের শিকার নারী, তাঁর স্বামী, স্বীকারোক্তি নেওয়া ম্যাজিস্ট্রেট শারমিন খানম লিনা, সাইফুর রহমান ও জিয়াদুর রহমান, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য, এমসি কলেজের অধ্যাপক তৌফিক ইয়াজদানী চৌধুরী ও ওসমানী হাসপাতালের চিকিৎসকসহ সর্বমোট ২৪ জন আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন।
