BD SYLHET NEWS
সিলেটশনিবার, ১৫ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, রাত ৯:২৬
আজকের সর্বশেষ সবখবর

আদর্শ রাষ্ট্র গঠনে বিশ্বনবী (সা.)


ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২৬ ৭:৪৮ অপরাহ্ণ
Link Copied!

মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন এক সময় এসেছিল, যখন পৃথিবী অন্ধকারে নিমজ্জিত। শক্তিশালী দুর্বলের রক্ত শুষে নিত, নারী ছিল অবমাননার প্রতীক, দাসপ্রথা মানবতাকে কলুষিত করেছিল, ন্যায়-নীতি তখন ছিল বিরলতম সম্পদ। তখনই মরুর বুকে উদিত হলো এক আলোকিত নক্ষত্র—মুহাম্মদ (সা.)। তিনি এসেছিলেন শুধু একজন ধর্ম প্রচারক হিসেবে নয়, বরং মানবতার মুক্তির দূত, রাষ্ট্রনায়ক ও সমাজসংস্কারক হিসেবে।

তিনি মদিনার তপ্ত বালুকাবেলায় গড়ে তুলেছিলেন এক আদর্শ রাষ্ট্র, যার ভিত্তি ছিল সত্য, ন্যায়, ভালোবাসা ও মানবতার ওপর। এই রাষ্ট্র আজও আলোকবর্তিকা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
আল্লাহর সার্বভৌমত্বে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র

মুহাম্মদ (সা.) ঘোষণা দিলেন—রাষ্ট্র কারো ব্যক্তিগত মালিকানা নয়। এখানে সার্বভৌমত্ব আল্লাহর, আর মানুষ হলো তাঁর খলিফা।

‘ইনিল হুকমু ইল্লা লিল্লাহ’—এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে তিনি ভেঙে দিলেন বংশীয় অহংকার, রাজতন্ত্র ও স্বেচ্ছাচারিতার দেয়াল। মানুষের হৃদয়ে গেঁথে দিলেন এই সত্য, ন্যায়বিচারের তকমা শুধু আল্লাহর আইনেই নিহিত।
ভ্রাতৃত্বের সোনালি অধ্যায়

হিজরতের পর মুহাজির ও আনসারদের ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করে তিনি মানব সমাজে এমন এক মেলবন্ধন সৃষ্টি করেছিলেন, যা আজও ইতিহাসে বিস্ময় জাগায়। ধনী মুহাজির আর দরিদ্র আনসার একে অপরের ভাগীদার হয়ে গেল।

ভাইয়ের ঘর ভাইয়ের জন্য খুলে গেল। এতে বোঝা গেল—রাষ্ট্র শুধু জমি বা আইন দিয়ে টিকে থাকে না, বরং হৃদয়ের ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্ব দিয়েই এর প্রাণ জাগ্রত হয়।
মদিনার সনদ—বিশ্বের প্রথম সংবিধান

যে সনদ লিখিত হলো মদিনার বুকে, তা শুধু কাগজে-কলমে নয়, বরং মানবসভ্যতার মণিমুক্তা। মুসলিম, ইহুদি, খ্রিস্টান—সবাই পেল সমান অধিকার। তাদের ধর্ম থাকবে স্বাধীন, তাদের নিরাপত্তা হবে রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

রাষ্ট্রের বিরোধ মীমাংসার একমাত্র বিচারক হবেন আল্লাহর রাসুল (সা.)। কেমন আশ্চর্য সমন্বয়—এক শহরে নানা ধর্ম, নানা জাতি, অথচ শান্তি যেন নদীর মতো বইছে।
ন্যায়বিচারের মহিমা

রাসুল (সা.)-এর রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার এমন দৃঢ় ছিল, যেন মরুর আকাশে উদিত চাঁদ—অন্ধকার ভেদ করে আলোর দিশা দেয়। সম্ভ্রান্ত বংশের নারী চুরি করলে অনেকে সুপারিশ আনলো। কিন্তু নবী করিম (সা.)-এর অটল উচ্চারণ—‘আমার কন্যা ফাতিমা হলেও আমি তার হাত কেটে দিতাম।’ কী অভাবনীয় দৃঢ়তা! ন্যায়বিচারের সামনে কারো বংশ, ধন বা ক্ষমতা কোনো মূল্য রাখে না।

শুরার গণতান্ত্রিক রূপ

তিনি ছিলেন শাসক, তবু ছিলেন পরামর্শ প্রার্থী। বদরের বন্দিদের বিষয়ে শূরা, উহুদের যুদ্ধে তরুণদের মতামত গ্রহণ—এসবই প্রমাণ করে, তাঁর রাষ্ট্রে গণতন্ত্র শুধু মুখের বুলি ছিল না; বরং বাস্তব জীবনের প্রাণসঞ্চারক ধারা।

