বিনোদন ডেস্ক : সরাসরি বাস্তব জীবনের সিরিয়াল কিলারদের গল্প নিয়ে তৈরি সিনেমার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। কারণ, বাস্তব খুনিদের পর্দায় তুলে ধরা বরাবরই বিতর্কিত। অনেকের মতে, এতে খুনিদের অযাচিত গুরুত্ব বা ‘গ্ল্যামার’ দেওয়া হয়, আবার সাবধানতা না থাকলে তারা সহানুভূতির পাত্র হয়ে উঠতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, এতে প্রায়ই ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের কণ্ঠস্বর আড়ালে পড়ে যায়। তবু কিছু সিনেমা আছে, যেগুলো এই সূক্ষ্ম সীমারেখা অতিক্রম না করেই অপরাধমনস্তত্ত্বকে গভীরভাবে অনুসন্ধান করেছে। সেই সেরা ছবিগুলোর মধ্য থেকে বাছাই করা হলো সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত সেরা ১০টি সিরিয়াল কিলার সিনেমা।
‘নো ম্যান অব গড (২০২১)’
মার্কিন ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত সিরিয়াল কিলারদের একজন টেড বান্ডি। তাঁকে নিয়ে তৈরি হয়েছে অনেক সিনেমা, সিরিজ ও তথ্যচিত্র। সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ ‘এক্সট্রিমলি উইকেড’, ‘শকিংলি ইভিল অ্যান্ড ভাইল’, যেখানে বান্ডির চরিত্রে অভিনয় করেন জ্যাক এফ্রন।
তবে অনেকের মতে, ‘নো ম্যান অব গড’ই বান্ডিকে নিয়ে তৈরি সবচেয়ে শক্তিশালী সিনেমা। এখানে বান্ডির চরিত্রে অভিনয় করেছেন লুক কার্বি। ছবিটির বড় শক্তি এর সংলাপ—যার বড় অংশই নেওয়া হয়েছে বান্ডির সঙ্গে এফবিআই বিশ্লেষক বিল হ্যাগমায়ারের সাক্ষাৎকারের আসল ট্রান্সক্রিপ্ট থেকে। এই ছবিতে বান্ডিকে কোনোভাবেই রোমান্টিসাইজ করা হয়নি; বরং তাঁর নিজের কথার মাধ্যমেই উন্মোচিত হয়েছে, কীভাবে নানা ফিকশনাল বর্ণনায় তাঁর শিকারদের মুছে ফেলা হয়েছে এবং অতিরঞ্জিত করা হয়েছে তাঁর তথাকথিত ‘আকর্ষণ’।
‘দ্য টাউন দ্যাট ড্রেডেড সানডাউন (১৯৭৬)’
অনেকেই এই ছবিকে প্রথম দিককার স্ল্যাশার সিনেমাগুলোর একটি হিসেবে গণ্য করেন। হ্যালোইন বা ফ্রাইডে দ্য থার্টিন্থের আগে নির্মিত এই ছবি সরাসরি একটি ঐতিহাসিক হত্যাকাণ্ডের পুনর্নির্মাণ। ১৯৪৬ সালে টেক্সাসের ছোট শহর টেক্সারকানায় এক অজ্ঞাত খুনি পাঁচজনকে হত্যা করে। ঘাতকের পরিচয় কখনোই জানা যায়নি।
মুখোশধারী এই খুনির রহস্যময় উপস্থিতি তাকে প্রায় অতিপ্রাকৃত চরিত্রে রূপ দেয়। ছবির শেষ দৃশ্যে সিনেমার প্রিমিয়ারে খুনির হাজিরা দর্শককে মনে করিয়ে দেয়—সে ধরা পড়েনি, সে এখনো কোথাও লুকিয়ে থাকতে পারে।
‘দ্য স্নোটাউন মার্ডারস (২০১১)’
অস্ট্রেলিয়ার বাইরে খুব বেশি পরিচিত না হলেও নব্বইয়ের দশকে স্নোটাউন হত্যাকাণ্ড দেশটিতে ভয়াবহ আলোড়ন তোলে। তিন যুবক ও এক সহযোগী মিলে একের পর এক খুন করে মরদেহ লুকিয়ে রাখে ব্যাংকের ভল্টে রাখা ব্যারেলে।
এই সিনেমা খুনের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে খুনিদের পেছনের গল্পে—তাদের শৈশব, পারিবারিক পরিবেশ ও পারস্পরিক সম্পর্কের টানাপোড়েনে। ছবির বড় অংশজুড়ে চলে এই নির্মম যাত্রার প্রস্তুতি, ফলে প্রথম মরদেহ আবিষ্কারের দৃশ্যটি দর্শকের জন্য আরও বেশি চমকে দেয়।
‘বোস্টন স্ট্র্যাংলার (২০২৩)’
১৯৬০–এর দশকের শুরুতে বোস্টনে ১৩ জন নারী খুনের ঘটনায় গ্রেপ্তার হন অ্যালবার্ট ডি সালভো; কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই এই মামলার তদন্ত নিয়ে ছিল তীব্র বিতর্ক। অনেকেই বিশ্বাস করতেন, একাধিক খুনি এতে জড়িত থাকতে পারে। পরে ডিএনএ প্রমাণ অন্তত শেষ হত্যাকাণ্ডে সালভোর জড়িত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করে।
