সাধারণ অর্থে, অপ্রাপ্তবয়স্ক কোনো ব্যক্তির মাধ্যমে প্রচলিত ফৌজদারি আইনবিরোধী কাজ সংঘটিত হওয়াকে কিশোর অপরাধ বলা হয়। তবে বাংলাদেশের আইনগত পরিভাষায় শিশু আইন, ২০১৩-এর অধীন ‘আইনের সহিত সংঘাতে জড়িত শিশু’ ধারণাটি অধিক যথাযথ। শিশু আইন, ২০১৩-এর ধারা ৪ অনুসারে, ১৮ বছর পূর্ণ হয়নি এমন ব্যক্তি শিশু হিসেবে গণ্য হবে।
কোনো কিশোরের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাকে অপরাধী বলা যায় না। অভিযোগ, তদন্ত, বিচার এবং অপরাধ প্রমাণ- প্রতিটি ধাপের নিজস্ব আইনগত গুরুত্ব রয়েছে। একইভাবে, কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে পরিচিতি, কোনো এলাকায় অবস্থান কিংবা কারো সঙ্গে বন্ধুত্বই অপরাধে জড়িত থাকার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়।
প্রচলিত আইন কি কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে যথেষ্ট?
শিশু আইন -২০১৩ , এই আইনটির উদ্দেশ্য শুধু শিশুকে শাস্তি দেওয়া নয় ,বরং শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ ,সুরক্ষা,সংশোধন এবং পূর্ণবাসন বিষয়গুলো বিবেচনা করা। দণ্ডবিধির ৮২ ও ৮৩ ধারায় ৯ বছরের শিশুর কোনো কাজ এবং ৯-১২ বছরের অপরিণত শিশুর কোনো কাজ অপরাধ নয়। এই আইনে কোথাও বলা হয়নি ১২ বছরের ওপরে শিশু -কিশোরদের সাজার আওতায় আনা যাবে না। তবে ফৌজদারি কার্যবিধিসহ অন্যান্য আইনে যে বিধান থাকুক না কেন , শিশু আইন -২০১৩ , এর বিধান অবশ্যই মানতে হবে। শিশু আইন- ২০১৩ এর ৪ ধারাতে বলা হয়েছে, ১৮ বছরের কম বয়সী সবাই শিশু। এই আইনের বিশেষ সুরক্ষা ও প্রক্রিয়ার বিধান উপেক্ষা করা যাবে না। প্রচলিত আইনের বিভিন্ন জটিলতা এবং শিশু আইনের দোহাই দিয়ে কিশোর অপরাধীরা মুক্তি পেয়ে পুনরায় অপরাধে জড়িত হচ্ছে। তাই প্রচলিত আইনের সংশোধন কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিধি রহিতকরণ কিংবা প্রতিস্থাপন করা উচিত।
শিশু আইন-২০১৩ অনুযায়ী, আদালত কিশোর অপরাধ দমনের নামে কোর্টের গুরুত্বপূর্ণ রায়: মোবাইল কোর্টে শিশুদের বিচার- সুয়োমটো রুল নং ১, ২০১৯
মামলার ঘটনা: বিভিন্ন মোবাইল কোর্ট শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে তাৎক্ষণিক বিচার করে সাজা দিয়েছিল এবং তাদের শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছিল। বিষয়টি আদালতের নজরে এলে হাইকোর্ট স্বপ্রণোদিত হয়ে বিচারগুলোর বৈধতা পরীক্ষা করেন।
হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত ও আইনি গুরুত্ব: শিশু আইন, ২০১৩ একটি বিশেষ আইন; আইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িত শিশুদের বিচার নির্ধারিত শিশু-বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে করতে হবে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পরিচালিত মোবাইল কোর্টের শিশুদের বিরুদ্ধে ওই বিচার, দণ্ড ও আটকাদেশ আইনগত এখতিয়ার বহির্ভূত হওয়ায় আদালত সেগুলোকে আইনগত কর্তৃত্ববিহীন ও অকার্যকর ঘোষণা করেন। শিশুদের আইনজীবীর সহায়তা, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালতে বিচার এবং সংবিধানস্বীকৃত অধিকার নিশ্চিত করার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। “কিশোর অপরাধ দমনের নামে আইন নির্ধারিত বিচার প্রক্রিয়া এড়িয়ে যাওয়া যায় না। ২০২০ সালের ১১ মার্চ হাইকোর্ট বিভাগের সুয়োমটো রুল নং ১, ২০১৯-এর রায় স্পষ্ট করে যে, “শিশুদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে শিশু আইন, ২০১৩ এবং সংবিধানসম্মত বিচারপ্রক্রিয়া অনুসরণ বাধ্যতামুলক। আইন প্রয়োগের উদ্দেশ্য মহৎ হলেও আইনগত এখতিয়ার ও ন্যায়বিচারের শর্ত উপেক্ষা করা বৈধ নয়।”
কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে আইন কিভাবে প্রয়োগ করা যায়?
