ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনা বিভাগে মোট আসন ৩৬টি। এসব আসনে প্রতিদ্বন্দ্বীর সংখ্যা ২০১। এর মধ্যে নারী প্রার্থী সাতজন। বিভাগে নারী প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতার গড় হার ৫.৫৮।
এর আগে দ্বাদশসহ গত চারটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলার ছয় আসনে নারী প্রতিদ্বন্দ্বীর হার ছিল সাড়ে ৬ শতাংশ। নবম থেকে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যভাণ্ডার ও ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, খুলনা বিভাগের ১০ জেলার ৩৬ সংসদীয় আসনের চিত্র প্রায় অভিন্ন। নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মধ্যে বিএনপি একজন, জাতীয় পার্টি দুজন, গণফোরাম একজন, বাসদ একজন এবং বাংলাদেশ রিপাবলিক পার্টি (বিআরপি) একজন নারীকে মনোনয়ন দিলেও অন্য কোনো দলে নারী প্রার্থী নেই। তবে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন একজন।
নির্বাচনে বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, নড়াইল জেলার সংসদীয় আসনগুলোতে কোনো নারী প্রার্থীই নেই। নারী প্রার্থী হয়েছেন ঝিনাইদহে দুজন, যশোরে একজন, মাগুরায় একজন, খুলনায় একজন, নড়াইলে একজন এবং কুষ্টিয়ায় একজন।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনার ছয়টি আসনে ১০টি দল মনোনীত ও স্বতন্ত্রসহ ৩৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, যার মধ্যে নারী প্রার্থী ছিলেন মাত্র দুজন।
এবারের নির্বাচনে জেলার ছয়টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৩৮ জন। এর মধ্যে খুলনা-৫ আসনে জাতীয় পার্টি মনোনীত একমাত্র নারী প্রার্থী শামীম আরা পারভীন ইয়াসমীন। যাচাই-বাছাইয়ে তাঁর মনোনয়নপত্র বাতিল হলেও পরে আদালতের মাধ্যমে প্রার্থিতা ফিরে পান তিনি।
অপরদিকে বিভাগের যশোর জেলার ছয়টি আসনে ৩৬ জন প্রার্থীর মধ্যে যশোর-২ আসনে বিএনপি মনোনীত একমাত্র নারী প্রার্থী সাবিরা সুলতানা। ঝিনাইদহের চারটি আসনের ২০ প্রার্থীর বিপরীতে নারী প্রার্থী দুজন। এরমধ্যে জাতীয় পার্টির মনিকা আলম ঝিনাইদহ-১ আসন ও গণফোরামের খনিয়া খানম ঝিনাইদহ-৪ আসনের প্রার্থী। মাগুরার দুটি আসনে মোট প্রার্থী ১১ জন। এর মধ্যে একমাত্র নারী প্রার্থী বাসদের শম্পা বসু। মাগুরা-১ আসনে লড়ছেন তিনি।
নড়াইলের দুইটি আসনে ১৬ জন প্রার্থীর মধ্যে নারী প্রার্থী একজন। নড়াইল-২ আসনে ফরিদা ইয়াসমিন নামের ওই নারী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন। আর কুষ্টিয়ার চারটি আসনে ২৫ জন প্রার্থীর মধ্যে কুষ্টিয়া-১ আসনে লড়ছেন একমাত্র নারী প্রার্থী রিপাকলিক পার্টির রুম্পা খানম।
এর আগে, নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনা জেলার ছয়টি আসনে মোট প্রার্থী ছিলেন ৩৩ জন, তাঁদের মধ্যে নারী ছিলেন মাত্র একজন। দশম জাতীয় নির্বাচনে এই জেলার ১১ জন প্রার্থীর মধ্যে নারী তিনজন এবং একাদশ জাতীয় নির্বাচনে ৩৭ প্রার্থীর মধ্যে নারী প্রার্থী ছিলেন মাত্র দুজন।
একাধিক নারী প্রার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্থানীয় সরকারে প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে নারী জনপ্রতিনিধি বাড়লেও সংসদ নির্বাচনে অনেক কম। নারীরা পরিবারেও বৈষম্যের শিকার হন। নানা ইস্যুতে তাঁদের মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। আবার নির্বাচনী ‘বুলিংয়ের’ শিকার হন নারী প্রার্থীরা। যেহেতু সংসদ নির্বাচন, নির্বাচন পরিচালনায় প্রচুর অর্থ ব্যয়ও বড় প্রতিবন্ধকতা। তাই সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন, নির্বাচনে কালো টাকার ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। না হলে দিন দিন অবস্থা আরো খারাপ হবে।গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ১৯৭২-এর ধারা ৯০-বি (বি)(রর) অনুযায়ী, রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় কমিটিসহ সকল স্তরের কমিটিতে ন্যূনতম ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার বিধান রয়েছে। প্রাথমিকভাবে এই লক্ষ্যমাত্রা ২০২০ সালের মধ্যে অর্জনের সময়সীমা ছিল। তবে রাজনৈতিক দলগুলো এই লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হওয়ায় বর্তমান সংশোধনী অনুযায়ী এই সময়সীমা ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
সরাসরি রাজনৈতিক দলের সম্পৃক্ত ও নারী সংগঠনের নেতা এমন তিনজনের সঙ্গে কথা বলেছেন এ প্রতিবেদক। তাঁরা জানান, দলগুলোর অভ্যন্তরে নারীর মূল্যায়ন খুব কম। প্রথমেই ‘ও পুরুষ না, ও পারবে না’- বলে অবজ্ঞা শুরু হয়। কুৎসা রটানো হয়, ব্যবহার করার চেষ্টা চলে। নির্বাচনের ক্ষেত্রে এ অবস্থা আরো কঠিন। টাকা ও ক্ষমতার প্রশ্ন তোলা হয়। তবে দুয়েকটি ব্যতিক্রম উদাহরণ দেওয়া ঠিক নয়।
খুলনা ওমেন চেম্বার অব কমার্সের সভানেত্রী ও আইনজীবী শামীমা সুলতানা শিলু বলেন, শিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা এমনকি বিমান-ট্রেন পরিচালনায়ও নারীর অংশগ্রহণ রয়েছে। সেখানে রাজনীতিতে অবস্থা খুব ভালো নয়। যাঁরা রাজনীতিতে রয়েছেন তাঁদের বেশিরভাগই আত্মীয় ও পারিবারিক পরিচিতি থেকে আসেন। পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব, প্রভাব-প্রতিপত্তির কারণে তৃণমূলের নারীরা পিছিয়ে পড়ছেন। এ অবস্থার পরির্তনের জন্য মানসিকতার পরিবর্তন খুব জরুরি। না হলে আরপিও বাস্তবায়ন অসম্ভব হবে।
