সকাল থেকেই বহির্বিভাগের সামনে দীর্ঘ লাইন। কেউ এসেছেন দূরের উপজেলা থেকে, কেউ স্বজনকে নিয়ে ভোরেই দাঁড়িয়েছেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পর মিলছে ডাক্তারের দেখা। কিন্তু এতেই ভোগান্তির শেষ নয়। মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে জনবলসংকটের সঙ্গে যোগ হয়েছে যন্ত্রপাতির সংকটও। প্রয়োজনীয় অনেক পরীক্ষা সরকারি হাসপাতালে করানো যাচ্ছে না। কোনোটার যন্ত্র বন্ধ, কোনোটি চলে সপ্তাহে দু-তিন দিন। ফলে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে এসে শেষ পর্যন্ত রোগীদের ছুটতে হচ্ছে বেসরকারি ক্লিনিকে।
২১ লাখ মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসা এই সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্স ও টেকনোলজিস্টের সংকটে ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা। হাসপাতালটিতে প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় অর্ধেক চিকিৎসক দিয়ে চলছে কার্যক্রম। রয়েছে শয্যাসংকটও। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি যন্ত্রপাতি অচল থাকায় সীমিত হয়ে পড়েছে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ৪০৮টি পদের বিপরীতে বর্তমানে শূন্য রয়েছে ১০৩টি। এর মধ্যে চিকিৎসকের ৮৪টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৪২ জন। অনুপস্থিত চিকিৎসকদের মধ্যে রয়েছেন সাতজন সিনিয়র কনসালট্যান্ট। সীমিতসংখ্যক চিকিৎসককে দিয়েই প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগীর চাপ সামলাতে হচ্ছে।
হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ৫০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। আর ২৫০ শয্যার বিপরীতে প্রতিদিন ভর্তি থাকেন প্রায় ৪৫০ থেকে ৫০০ রোগী। অতিরিক্ত রোগীদের অনেক সময় বিভিন্ন ওয়ার্ডের মেঝেতে বিছানা পেতে চিকিৎসা দিতে হয়। হাসপাতালের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বলছেন, সীমিত জনবল দিয়ে রোগীর এই চাপ সামলানো অত্যন্ত কঠিন। চিকিৎসকদের পাশাপাশি নার্স, টেকনোলজিস্ট ও অন্যান্য কর্মীর সংকট থাকায় স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
সম্প্রতি সরেজমিন গিয়ে জানা যায়, হাসপাতালে ১৪ জন টেকনোলজিস্টের প্রয়োজন হলেও কর্মরত আছেন ৯ জন। জনবল ও যন্ত্রপাতিসংকটে সপ্তাহে মাত্র তিন দিন এক্স-রে, দুই দিন সিটিস্ক্যান এবং চার দিন আলট্রাসনোগ্রাফি সেবা চালু থাকে। এমআরআই সেবা পুরোপুরি বন্ধ। অচল রয়েছে সিসিইউ ও আইসিইউ। ডায়ালাইসিস সেবাতেও প্রয়োজনীয় রাসায়নিক দ্রব্যের সংকট রয়েছে। ফলে সরকারি হাসপাতালে কম খরচে পরীক্ষা করানোর সুযোগ না পেয়ে অনেক রোগীকেই বাইরে যেতে হচ্ছে। এতে বাড়ছে চিকিৎসার ব্যয় ও রোগী-স্বজনদের ভোগান্তি। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষকে বেশি চাপ নিতে হচ্ছে।
রাজনগর উপজেলার টেংরা এলাকার রোগী মোতালিব খান বলেন, ‘সকাল ৮টায় লাইনে দাঁড়াইছি। ১১টার দিকে ডাক্তারের কাছে যাইতে পারছি। তিনি এক মিনিট কথা শুনে প্রেসক্রিপশন দিলেন। এখন বাইরে থেকে টেস্ট করতে হবে। আমরা গরিব মানুষ, এত টাকা কই পাব?’
রোগীর স্বজন জবদুল মিয়া বলেন, ‘হাসপাতালে টেস্ট করাতে পারি না। নামেই সরকারি হাসপাতাল, সব কাজ প্রাইভেটে করতে হয়। আমাদের মতো মানুষের পক্ষে এত টাকা খরচ করা সম্ভব না।’
আরেক রোগীর স্বজন ইয়ামিন মিয়া জানান, তার শাশুড়ির আলট্রাসনোগ্রাফি প্রয়োজন ছিল। হাসপাতালে গিয়ে জানতে পারেন, সেবা বন্ধ। পরে বাধ্য হয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা করাতে হয়েছে।
প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স ও টেকনোলজিস্ট নিয়োগের পাশাপাশি অচল যন্ত্রপাতি সচল করা এবং নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানান রোগী ও স্বজনরা। তারা বলেন, যে হাসপাতালে ২১ লাখ মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসা, সেই হাসপাতাল যদি জনবল ও যন্ত্রপাতিসংকটে জোড়াতালি দিয়ে চলে, তাহলে সরকারি চিকিৎসাসেবার সবচেয়ে বড় বোঝাটা শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের কাঁধেই।
মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক প্রণয় কান্তি দাস বলেন, ‘হাসপাতালে নানা সংকট রয়েছে। এসব সংকট সমাধানে কাজ করা হচ্ছে। বিষয়গুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। ২৫০ শয্যার হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০০ রোগী ভর্তি থাকেন। জনবলসংকট নিয়ে এত রোগীর চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।’