বাংলাদেশের কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে মূলত শিশু আইন -২০১৩, দণ্ডবিধি-১৮৬০ এবং ফৌজদারি কার্যবিধি -১৮৯৮ প্রয়োগ করা হয়। তবে শিশু আইনের বিধান অবশ্যই মানতে হবে। যদি কোনো কিশোরের বিরুদ্ধে দলবদ্ধভাবে হামলা ,চাঁদাবাজি ,ছিনতাই বা অন্যান্য অপরাধে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায় তবে প্রযোজ্য আইনে মামলা, তদন্ত ,শিশু আদালতের মাধ্যমে বিচার, শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো ছাড়াও মানসিক সংশোধন ,শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য জোর দেওয়া যায়।
আইন প্রয়োগের প্রধান বাধা হলো, আইনের মারপ্যাঁচ ও শিশু আইনে সীমাবদ্ধতা। শিশু আইন অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সী সবাই শিশু। ফলে অনেক কিশোর অপরাধীকে তাৎক্ষণিক বিচার ও কঠোর শাস্তির আওতায় আনা যায় না। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা,বড় ভাইদের অদৃশ্য শেল্টার, প্রাপ্তবয়স্কদের ইন্ধন, পর্যাপ্ত সংশোধন কেন্দ্র ও অবকাঠামোর ঘাটতিসহ নানা কারণে আইনের সঠিক প্রয়োগ সম্ভব হয়ে ওঠে না।
প্রয়োজন সংস্কার
প্রথমত, প্রতিটি জেলায় শিশু আইন, ২০১৩ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল, শিশু-বিষয়ক পুলিশ কর্মকর্তা, প্রবেশন কর্মকর্তা, সমাজকর্মী এবং শিশু আদালতের কার্যকর সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত: পুলিশ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজসেবা অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার ও পরিবারকে যুক্ত করে ঝুঁকিপূর্ণ কিশোরদের প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত এবং সহায়তা প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। এই ব্যবস্থা যেন কোনো শিশুকে অযথা অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত না করে, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত: কিশোরদের দিয়ে অপরাধ সংঘটনের পরিকল্পনাকারী প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি ও সংগঠিত চক্রের বিরুদ্ধে প্রমাণভিত্তিক তদন্তকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। শিশুদের অপরাধে ব্যবহার করার ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন কিশোর-সমস্যা হিসেবে না দেখে বৃহত্তর অপরাধী নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে তদন্ত করতে হবে।
চতুর্থত: বিদ্যালয়ভিত্তিক কাউন্সেলিং, ক্রিড়া ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে আনা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং পরিবারকে পরামর্শ দেওয়ার সুযোগ বাড়াতে হবে।
পঞ্চমত, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা, নিরপেক্ষ তদন্ত, দ্রুত বিচার এবং আদালতের আদেশের কার্যকর বাস্তবায়ন অপরাধ প্রতিরোধে আস্থা তৈরি করে।
ষষ্ঠত, আইন সংশোধনের প্রয়োজন থাকলে তা গবেষণা ও বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে করতে হবে। শিশুদের প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধীর মতো গণ্য করা বা নির্বিচারে কঠোর শাস্তি দেওয়াই যে অপরাধ কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়- এমন সিদ্ধান্ত প্রমাণ ছাড়া গ্রহণ করা উচিত নয়।
কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে রাষ্ট্রের দায়িত্ব দ্বিমুখী; অপরাধের শিকার ব্যক্তির নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং অপরাধে জড়িয়ে পড়া শিশুকে সংশোধন ও পুর্নবাসনের সুযোগ দেওয়া। আইনের যথাযথ প্রয়োগ,অপরাধের মূল হোতাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, শিশুবান্ধব বিচার ব্যবস্থা এবং কার্যকর পুর্নবাসনকে একই নীতির অংশ হিসেবে দেখতে হবে। কিশোর গ্যাং দমন শুধু কিশোর অপরাধীকে আটক করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং যে পরিবেশ,পৃষ্ঠপোষকতা ও ব্যর্থতা তাকে অপরাধের দিকে ঠেলে দিয়েছে সেগুলো ভেঙে দেওয়ার মাধ্যমে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
