BD SYLHET NEWS
সিলেটবুধবার, ৬ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, বিকাল ৫:২৫
আজকের সর্বশেষ সবখবর

এসএসসি পরীক্ষা: খাতা নিচ্ছেন না শিক্ষকরা, ফল পেতে দেরির ভয়


মে ৬, ২০২৬ ২:২৯ অপরাহ্ণ
Link Copied!

পাবলিক পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে দিন দিন অনীহা বাড়ছে শিক্ষক-পরীক্ষকদের। তাদের অভিযোগ, পরিশ্রমের তুলনায় সম্মানী কম। আবার সেই সম্মানীও সময়মতো পাওয়া যায় না। এ ছাড়া প্রাইভেট ও কোচিংয়ে বেশি আয় করার প্রবণতা থেকেও অনেক শিক্ষক উত্তরপত্র মূল্যায়ন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। ফলে এ বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

গত বছরের এসএসসি পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন নিয়েও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। সেই সময় শিক্ষা বোর্ড শিক্ষকদের ডেকে নিয়ে সতর্ক করে এবং অনেকটা ‘ধমক’ দিয়েই খাতা ধরিয়ে দেয়। এ বছর একই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অনেক পরীক্ষক নির্ধারিত সময়ে খাতা সংগ্রহ করছেন না। এমনকি কেউ কেউ খাতা নিলেও, নিজেরা না দেখে অন্যদের দিয়ে মূল্যায়ন করানোর অভিযোগও রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের চূড়ান্ত সতর্ক করেছে শিক্ষা বোর্ডগুলো।

২৩৫ পরীক্ষকের তালিকা প্রকাশ
বাংলা প্রথম পত্রের উত্তরপত্র মূল্যায়নে নিয়োগ পাওয়া ২৩৫ পরীক্ষক বারবার তলবের পরও খাতা সংগ্রহ না করায় গতকাল মঙ্গলবার তাদের তালিকা প্রকাশ করেছে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড। এর আগে গত ৩০ এপ্রিল এসএমএসের মাধ্যমে জানানো হলেও তারা খাতা নেননি। তাদের গতকাল বিকেল ৫টার মধ্যে খাতা সংগ্রহের নির্দেশ দেওয়া হয়, নতুবা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গতকাল এক বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষা বোর্ড জানায়, এসএসসি পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নের জন্য যোগ্য শিক্ষকদের পরীক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলেও অনেকেই খাতা নিচ্ছেন না। এতে মূল্যায়ন কার্যক্রমে বিলম্ব ও জটিলতা তৈরি হচ্ছে, যা ফল প্রকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, এটি নতুন নয়, পুরোনো সমস্যার পুনরাবৃত্তি। গত বছরও (২০২৫) একই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। পরীক্ষকরা সময়মতো খাতা না নেওয়ায় সেই সময়ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটে এবং ফল প্রকাশ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। তখনও কঠোর নির্দেশনা দিয়ে খাতা নিতে বাধ্য করা হয়েছিল পরীক্ষকদের।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার সমকালকে বলেন, শিক্ষকরা আবেদন করে পরীক্ষক হলেও অনেকেই দায়িত্ব পালনে অনীহা দেখাচ্ছেন। নির্ধারিত সময়ে মূল্যায়ন শেষ না হলে ফল প্রকাশে দেরি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

শিক্ষা বোর্ড কর্মকর্তারা জানান, তাদের কাছে মৌখিক অভিযোগ আসছে, অনেক শিক্ষক খাতা নিলেও নিজেরা দেখেন না। তারা বলেন, পাবলিক পরীক্ষার খাতা অন্য কাউকে দিয়ে মূল্যায়ন করানো আইনত দণ্ডনীয়। ১৯৮০ সালের পরীক্ষা পরিচালনা আইনে এ অপরাধের জন্য দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। এর আগে শিক্ষকদের খাতা দেখায় অনীহার বিষয়ে উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করেছিলেন অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ। রিট আবেদনের পর যোগ্য ও অভিজ্ঞ শিক্ষকদের দিয়ে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার খাতা দেখাতে বোর্ড কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তাকে কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না এবং খাতা দেখার জন্য সঠিক ও প্রয়োজনীয় সময় বরাদ্দ দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হবে না– তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন আদালত।

সংশ্লিষ্টরা জানান, শিক্ষকরা সঠিকভাবে খাতা মূল্যায়ন না করায় পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর পুনর্মূল্যায়নে শত শত পরীক্ষার্থী বেশি নম্বর পাচ্ছে। এদিকে ফেল করার কারণে অনেকে আত্মহত্যা করছে। পরীক্ষার খাতা দেখার জন্য প্রয়োজনীয় সময় না দেওয়ায় ফলের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে।
কিন্তু যাদের কারণে এই বিপর্যয়, দায়ী সেই শিক্ষকদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হচ্ছে না। এতে অন্য পরীক্ষকরাও সতর্ক হচ্ছেন না। ফলে প্রতিবছর বাড়ছে ভুলের হার। সম্প্রতি আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের তদন্তেও পরীক্ষকদের ভুলের বিষয়টি উঠে এসেছে।

