BD SYLHET NEWS
সিলেটসোমবার, ৫ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, রাত ১০:৩৪
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ভূমধ্যসাগরে ঝড়ের কবল থেকে উদ্ধার ১১১ বাংলাদেশি, নিখোঁজ ৩৯


অক্টোবর ৫, ২০২৬ ৭:৫৮ অপরাহ্ণ
Link Copied!

লিবিয়ার তবরুক উপকূল থেকে অনিয়মিত পথে গ্রিসে যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে রাবারের নৌকায় ভূমধ্যসাগরে পাড়ি দিতে ছেয়েছিলেন শতাধিক বাংলাদেশি। কিন্তু স্বপ্নের ইউরোপযাত্রা মুহূর্তেই পরিণত হয় জীবন-মৃত্যুর লড়াইয়ে। প্রচণ্ড ঝড়, উত্তাল সমুদ্র, নৌকায় পানি প্রবেশ এবং কোথাও ইঞ্জিন বিকল হয়ে যাওয়ার ঘটনায় মৃত্যুর মুখোমুখি হন তারা।

গত ১৪ সেপ্টেম্বর পৃথক তিনটি নৌযান থেকে ১১১ বাংলাদেশি নাগরিককে উদ্ধার করেছে বাণিজ্যিক জাহাজ। পরে তাদের মিশরের পোর্ট সাঈদ ও দামিয়াত বন্দরে নিয়ে আসা হয়। তাদের মধ্যে ৫৮ জন পোর্ট সাঈদ নিরাপত্তা কেন্দ্রে এবং ৫৩ জন দামিয়াত নিরাপত্তা কেন্দ্রে অবস্থান করছেন।

গত শনি ও রবিবার মিশরে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম উইংয়ের এ কর্মকর্তা দুদিনব্যাপী পোর্ট সাঈদ ও দম্মিয়াত অবস্থান করে তাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন এবং সমুদ্রযাত্রা, বিপদের মুহূর্ত এবং উদ্ধারের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেন। এ সময় প্রত্যকটি নাগরিককে ওই কর্মকর্তার মোবাইল ফোন থেকে প্রত্যেকের বাড়িতে ফোন করে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ করে দেন।‌

ঝড়ের মধ্যে এক রাত-এক দিন, মৃত্যুর অপেক্ষা-

পোর্ট সাঈদে থাকা ৫৫ বাংলাদেশি দুতাবাসের ওই কর্মকর্তাকে জানান, গত ১৪ সেপ্টেম্বর একটি রাবারের নৌকায় করে তারা গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন। যাত্রা শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রচণ্ড ঝড়ের কবলে পড়েন তারা। উত্তাল সমুদ্রের মধ্যে প্রায় এক রাত ও এক দিন নৌযানটি চলতে থাকে। চারদিকে শুধু অন্ধকার পানি আর ভয়াবহ ঢেউ। কখন নৌকাটি উল্টে যাবে কিংবা ডুবে যাবে—এমন আতঙ্কে সময় কাটছিল তাদের। একপর্যায়ে তারা ‘KINGSTON’ নামের একটি বাণিজ্যিক জাহাজের কাছে সাহায্যের আবেদন করেন। বিপদসংকেত পেয়ে জাহাজটি মিশরের সামুদ্রিক উদ্ধার সমন্বয় কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং তাদের উদ্ধার করে। পরে ১৭ সেপ্টেম্বর রাতে তাদের পোর্ট সাঈদ বন্দরে নিয়ে আসা হয়।

নৌকায় ছিদ্র, বিকল ইঞ্জিন, নিখোঁজ ৩৯

পোর্ট সাঈদ নিরাপত্তা কেন্দ্রে থাকা আরও তিন বাংলাদেশি জানান, তারা অন্য একটি নৌযানে বাংলাদেশি, মিশরীয় ও সুদানি নাগরিকসহ মোট ৫৬ জন তবরুক থেকে একটি নৌকায় যাত্রা করেছিলেন।

সমুদ্রে প্রবেশের পর শুরু হয় প্রচণ্ড ঝড়। প্রায় দুই দিন তারা উত্তাল সাগরে ভাসতে থাকেন। একপর্যায়ে নৌকার ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। তার ওপর নৌকায় ছিদ্র হয়ে পানি ঢুকতে শুরু করে। ডুবে যাওয়ার আশঙ্কায় তারা সাহায্যের জন্য বিপদসংকেত পাঠান। পরে ‘MSC VIRGINIA’ নামের একটি বাণিজ্যিক জাহাজ তাদের উদ্ধারে এগিয়ে আসে। জাহাজটি তিন বাংলাদেশিসহ মোট ১৭ জনকে উদ্ধার করে। তবে উদ্ধার হওয়া তিন বাংলাদেশির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই নৌকায় থাকা আরও ৩৯ জন যাত্রী ভূমধ্যসাগরে নিখোঁজ রয়েছেন।

