BD SYLHET NEWS
সিলেটবুধবার, ৬ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, দুপুর ২:৫০
আজকের সর্বশেষ সবখবর

সিলেটে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় আটজনের মৃত্যু


মে ৩, ২০২৬ ৭:২০ অপরাহ্ণ
Link Copied!

সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার শিবপুর গ্রামের পাণ্ডব বিশ্বাস কাজ করা নিয়ে অভিমান করে বাড়ি থেকে সিলেট শহরে এসেছিলেন দুই সপ্তাহ আগে। তিনি নির্মাণ কাজে ঢালাই শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন।

সিলেটে থাকতেন নগরীর লোহারপাড়া এলকায় পিসির বাসায়; সেখান থেকে রোববার সকালে বের হয়েছিলেন কাজে যাওয়ার জন্য। সকাল ৬টায় সিলেটের দক্ষিণ সুরমার তেলিবাজার ব্রিজ এলাকায় ট্রাক ও পিকআপের মুখোমুখি সংঘর্ষে যে আটজনের মৃত্যু হয়েছে তার মধ্যে পাণ্ডব বিশ্বাসও (২০) রয়েছেন।

পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, নগরীর আম্বরখানা পয়েন্টে থেকে ২০ জন ঢালাই শ্রমিক একটি পিকআপে করে দক্ষিণ সুরমার লালাবাজারের দিকে যাচ্ছিলেন। তাদের সঙ্গে ছিল ঢালাই মেশিনও। পিকআপটি তেলিবাজার ব্রিজ এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা কাঁঠালবোঝাই ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।

শ্রমিকরা জানান, তখন পিকআপে থাকা সবাই ছিটকে পড়েন। ঘটনাস্থলে মারা চারজন। সিলেট এমএজি ওসমানি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর আরও চারজনের মৃত্যু হয়। বাকি আহতরা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

দুর্ঘটনার খবর পেয়ে কাকা পুলিন বিশ্বাস নিহত পাণ্ডব বিশ্বাসের মরদেহ বাড়ি নিয়ে যেতে ওসমানী হাসপাতালে এসেছেন। সেখানে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “বাড়িতে কাজকাম নিয়ে কথাবার্তা বলায় রাগ করে শহরে এসেছিল। কারণ এখন বৈশাখি কাজ চলছে, পাণ্ডব এই কাজ করতে পারত না। সে বালুর কাজ করত, তাকে অন্য কোনো কাজ করার কথা বললে রাগ করত। তাই সে সিলেটে এসে ঢালাই শ্রমিক হিসবে কাজ করছিল তার পিসির বাসায় থেকে।’’

পাণ্ডবের বাবা আগেই মারা গেছেন। পরিবারে মা, বড় ভাই ও বৌদি রয়েছে।

পুলিন বিশ্বাস বলেন, “পাণ্ডবের নগদ টাকার কাজে বেশি আগ্রহ ছিল, অন্য কাজ তেমন করত না।”

দুর্ঘটনায় নিহত অপর সাতজন হলেন- সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার দুই ভাই আজির উদ্দিন (৩৫) ও আমির উদ্দিন (২২), ধর্মপাশা উপজেলার নার্গিস আক্তার (৪৫), দিরাইয়ের সেছনি গ্রামের মোছা. মুন্নি বেগম (২৬), দিরাই ইসলামপুরের নুরুজ আলী (৬০) ও নূরনগরের ফরিদুল (৩৫), সিলেট সদর উপজেলার জালালাবাদ থানার রায়েরগাঁওয়ের বদরুল আমিন (৪০), সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের পুটামারা গ্রামের বদরুজ্জামান।