আবার যেসব শিক্ষার্থী ফল পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করছে, তারাও শুভঙ্করের ফাঁকিতে পড়ছে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা মনে করছেন, ফল পুনর্নিরীক্ষণের অর্থ নতুন করে খাতা দেখা। কিন্তু বাস্তবে তা হয় না। মূলত উত্তরপত্রের নম্বর যোগ ও বৃত্ত ভরাট ঠিক আছে কিনা, তা দেখেই পুনর্নিরীক্ষণ শেষ করা হয়। মূল খাতায় হাতই দেওয়া হয় না।

অযোগ্য পরীক্ষক নিয়োগের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, পরীক্ষক নিয়োগে নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয় না। পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা ছাড়া পরীক্ষক হওয়ার নিয়ম না থাকলেও বাস্তবে অনেক কম অভিজ্ঞতার শিক্ষকও পরীক্ষক হচ্ছেন। এমনকি এক বিষয়ের শিক্ষক অন্য বিষয়ের খাতা দেখার সুযোগ পাচ্ছেন। এতেও এসব সংকটের সৃষ্টি হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অযোগ্য পরীক্ষক ঠেকাতে এর আগে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড পরীক্ষকদের ডিজিটাল ডেটাবেজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনো ধরনের গাইডলাইন ছাড়া তৈরি এই ডেটাবেজেও ঢুকে পড়ছেন অযোগ্য শিক্ষকরা। প্রতিষ্ঠানপ্রধান সম্মতি দিলেই একজন শিক্ষক হয়ে যাচ্ছেন পরীক্ষক। এতে জুনিয়র সেকশনের শিক্ষক হয়ে যাচ্ছেন মাধ্যমিকের পরীক্ষক, কলেজের শিক্ষকরাও মাধ্যমিকের পরীক্ষক হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। আবার কোনো শিক্ষক যদি স্বল্প সময়ের জন্যও কোনো একটি বিষয় পড়ান, তাহলেও তিনি ওই বিষয়ে খাতার দেখার আবেদন করতে পারছেন। এভাবেই এক বিষয়ের শিক্ষক হয়েও অন্য বিষয়ের পরীক্ষক হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন তারা।

জানা যায়, ডিজিটাল ডেটাবেজ করার সময় গাইডলাইন না দিলেও পরীক্ষক হওয়ার জন্য একটি নীতিমালা রয়েছে। এতে প্রধান পরীক্ষক হতে গেলে কমপক্ষে ১২ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হয়। আর পরীক্ষক হওয়ার জন্য লাগে পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা। এ ছাড়া একজন শিক্ষকের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও তাঁর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফলও পরীক্ষক হওয়ার ক্ষেত্রে বিবেচনায় আনার কথা রয়েছে। যদিও এই নীতিমালা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মানা হয় না।

কম সম্মানী ও প্রদানে বিলম্বে ক্ষোভ
শিক্ষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, মূল্যায়নের জন্য খাতাপ্রতি মাত্র ৩৫ টাকা সম্মানী দেওয়া হয়। একজন পরীক্ষক ৪০০ খাতা দেখলে পান ১৪ হাজার টাকা, সেখান থেকেও ১০ শতাংশ কর কেটে রাখা হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘ বিলম্ব। অনেক শিক্ষক অভিযোগ করেছেন, এক বছরের খাতা দেখার সম্মানী পরের বছরও পান না। ফলে তাদের মধ্যে অসন্তোষ ও অনাগ্রহ বাড়ছে।

উত্তরপত্র মূল্যায়নে শিক্ষকদের অনীহা কেন– তা জানতে অন্তত ১৫ পরীক্ষকের সঙ্গে কথা বলেছে সমকাল। তবে তারা কেউই নাম প্রকাশ করে বক্তব্য দিতে চান না। শিক্ষকদের বক্তব্য, পরিশ্রমের তুলনায় খাতা দেখার সম্মানী নামমাত্র। সেটাও পেতে বছর পার হয়ে যায়। এসব নিয়ে পরীক্ষকদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।

রাজধানীর খ্যাতনামা একটি বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক বলেন, গত বছর তিনি ৪০০ খাতা দেখেছেন। এ বছর ৬০০ খাতা দেখেছেন। অথচ গত বছরের টাকাই এখনও পাননি। এ রকম অভিযোগ আরও অনেকের।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষক অভিযোগ করেন, ঢাকা শিক্ষা বোর্ড প্রতিবছরই পরীক্ষকদের খাতা দেখার টাকা দিতে দেরি করে। এ নিয়ে তারা বিরক্ত, ক্ষুব্ধ।

কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।