ইসলাম শুধু একটি ধর্ম নয়, বরং এটি সৌন্দর্য ও আদব বা শিষ্টাচারের এক পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তোমরা মানুষের সঙ্গে সুন্দরভাবে কথা বলো।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ৮৩)
যা জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে সৌন্দর্য, আদব ও রুচিবোধের শিক্ষা দেয়। সৌন্দর্যের প্রকৃত রূপ ও মহান আল্লাহ।
সৌন্দর্য বলতে ইসলাম শুধু বাহ্যিক জৌলুস বা দামি পোশাককে বোঝায় না, বরং এর মূল নিহিত রয়েছে মানুষের অন্তরে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের বাহ্যিক চাল-চলন ও বিত্ত-বৈভবের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন না, বরং তিনি দৃষ্টি দিয়ে থাকেন তোমাদের অন্তর ও আমলের প্রতি।
(মুসলিম, হাদিস : ৬৪৩৭)
মানুষ আল্লাহর কাছে প্রিয় হতে হলে তার অন্তর সুন্দর ও পবিত্র হওয়া উচিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ সুন্দর এবং তিনি সৌন্দর্য পছন্দ করেন।’ (মুসলিম, হাদিস : ১১৬)
তাই মানুষের উচিত তার অন্তর ও আমলকে ঈমানের অলংকারে সাজিয়ে তোলা। যার জন্য প্রয়োজন হলো তাকওয়া অবলম্বন। মানুষের অন্তর যখন তাকওয়ায় পরিপূর্ণ হয়, তখন তার মনে অহংকার, রিয়া ইত্যাদির মতো আবর্জনা স্থান পায় না। এভাবে যখন তার অন্তর পবিত্র হয়ে যায়, তখনই মহান আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন।
পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়াসম্পন্ন।’(সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১৩)
এর বিপরীতে যদি কারো অন্তরে সংকীর্ণতা থাকে, তবে তার দুনিয়া-আখিরাত সবই সংকীর্ণ হয়ে ওঠে। তার অন্তরে জমে থাকা অন্ধকারের কারণে সে হেদায়েতের আলো দেখতে পায় না। ফলে সে আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত থাকে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘সুতরাং যাকে আল্লাহ হেদায়েত করতে চান, ইসলামের জন্য তার অন্তর প্রশস্ত করে দেন। আর যাকে ভ্রষ্ট করতে চান, তার বুক সংকীর্ণ-সংকুচিত করে দেন, যেন সে আসমানে আরোহণ করছে। এমনিভাবে আল্লাহ অকল্যাণ দেন তাদের ওপর, যারা ঈমান আনে না। (সুরা : আনআম, আয়াত : ১২৫)
অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, তারা কি জমিনে ভ্রমণ করেনি? তাহলে তাদের হতো এমন হৃদয়, যা দ্বারা তারা উপলব্ধি করতে পারত এবং এমন কান, যা দ্বারা তারা শুনতে পারত। বস্তুত চোখ তো অন্ধ হয় না, বরং অন্ধ হয় বক্ষস্থিত হৃদয়। (সুরা : হজ, আয়াত : ৪৬)
এ জন্যই হয়তো মহান আল্লাহ তাঁর নবী মুসা (আ.)-কে অন্তর প্রশস্তকরণের দোয়া শিখিয়েছেন। তিনি দোয়া করেছেন, ‘হে আমার প্রতিপালক, আমার জন্য আমার বক্ষকে প্রশস্ত করে দিন।’ (সুরা : ত্বহা, আয়াত : ২৫)
প্রকৃত মুমিন হওয়ার জন্য অন্তরের প্রশস্ততা ও পবিত্রতা খুব জরুরি। পবিত্র অন্তর ছাড়া হেদায়েত মেলে না। ঈমানে পূর্ণতা আসে না। পবিত্র অন্তরে অন্যের ভালো না চাইলে নিজের জীবনেও কল্যাণ আসে না। মুমিন যখন আন্তরিকভাবে অন্যের ভালো চায়, তার জন্য দোয়া করে, তখন আল্লাহর নিষ্পাপ ফেরেশতারা তার জন্য দোয়া করে। আবু দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোনো মুসলমান বান্দা তার ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে তার জন্য দোয়া করলে একজন ফেরেশতা তার জবাবে বলেন, আল্লাহ তোমাকেও অনুরূপ দান করুন। (মুসলিম, হাদিস : ৬৬৭৮)
মহান আল্লাহ মুমিনের আন্তরিকতাকে ভীষণ পছন্দ করেন। তাই তো তিনি অন্তরের প্রশস্ততাকে কল্যাণ ও সফলতার চাবি হিসেবে চিত্রিত করেছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর মুহাজিরদের আগমনের আগে যারা মদিনাকে নিবাস হিসেবে গ্রহণ করেছিল এবং ঈমান এনেছিল (তাদের জন্যও এ সম্পদে অংশ রয়েছে), আর যারা তাদের কাছে হিজরত করে এসেছে, তাদের ভালোবাসে। আর মুহাজরিদের যা প্রদান করা হয়েছে তার জন্য এরা তাদের অন্তরে কোনো ঈর্ষা অনুভব করে না। এবং নিজেদের অভাব থাকা সত্ত্বেও নিজেদের ওপর তাদের অগ্রাধিকার দেয়। যাদের মনের কার্পণ্য থেকে রক্ষা করা হয়েছে, তারাই সফলকাম।’ (সুরা : হাশর, আয়াত : ৯)
তাই আমরা যদি আমাদের অন্তরকে সুন্দর করতে পারি, ঈমানে পরিপূর্ণ করতে পারি, তাহলে ইনশাআল্লাহ মহান আল্লাহ আমাদের ইহকাল-পরকাল সব সুন্দর করে দেবেন।