আহতরা হলেন- হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার আমকান্দি গ্রামের রফিক মিয়ার ছেলে মো. আলমগীর (৩২), সিলেট নগরীর কালিবাড়ী এলাকার মৃত শুকুর উল্লাহর ছেলে তোরাব উল্লাহ (৬০), আম্বরখানা লোহারপাড়ার মৃত আলিম উদ্দিনের ছেলে রামিন (৪০) ও একই এলাকার মল্লিক মিয়ার ছেলে আফরোজ মিয়া (৪০), সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার গাছতলা গ্রামের খোকন মিয়ার মেয়ে রাভু আক্তার (২৫), সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার পুটামারা গ্রামের বদরুজ্জামানের মেয়ে হাফিজা বেগম (৩০) এবং দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়ার জফুর আলীর ছেলে রাজা মিয়া (৪৫)।

স্বামী নেই, আহত স্ত্রী জানেন না

সিলেটের জালালাবাদ থানার রায়েরগাঁওয়ের বদরুল আমিন ও তার স্ত্রী হাফিজা বেগম প্রতিদিনের মত কাজে যাচ্ছিলেন। বাড়িতে রেখে এসেছিলেন চার সন্তানকে। ট্রাক ও পিকআপের মুখোমুখি সংঘর্ষে মারা যান বদরুল আমিন। আর স্ত্রী হাফিজা বেগম বর্তমানে আহত অবস্থায় আছেন ওসমানী হাসপাতালে। তবে স্ত্রী জানেন না, তার স্বামী আর বেঁচে নেই।

এই পরিবারের আত্মীয় আব্দুর রহিম দুর্ঘটনার খবর পেয়ে চার সন্তানকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন। তিনি জানান, আহত হাফিজা বেগম তার ভাইয়ের মেয়ে।

আব্দুর রহিম বলেন, তার ভাতিজির জামাই বদরুল আমিন দুই-তিন মাস ধরে ঢালাই শ্রমিকের কাজ করছিলেন। আগে তিনি আটোরিকশা চালাতেন। আর্থিক ঝামেলায় পড়ে দুই মাস ধরে তারা স্বামী-স্ত্রী এই কাজে যোগ দেন। তাদের তিন ছেলে ও এক মেয়ে।

নিহত বদরুল আমিনের ছোট ভাই সাদিকুল আলম বলেন, “আমার বড় ভাই মারা গেছেন। ভাবি হাসপাতালে ভর্তি। কিছু সময় আগে ভাবির জ্ঞান ফিরেছে। ভাবিকে বলা হয়নি, ভাই যে মারা গেছেন। আমি ভাইয়ের লাশ নেওয়ার ব্যবস্থা করছি ভাই।”

একসঙ্গে প্রাণ গেছে দুই ভাইয়ের

সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার মুক্তিখলা গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল গফারের ছেলে আজির উদ্দিন (২৮) ও আমির উদ্দিন (২২)। তাদের পরিবারে মা-বাবাসহ সবাই রয়েছেন। নিহত আজির উদ্দিনের স্ত্রী ও তিন ছেলেমেয়ে রয়েছে।

ওসমানী হাসপাতালে নিহত আজির উদ্দিন ও আমির উদ্দিনের খালাতো ভাই শামীম বলেন, দুই ভাইয়ের লাশ গ্রহণ করার পর বাড়িতে নিয়ে যাবেন। লাশ বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য কাগজপত্র নিয়ে হাঁটাহাঁটি করছেন।

তিনি বলেন, দুই ভাই ফজরের দিকে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন কাজে যাওয়ার জন্য। সকালে দুর্ঘটনার খবর পেয়ে তিনি ওসমানী হাসপাতালে আসেন। সুবিদবাজার এলাকায় তারা ভাড়া থেকে কাজ করতেন।

আজির উদ্দিনের স্ত্রী বলেন, তার স্বামী এক বছর ধরে সিলেটে ঢালাই শ্রমিকের কাজ করতেন। ঈদের পর বাড়িতে গিয়েছিলেন আজির উদ্দিন, তারপর আর বাড়ি যাননি। তিন ছেলে-মেয়ে রয়েছে তাদের।

আজির উদ্দিনের মা বলেন, “আমার দুই ছেলে, তারা সিলেট কাজ করত, ওহ আল্লাহ গো।”

ছেলের সঙ্গে শনিবার সন্ধ্যাবেলায় কথা হয়েছিল বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।