ডুবে যাওয়ার মাত্র কয়েক মিনিট আগে উদ্ধার

দামিয়াতে থাকা ৫৩ বাংলাদেশির অভিজ্ঞতা আরও ভয়াবহ। দূতাবাসের কর্মকর্তার কাছে তারা জানান, ১৪ সেপ্টেম্বর তবরুক থেকে ৫৩ বাংলাদেশি ও ১৪ সুদানি নাগরিকসহ মোট ৬৭ জন একটি রাবারের নৌকায় যাত্রা করেন। সমুদ্রে প্রবেশের পরই প্রচণ্ড ঝড়ের কবলে পড়ে নৌকাটি। একপর্যায়ে ভেতরে পানি ঢুকতে শুরু করলে নৌকাটি দ্রুত ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। যাত্রীরা আশপাশের বাণিজ্যিক জাহাজ ও সংশ্লিষ্ট উদ্ধারকারী কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার জরুরি বিপদসংকেত পাঠাতে থাকেন। ঠিক তখনই ঘটনাস্থলে পৌঁছে নেদারল্যান্ডসের একটি বাণিজ্যিক জাহাজ। উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিরা জানান, জাহাজটি যদি আরও ১০ মিনিট দেরিতে পৌঁছাত, তাহলে নৌকায় থাকা সবাই প্রাণ হারাতে পারতেন।

মৃত্যুর এত কাছে গিয়ে ফিরে আসা এসব মানুষ দূতাবাস কর্মকর্তার কাছে নিজেদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। নৌকায় পানি ঢোকা, ইঞ্জিন বিকল হয়ে যাওয়া, প্রচণ্ড ঝড় এবং উদ্ধার আসতে দেরি হওয়ার আশঙ্কা—প্রতিটি মুহূর্তই ছিল তাদের কাছে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই। অনেকেই সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, এই উদ্ধার তাদের কাছে নতুন জীবন ফিরে পাওয়ার মতো।

মিশরে পৌঁছানো ছিল তাদের গন্তব্য নয়

বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম উইংয়ের এক কর্মকর্তা জানান, পোর্ট সাঈদ ও দম্মিয়াতের ১১১ জন বাংলাদেশি অভিবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এসব বাংলাদেশি মিশরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে সমুদ্রযাত্রা করেননি। তারা অনিয়মিতভাবে ইউরোপে প্রবেশের উদ্দেশ্যে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার সময় ভয়াবহ সামুদ্রিক দুর্যোগে পড়েন। পরে বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যিক জাহাজ ও সংশ্লিষ্ট সামুদ্রিক উদ্ধার কর্তৃপক্ষের সমন্বিত তৎপরতায় প্রাণে বেঁচে মিশরে পৌঁছান।

তিনি আরও জানান, উদ্ধারপ্রাপ্ত বাংলাদেশিদের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় পুলিশ, কারা কর্তৃপক্ষ, ন্যাশনাল সিকিউরিটি, ইমিগ্রেশনসহ বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করে তাদের প্রয়োজনীয় কনস্যুলার ও অন্যান্য সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।

এদিকে উদ্ধার হওয়া ১১১ জন বাংলাদেশির কায়রো টু ঢাকা টিকিট আইওএম দিতে সম্মতি প্রকাশ করেছে। মিশরের প্রচলিত আইন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর আটক বাংলাদেশি নাগরিকদের দ্রুততম সময়ে নিরাপদে দেশে ফেরানোর লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, এমনকি যাদের কাছে পাসপোর্ট ছিল তাদের বেশ ক’জন গতকাল দেশে ফিরে গেছে।‌ বাকিদের ট্রাভেল পারমিট ইস্যু করে অচিরেই দেশে পাঠানো হবে।

স্বপ্নের ইউরোপ’, নাকি মৃত্যুর সমুদ্র?

ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অনিয়মিত পথে ইউরোপে যাওয়ার এই ঘটনাগুলো আবারও সামনে এনেছে ভয়াবহ বাস্তবতা। নিরাপত্তাহীন রাবারের নৌকা, বৈরী আবহাওয়া, নৌ-নির্দেশনা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং জরুরি মুহূর্তে উদ্ধার সহায়তা পেতে বিলম্ব—সব মিলিয়ে এ ধরনের যাত্রা যে কোনো সময় ভয়াবহ প্রাণহানির কারণ হতে পারে।

দূতাবাসের মতে, মানবপাচারকারী ও অনিয়মিত অভিবাসনে সহায়তাকারী চক্রের প্রলোভনে পড়ে বাংলাদেশিদের এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় যুক্ত হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

ভূমধ্যসাগরের উত্তাল ঢেউ থেকে ১১১ বাংলাদেশির ফিরে আসা তাই শুধু একটি উদ্ধারকাহিনি নয়—এটি একই সঙ্গে একটি কঠিন সতর্কবার্তা। ইউরোপে পৌঁছানোর স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা করা মানুষগুলোর জন্য কয়েক ঘণ্টার সমুদ্রযাত্রাই যে কখনো কখনো জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে শেষ সীমারেখা হয়ে দাঁড়ায়, সেই নির্মম বাস্তবতাই যেন আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল এই ঘটনা।

কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।