ধর্মীয় স্বাধীনতার আলো

মদিনার অমুসলিমরা নিজেদের উপাসনালয়ে স্বাধীনভাবে প্রার্থনা করত। কেউ কাউকে জোর করে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করেনি। কোরআনের অমর বাণী—‘ধর্মে কোনো জবরদস্তি নেই’—মদিনার বাতাসে প্রতিধ্বনিত হতো। এ ছিল সহনশীলতার অপূর্ব দৃষ্টান্ত।

কল্যাণ রাষ্ট্রের দৃষ্টান্ত

রাসুল (সা.) দারিদ্র্য ও বৈষম্য দূর করতে চালু করলেন জাকাত। গরিবের ঘরে ভাত পৌঁছল, অনাথ পেল অভিভাবক, ভিক্ষুক পেল ভরসা। তিনি সুদকে নির্মূল করে দিলেন, যেন অর্থনীতি হয় স্বচ্ছ ও ন্যায্য। শ্রমিকের ঘাম শোকানোর আগেই মজুরি দেওয়ার শিক্ষা দিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন শ্রমিক অধিকার।

শিক্ষা—রাষ্ট্রের প্রাণ

মসজিদে নববী হলো শিক্ষাকেন্দ্র। যুদ্ধবন্দিদের মুক্তির বিনিময়ে শিক্ষাদান—এমন নজির ইতিহাসে দুর্লভ। নবী করিম (সা.) শিক্ষা দিলেন, রাষ্ট্র যদি টিকে থাকে তবে জ্ঞানের আলোতেই টিকবে।

নারীর মর্যাদা

যে নারী ছিল লাঞ্ছিত ও অবমাননার স্বীকার, নবী করিম (সা.) তার হাতে তুলে দিলেন সম্মান। দিলেন উত্তরাধিকার, দিলেন শিক্ষা অর্জনের অধিকার, দিলেন বৈবাহিক সম্মতির স্বাধীনতা। তিনি ঘোষণা করলেন, ‘নারীরা হলো তোমাদের সহচরী।’ নারীর মুখে ফিরিয়ে দিলেন হাসি, সমাজে দিলেন মর্যাদার আসন।

সমতার বাণী

মুয়াজ্জিন হলেন কৃষ্ণাঙ্গ বিলাল। সামরিক কৌশলে পরামর্শদাতা সালমান ফারসি। রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে ছিলেন সোহেব রুমি। আরব-অনারব, কালো-সাদা—সব দেয়াল ভেঙে সমতার যে জগৎ গড়লেন, তা আজও মানবসভ্যতার গর্ব।

যুদ্ধের নীতি ও মানবাধিকার

যুদ্ধ এলো, কিন্তু সেখানে বর্বরতা নয়, মানবতা। নারী-শিশু-প্রবীণ নিরাপদ, গাছপালা অক্ষত, বন্দিদের প্রতি সদয় আচরণ। কী আশ্চর্য মানবিকতা! যুদ্ধের ভেতরেও শান্তির সুবাস।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও শান্তি

তিনি দূত পাঠালেন সম্রাটদের কাছে, ডাক দিলেন শান্তির। হুদাইবিয়ার চুক্তিতে কলম ভিজল শান্তির কালি দিয়ে। এটি প্রমাণ করে, তাঁর রাষ্ট্র শুধু যুদ্ধের নয়, বরং শান্তির আলোকিত রাষ্ট্র।

শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রনায়ক

মদিনার ছোট্ট সেই রাষ্ট্র ইতিহাসে হয়ে উঠল এক মহিমান্বিত অধ্যায়। ন্যায়, সমতা, ভ্রাতৃত্ব, কল্যাণ, শিক্ষা, মানবিকতা—সব মিলিয়ে এটি ছিল আদর্শ রাষ্ট্রের জীবন্ত রূপ। হজরত মুহাম্মদ (সা.) শুধু আরবের রাষ্ট্রনেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন সমগ্র মানবজাতির জন্য শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রনায়ক।

আজকের পৃথিবী যখন যুদ্ধ, বৈষম্য ও অবিচারে কাতরাচ্ছে, তখন নবী করিম (সা.)-এর গড়া রাষ্ট্রের আদর্শ আমাদের জন্য সর্বোত্কৃষ্ট পথনির্দেশ। যদি মানবতা তাঁর দেখানো আলোয় হাঁটতে শুরু করে, তবে পৃথিবী আবারও ভরে উঠবে শান্তি, ভালোবাসা ও ন্যায়ের মহিমায়।

কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।