এই সিনেমা দুটি নারী সাংবাদিকের চোখ দিয়ে ঘটনাগুলো তুলে ধরে, যারা পুলিশের চাপ ও সম্পাদকদের বাধা উপেক্ষা করে সত্যের সন্ধানে নেমেছিলেন। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি শক্তিশালী ক্রাইম ড্রামা।
‘হেনরি: পোর্ট্রেট অব আ সিরিয়াল কিলার (১৯৮৬)’
হেনরি লি লুকাস গ্রেপ্তারের পর দাবি করেছিলেন, তিনি ছয় শতাধিক খুন করেছেন, যা পরে মিথ্যা প্রমাণিত হয়। শেষ পর্যন্ত তিনি ১১টি হত্যাকাণ্ডে দোষী সাব্যস্ত হন।
এই ছবি লুকাসের জীবন ও সহযোগী অটিস টুলের সঙ্গে সম্পর্ককে কেন্দ্র করে নির্মিত। অনেক তথ্য কাল্পনিক হলেও মাইকেল রুকারের অভিনয় ছবিটিকে সিরিয়াল কিলার সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম ভীতিকর অভিজ্ঞতায় পরিণত করেছে।
‘মাই ফ্রেন্ড ডাহমার (২০১৭)’
যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে কুখ্যাত সিরিয়াল কিলারদের একজন জেফরি ডাহমার। কিন্তু এই ছবি তাঁর খুনের অধ্যায় নয়; বরং কিশোর বয়সের গল্প। ডাহমারের স্কুলজীবনের বন্ধু জন ব্যাকডার্ফের গ্রাফিক নভেল ও স্মৃতিকথা অবলম্বনে নির্মিত এই সিনেমা দেখায়—একজন খুনি হয়ে ওঠার আগের ডাহমারকে।
এটি প্রকৃতি বনাম পরিবেশবিতর্কে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না টানলেও দর্শককে ভাবতে বাধ্য করে—দানব কি জন্মায়, নাকি তৈরি হয়?
‘দ্য হানিমুন কিলার্স (১৯৭০)’
‘লোনলি হার্টস কিলার্স’ নামে পরিচিত এই যুগল ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে শিকার বেছে নিত। ধারণা করা হয়, তারা যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে প্রায় ২০টি খুন করেছিল, যদিও প্রমাণ মিলেছে মাত্র তিনটির।
সাদা-কালোতে নির্মিত এই ছবি অনেক জায়গায় তথ্যচিত্রের রীতি অনুসরণ করেছে, যা হত্যাকাণ্ডগুলোকে আরও নির্মম করে তোলে। মজার তথ্য—ছবিটির পরিচালক হিসেবে প্রথমে যুক্ত ছিলেন মার্টিন স্করসেসি, তবে ধীরগতির কাজের কারণে মাঝপথে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
‘মনস্টার (২০০৩)’
নারী সিরিয়াল কিলার হওয়ার কারণে আইলিন উওর্নসের গল্প বরাবরই আলাদা আগ্রহ তৈরি করেছে। এই ছবিতে তাঁকে দেখানো হয়েছে একজন নির্যাতিত যৌনকর্মী হিসেবে, যিনি প্রতিশোধ ও ক্ষোভ থেকে খুন করেন।
ছবিটি নিয়ে বিতর্ক থাকলেও শার্লিজ থেরনের অস্কারজয়ী অভিনয় একে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। চরিত্রের ভঙ্গি, দৃষ্টি ও রাগ—সবকিছুতেই তিনি যেন উওর্নসে বিলীন হয়ে যান।
‘মেমোরিজ অব মার্ডার (২০০৩)’
পরিচালক বং জুন-হোর আন্তর্জাতিক খ্যাতির আগেই নির্মিত এই কোরিয়ান ক্ল্যাসিক। ১৯৮৬ থেকে ১৯৯৪ সালের মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ায় সংঘটিত একাধিক ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের তদন্তকে কেন্দ্র করে ছবির গল্প।
ছবি মুক্তির সময় খুনি অচিহ্নিত ছিল, যা রহস্যকে আরও ভীতিকর করে তোলে। বছরের পর বছর ধরে হত্যাকারীর অধরা থাকা—এই বাস্তবতাকেই ব্যবহার করে বং জুন-হো নির্মাণ করেছেন এক অসহনীয় টানটান থ্রিলার।
‘জোডিয়াক (২০০৭)’
ডেভিড ফিঞ্চারের সেরা কাজগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত ‘জোডিয়াক’। যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম আলোচিত অমীমাংসিত হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই ছবিতে কখনোই খুনির পরিচয় প্রকাশ করা হয় না, যেমনটি বাস্তবেও হয়নি। বরং এই ছবি দেখায়, কীভাবে একজন সাধারণ মানুষ উত্তরহীন এক রহস্যের গভীরে তলিয়ে যায়। অসাধারণ অভিনয়, নিখুঁত সময়কাল পুনর্নির্মাণ এবং সত্য অপরাধ নিয়ে মানুষের আসক্তির গভীর বিশ্লেষণ—সব মিলিয়ে জোডিয়াক শুধু সিরিয়াল কিলার সিনেমা নয়; বরং মানব মনস্তত্ত্বের এক অনন্য পাঠ। স্ক্রিন র্যান্ট অবলম্বনে
