কয়েক ঘণ্টা আগেও তারা ছিল পরীক্ষার হলে। পরীক্ষা শেষে ছিল হাসি-আড্ডা আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন থেমে গেল একটি ভয়াবহ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। জাফলং আমির মিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের তিন শিক্ষার্থী সাকিব আহমদ, রায়হান আহমেদ (রাহুল) ও জয় আহমদের একসঙ্গে মৃত্যু এবং দাফন গোয়াইনঘাটজুড়ে সৃষ্টি করেছে গভীর শোকের আবহ। স্বজনদের আহাজারি আর সহপাঠীদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা।
সোমবার (৬ জুলাই) নিহতদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় হৃদয়বিদারক দৃশ্য। উঠোনজুড়ে স্বজনদের কান্না, ঘরের ভেতরে সন্তানহারা মায়েদের আহাজারি আর চারদিকে শোকের নীরবতা। কেউ ছেলের স্কুলব্যাগ বুকে জড়িয়ে কাঁদছেন, কেউ বারবার ছেলের নাম ধরে ফিরে আসার আকুতি জানাচ্ছেন। উপস্থিত অনেকেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।
নিহতরা হলেন গোয়াইনঘাট উপজেলার নয়াবস্তি গ্রামের মহরম মিয়ার ছেলে সাকিব আহমদ (১৬), ছৈলাখেল গ্রামের হাবিবুর রহমান (হবি) মিয়ার ছেলে রায়হান আহমেদ (রাহুল) (১৬) এবং লাখেরপাড় গ্রামের রাজ্জাক মিয়ার ছেলে জয় আহমদ (১৬)। তারা সবাই জাফলং আমির মিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন।
জানা গেছে, রোববার (৫ জুলাই) দুপুরে উপজেলার মধ্য জাফলং ইউনিয়নের রাধানগর-বাউরভাগ চা বাগান সড়কে মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশের একটি গাছের সঙ্গে সজোরে ধাক্কা লাগে। এতে তিন বন্ধু গুরুতর আহত হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একে একে তাদের মৃত্যু হয়।
রোববার বাদ মাগরিব জাফলং আমির মিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে সাকিবের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। সোমবার সকালে ছৈলাখেল অষ্টম খণ্ড কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে জানাজা শেষে রায়হানকে সামাজিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। একই দিন বাদ জোহর লাখেরপাড় গ্রামের হামিদ আলী বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে জানাজা শেষে জয়কে দাফন করা হয়।
পারিবারিক সদস্যরা জানান, হাই স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই তিন বন্ধুর মধ্যে গড়ে ওঠে গভীর বন্ধুত্ব। স্কুল, খেলাধুলা, ঘোরাঘুরি কিংবা অবসর—সব সময়ই তারা একসঙ্গে থাকত। কয়েক ঘণ্টা আগেও তারা একসঙ্গে পরীক্ষা দিয়েছে, অথচ দিনের শেষে তিনজনই চিরনিদ্রায় শায়িত।
নিহত সাকিবের বাবা মহরম মিয়া বলেন, তার ছেলে অত্যন্ত শান্ত-স্বভাবের ছিল। তাকে ঘিরে পরিবারের অনেক স্বপ্ন ছিল, কিন্তু সেই স্বপ্ন এক মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেল।
রায়হানের বাবা হাবিবুর রহমান (হবি) মিয়া বলেন, তার ছেলে সবসময় হাসিখুশি থাকত। সকালে ঘর থেকে বের হওয়া সন্তান সন্ধ্যায় লাশ হয়ে ফিরবে, এমন বাস্তবতা কোনো বাবার পক্ষেই মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।
জয়ের বাবা রাজ্জাক মিয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, তিন বন্ধু সবসময় একসঙ্গে চলাফেরা করত। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তারা একসঙ্গেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে। সবার কাছে তিনি তাদের জন্য দোয়া চেয়েছেন।
এই মর্মান্তিক ঘটনায় জাফলং আমির মিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা এটিকে প্রতিষ্ঠানের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সহপাঠীরা বলছে, উঠতি বয়সে তিন বন্ধুর এমন বিদায় তারা কখনো কল্পনাও করেনি।
এদিকে দুর্ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপ্রাপ্তবয়স্কদের হাতে মোটরসাইকেল তুলে দেওয়ার প্রবণতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, গোয়াইনঘাটের বিভিন্ন এলাকায় প্রায়ই কিশোরদের বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালাতে দেখা যায়, যা প্রায়ই দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রতন কুমার অধিকারী বলেন, এ দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে অভিভাবকদের আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। অপ্রাপ্তবয়স্কদের মোটরসাইকেল চালানো, লাইসেন্সবিহীন এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীরা যাতে মোটরসাইকেল নিয়ে প্রবেশ করতে না পারে, সে বিষয়েও কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
