২০১৭ সালে প্রীতম হাসানের গাওয়া ‘জাদুকর’ গানের মিউজিক ভিডিওর শুটিংয়ে প্রীতমের সঙ্গে শেহতাজ মনিরা হাশেমের পরিচয়। পরে পরিচয় থেকে বন্ধুত্ব, বন্ধুত্ব থেকে প্রেম। এরপর প্রায় ৫ বছরের সম্পর্কের পর ২০২২ সালের অক্টোবরে বিয়ের মধ্য দিয়ে একসঙ্গে পথচলা শুরু করেন তারা।
গত রোববার (৪ অক্টোবর) রাতে প্রীতম ও শেহতাজ দুজনেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলাদা পোস্ট দিয়ে নিজেদের বিবাহবিচ্ছেদের কথা জানিয়েছেন তারা। তবে আরও আগেই তাদের সম্পর্কের ভেতরে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল বলে তাদের কাছের মানুষদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়।
‘জাদুকর’ গানের মিউজিক ভিডিওর শুটিংয়ে পরিচয়ের পর কাজ করতে করতেই তাদের যোগাযোগ বাড়ে। একসময় তারা বুঝতে পারেন, সম্পর্কটি আর শুধু বন্ধুত্ব বা ভালো লাগার মধ্যে নেই।
পরে প্রীতম নিজেই জানিয়েছিলেন, ‘জাদুকর’-এর শুটিংয়ের পর শেহতাজকে বিয়ের কথা বলেছিলেন তিনি। পরে ২০২২ সালের ২৯ অক্টোবর শ্রীমঙ্গলের একটি ৫ তারকা হোটেলে বিয়ে করেন তারা। নিজের বিয়ের পোশাকের নকশাও নিজেই করেছিলেন শেহতাজ। বিয়ের ছবি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ আলোচনাও হয়েছিল।
২০২৩ সালে নিজেদের বাসায় ওঠেন প্রীতম-শেহতাজ। সংসারের পাশাপাশি দুজনের কাজও চলছিল। তবে ধীরে ধীরে তাদের জীবনে বড় পরিবর্তন আসতে শুরু করে।
নিজের মতো করে গান গাওয়া, কোক স্টুডিও বাংলার গান, এর বাইরে প্রীতম হাসানের সংগীতজীবনে ‘তুফান’ সিনেমাটি যেন নতুন এক অধ্যায় খুলে দেয়। সিনেমাটির গান ও অভিনয় তাকে নতুন করে বড় পরিসরের দর্শকের কাছে পৌঁছে দেয়।
এর আগে, প্রীতমের নিজস্ব সংগীতের আলাদা শ্রোতাশ্রেণি ছিল। কিন্তু ‘তুফান’-এর পর তার পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে শহর থেকে গ্রাম, দেশে-বিদেশে। স্টেজ শোর সংখ্যা বাড়তে থাকে, সঙ্গে বাড়ে সম্মানীও।
ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা আরও বাড়ে। ‘বরবাদ’ সিনেমার ‘চাঁদমামা’ ও ‘দ্বিধা’ এবং ‘প্রিন্স’ সিনেমার ‘জ্বালা জ্বালা’ গানও প্রীতমের জনপ্রিয়তা আরও বাড়িয়ে দেয়। একের পর এক গান, স্টেজ শো, দেশ-বিদেশে ছুটে বেড়ানো, সব মিলিয়ে প্রীতমের ব্যস্ততা বাড়তে থাকে দ্রুত।
ঘনিষ্ঠদের মতে, ২০২৪ সালের শেষের দিক থেকে প্রীতম-শেহতাজের সম্পর্কের মধ্যে টানাপোড়েন স্পষ্ট হতে শুরু করে। দুজনের একসঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ কমে যায়। প্রীতমের কাজের ব্যস্ততা যেমন বাড়ছিল, তেমনি শেহতাজের সঙ্গে তার আচরণেও পরিবর্তন লক্ষ করছিলেন কাছের মানুষদের কেউ কেউ।
ঘনিষ্ঠজনদের বরাতে জানা গেছে, প্রীতমের আচরণে পরিবর্তন শেহতাজের কাছে স্বাভাবিকভাবে নেওয়াটা সহজ হয়নি। এ কারণে আগে যেভাবে দুজনের মধ্যে বোঝাপড়া ছিল, সেখানে ধীরে ধীরে বদল আসে। এর প্রভাব পড়তে থাকে তাদের সম্পর্কেও।
বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে যাওয়া কিংবা আড্ডার সময়ও দুজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়েছে। এমনই এক ঘটনায় বন্ধুদের উপস্থিতিতে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিও তৈরি হয় বলে জানান তাদের ঘনিষ্ঠজনেরা। এরপর দুজনের দূরত্ব আরও বাড়তে থাকে।
তবে বৈবাহিক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিলেন প্রীতম-শেতহাজ দুজনেই। কিন্তু সেই চেষ্টা সফল হয়নি।
সম্পর্কে দূরত্ব বাড়লেও বাইরে থেকে প্রীতম-শেহতাজকে দেখে তা বোঝার উপায় ছিল না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের ঘোরাঘুরির ছবি ছিল, বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও পাশাপাশি দেখা গেছে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতেও জেফার রহমান ও রাফসান সাবাবের বিয়ের অনুষ্ঠানে একসঙ্গেও ছিলেন। অর্থাৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে ছবি, আর ব্যক্তিগত জীবনের বাস্তবতা, দুটো যেন তখন দুই আলাদা গল্প।
বিয়ের আগে শেহতাজ গান আর অভিনয়ে ব্যস্ত থাকলেও বিয়ের পর দুটো মাধ্যম থেকে অনেকটাই নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন। অন্যদিকে প্রীতম ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন সংগীত নিয়ে। বিচ্ছেদের ঘোষণা দেওয়ার মাস দুয়েক আগে শেহতাজ কানাডায় গিয়েছিলেন। সেখানে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটান তিনি।
দেশে ফেরার পরই তাদের বিচ্ছেদের সিদ্ধান্তের বিষয়টি সামনে আসে। গত রোববার রাতে প্রীতম ও শেহতাজ নিজেদের ফেসবুক পোস্টে আলাদা হয়ে যাওয়ার কথা জানান। দুজনের বক্তব্যেই ছিল পরস্পরের প্রতি সম্মান, শুভকামনা এবং ব্যক্তিগত পরিসরের প্রতি সম্মান দেখানোর অনুরোধ।
ঘনিষ্ঠজনরা বলছেন, বিচ্ছেদের সিদ্ধান্তের পর দুজনই অনেকটা স্বস্তিতে আছেন। শেহতাজ আবার অভিনয় ও গানে ফেরার পরিকল্পনা করছেন। অন্যদিকে প্রীতমও নতুন গান নিয়ে ব্যস্ত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
প্রায় এক দশকের পরিচয়, প্রেম, বিয়ে ও সংসারের পর এখন নিজেদের মতো করে নতুন অধ্যায় শুরু করতে চান তারা দুজনই।
