অনলাইন ডেস্ক : সিলেটের ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর এলাকার পাথর লুট নিয়ে দেশব্যাপী আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে বাস্তব চিত্র দেখতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন সরকারের দুই সচিব। শুক্রবার সকালে স্থানীয় সব কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে সাদা পাথর লুটপাটের ক্ষতচিহ্ন ঘুরে দেখেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোখলেছুর রহমান এবং খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব সাইফুল ইসলাম। এ সময় লুটপাটের চিত্র দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা। বলেন, ‘লুট নয়, হরিলুট হয়েছে। এই লুটপাটের সঙ্গে যারা জড়িত, তারা যত বড় কর্মকর্তা কিংবা রাজনৈতিক নেতাই হোন, তাদের শাস্তির আওতায় আনা হবে।’ এদিকে লুটের পাথর ফেরত দিতে নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া হবে বলে জানান সিলেটের জেলা প্রশাসক।
বৃহস্পতিবার রাতে সিলেট সফরে আসেন এই দুই সচিব। শুক্রবার সকালে চলে যান পাথর লুটের বাস্তব চিত্র দেখতে। সঙ্গে ছিলেন সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার খান মো. রেজা উন নবী, অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার দেবজিত সিংহ, জেলা প্রশাসক সারোয়ার আলমসহ স্থানীয় কর্মকর্তারা। সাদা পাথরে নেমেই বিভিন্ন দিক ঘুরে দেখেন তারা। যেখান থেকে পাথর লুট হয়েছে, সেখানে দাঁড়িয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। জেলা প্রশাসকসহ স্থানীয় কর্মকর্তাদের নানা নির্দেশনা দেন দুই সচিব। পরে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন। শুরুতেই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোখলেছুর রহমান বলেন, আপনারা জানেন যেটা লুট হয়েছে, সেটা যতটুকু আশপাশ থেকে উদ্ধার করা যায়, সেই চেষ্টা চলছে। আজ থেকে ৫০০ শ্রমিককে কাজে লাগানো হয়েছে যাতে এই পর্যটন এলাকাকে সুন্দররূপে ফেরানো যায়। সব চেষ্টা দ্রুতই শুরু হবে। ট্যুরিস্ট পুলিশ ও ব্যাটালিয়ন আনসারের একটি ক্যাম্প এখানে স্থাপনের চিন্তা করা হচ্ছে।
জনপ্রশাসন সচিব মোখলেছুর রহমান আরও বলেন, আপনারা জানেন, বর্ডারের ৫ মাইল এলাকা বিজিবি দেখে। এত কাছেই বিজিবির ক্যাম্প (হাত দিয়ে দেখান), তাদের সামনে এত বড় একটি ঘটনা ঘটল। তাও এক দিনে নয়, কয়েকদিন ধরে! তিনি বলেন, যা গণমাধ্যমে দেখেছি লুট হয়েছে, সরেজমিন দেখে তো লুট নয়, আসলে হরিলুট বলতে হবে। এটা দেশের সম্পদ, রাষ্ট্রের সম্পদ, জনগণের সম্পদ। এটা যারা নিয়ে গেছে, তদন্ত করে তাদের নাম পাচ্ছি। সে যেই হোক, যত বড় কর্মকর্তা হোক, এটার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং হবে। এর সঙ্গে জড়িত সে যেই হোক, যত বড় নেতা হোক, তাকে খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। একটু সময় প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, নতুন জেলা প্রশাসক এসেছেন। তিনি খুব কর্মঠ, আপনারা জানেন। আমরা এখানে একটা প্যাকেজ প্রোগ্রাম নিচ্ছি, যাতে এ স্থানকে রক্ষা করা যায় এবং পর্যটনকে বিকশিত করা যায়। সিলেটের সাদা পাথর, জাফলং, বিছানাকান্দি, রাতারগুল ও লোভাছড়া পর্যটনকেন্দ্রের সঙ্গে ভালো যোগাযোগব্যবস্থা স্থাপন করার আশ্বাস দেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব।
সরকারি কর্মকর্তাদের কারও জড়িত থাকার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, একজন সরকারি কর্মকর্তা যখন অপরাধের সঙ্গে জড়িত হন, তখন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। ব্যবস্থা ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। এটার সঙ্গে যে বাহিনী কিংবা সিভিল প্রশাসনের যিনি জড়িত হবেন, তাকেই শাস্তি পেতে হবে। মানুষ এত কথা শুনতে চায় না। এত বড় একটি কাণ্ড ঘটেছে, তারা দেখতে চায় সরকার কার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নিয়েছে। সরকারকেও এই অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করে শাস্তি দিতে চায়। সবশেষে তিনি বলেন, এই সাদা পাথরকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে এবং জড়িতদের শাস্তি দিতে যা যা করণীয় সরকার করবে।
পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, এত বড় লুটপাটের বিষয়টি আমাদের জন্য দুঃখজনক। দেশের এতগুলো সম্পদ শেষ হয়ে গেল। আমরা চেষ্টা করছি; কিন্তু প্রকৃতি যেভাবে সাজায়, মানুষের পক্ষে তা সম্ভব হয় না। চেষ্টা করা হচ্ছে পাথরগুলো ফিরিয়ে এনে প্রতিস্থাপনের। ট্যুরিজমকে গুরুত্ব দিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে। আমরা আশা করি আবার যখন ঢল আসবে, তখন কিছুটা হলেও নতুন রূপ পাবে। তবে তা শতভাগ হবে, এটা আশা করছি না। আমরা চিন্তা করছি এই এলাকাগুলোয় কী করা যায়। ইকোট্যুরিজমের মাধ্যমে শ্রমিকদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছে সরকার। আপাতত বিশেষ প্রহরা বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
জেলা প্রশাসক সারোয়ার আলম বলেন, যে কোনো কাজেরই একটি চ্যালেঞ্জ থাকবে, এটা স্বাভাবিক। সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেই কাজ করতে চাই। এ পাথরগুলো প্রাকৃতিকভাবে ছিল। তা হরিলুট হয়ে গেছে, এটা আমাদের জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক। আমরা কয়েকটি কাজ করছি। প্রথমত, যে পাথরগুলো লুট হয়েছে, তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি। খুব শীঘ্রই একটি সময় ঘোষণা করে দেব। এর মধ্যে যদি কেউ ফেরত দেয়, তাহলে ভালো। না দিলে যার কাছেই এই পাথর পাওয়া যাবে, তাকে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে লুটের সঙ্গে কারা জড়িত ছিল, তাদের অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করছি। এরপর শুধু পাথরগুলো এখানে নিয়ে এলে হবে না। স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
জেলা প্রশাসক জানান, স্থানটি ২৪ ঘণ্টা মনিটরিংয়ে রাখা হবে। প্রয়োজনে সিসি ক্যামেরা বসানো হবে। যারা পাথর আমদানি করে বৈধভাবে ব্যবসা করবেন, তাদের সহযোগিতা করা হবে। যারা অবৈধভাবে ব্যবসার চেষ্টা করবেন, তাদের ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, প্রকৃতি-পরিবেশ অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। পাশাপাশি বৈধ ব্যবসা চলমান থাকবে।
