প্রতি বছরই এই সময়টার অপেক্ষায় থাকেন স্থানীয় বাসিন্দারা। কারণ একসঙ্গে দেশীয় প্রজাতির নানা জাতের মাছ নিয়ে বসে মেলা। ঐতিহ্যবাহী এ মাছের মেলা মৌলভীবাজারসহ সিলেট বিভাগের অন্যতম আনন্দের উৎস। স্থানীয় নদী ও হাওর থেকে সংগৃহীত হাজার থেকে লক্ষাধিক টাকা দামেরও মাছ বিক্রি হয় মেলার প্রতিটি দোকানে। সোমবার রাত থেকেই জেলার সদর উপজেলার কুশিয়ারার তীর জুড়ে বসেছে মাছের কয়েক শতাধিক দোকান। ক্রেতা ও বিক্রেতাদের ভিড় ছিল লক্ষণীয়। এটি বড় পরিসরে সিলেট বিভাগের একমাত্র ঐতিহ্যবাহী মাছের মেলা। তাই মেলাকে ঘিরে উৎসাহ-উদ্দীপনার কমতি নেই। মেলায় উঠেছে নানা জাতের বিশাল মাছ। এমন অদেখা বড় মাছ দেখতে আর কিনতে দর্শক ক্রেতার কমতি নেই। মূলত ওখানে দু’রাত আর দু’দিনই ধুম পড়ে মাছ কেনা বেচার। মেলায় বিক্রি হয় প্রায় ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকার মাছ। আর সমাগম ঘটে দেশের নানা প্রান্তের ভোজনবিলাসী লক্ষাধিক মানুষের। এমন তথ্য মেলায় মাছ বিক্রেতা (আড়তদার) ও স্থানীয় মানুষের। জানা যায় প্রায় দুইশ’ বছর পূর্বে মৌলভীবাজারের শেরপুরে কুশিয়ারা নদীর তীর জুড়ে শুরু হয়েছিল এই মাছের মেলা। ঐতিহ্যের টানে যা এখনো স্থানীয়রা তা ধরে রেখেছেন। তাই প্রতি বছরই পৌষ মাসের শেষের দিকে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের পাশে শেরপুরে কুশিয়ারা নদীর তীরে এ মাছের মেলার আয়োজন করা হয়।
স্থানীয়রা বাসিন্দারা জানালেন মেলার নির্ধারিত স্থানে নির্দিষ্ট সময়ের এক-দু’দিন আগে থেকেই জমে উঠে ইমিটেশন, খেলনা, গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় নানা জিনিসপত্রের দোকান। আর বাদ যায়নি মুড়ি-মুড়কি আর মণ্ডা-মিঠাইসহ কতকি মুখরোচক খাবার দাবারে আয়োজন। মেলাস্থল শেরপুর হলো মৌলভীবাজার জেলা সদর থেকে প্রায় ২৩ কিলোমিটার দূরে সদর উপজেলার একেবারেই শেষভাগে।
পশ্চিমে হবিগঞ্জ জেলার নবিগঞ্জ উপজেলা উত্তরে কুশিয়ারা নদী। নদী পাড় হলেই সিলেট জেলার বালাগঞ্জ উপজেলা। হবিগঞ্জ, সিলেট ও মৌলভীবাজার এই তিনটি জেলার মোহনা হলো শেরপুর। মৎস্য ব্যবসায়ী আর স্থানীয়দের জোর দাবি এটিই দেশের সবচেয়ে বড় মাছের মেলা। মেলাটি মাছের মেলা হলেও মাছ ছাড়া বিভিন্ন দ্রব্যের সহস্রাধিক দোকানও বসে কুশিয়ারা নদীর তীর জুড়ে। মেলায় বেত-বাঁশ, কাঠ, লোহা ও মাটির তৈরি নানা রকম পণ্য, শিশুদের খেলনা, সবজিসহ অনেক ধরনের লোকজ পণ্য, ফার্নিচার, কৃষিপণ্য, গৃহস্থালি সামগ্রী, নানা জাতের দেশীয় খাবারের দোকানসহ থাকে গ্রামীণ ঐতিহ্যের নানা রং ঢং আর প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দোকান। কুশিয়ারা, সুরমা ও মনু নদী, হাকালুকি, কাওয়াদীঘি, হাইল ও টাঙগুয়ার হাওর ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মৎস্য ব্যবসায়ীরা বাঘাইড়, রুই, কাতলা, মৃগেল, চিতল, বোয়াল, গজারসহ নানা জাতের দেশীয় প্রজাতির বড় বড় মাছ নিয়ে পসরা সাজান। থাকে ছোট মাছেরও দোকান। এ বছরও ছোট বড় সকল মাছই উঠেছে মেলায়। একটি বাঘাইড় মাছের দাম হাঁকা হয় ২ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। এ ছাড়া অন্যান্য জাতের অনেক মাছই ১০ হাজার থেকে লক্ষাধিক টাকা দাম হাঁকা হচ্ছে। মেলায় প্রচুর মাছ উঠলেও দাম একটু বেশি বলে অভিযোগ ক্রেতাদের। তবে মাছ বিক্রেতারা জানালেন নানা কারণে স্থানীয় নদী ও হাওরে আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। তারপরও তারা মেলার ঐতিহ্য ধরে রাখতে অনেক কষ্টে বাড়তি দাম দিয়ে মাছ সংগ্রহ করেছেন। এ জন্য দাম একটু বেশি। তারপরও তারা ক্রেতাদের নাগালের মধ্যেই দাম হাঁকছেন। ক্রেতারা একসঙ্গে পছন্দের ছোট বড় মাছ পেয়ে তারা খুশি। কারণ এ মাছগুলো মেলা ছাড়া তারা সংগ্রহ করতে পারেন না। স্থানীয়রা জানান, মেলা উপলক্ষে প্রবাসী অধ্যুষিত এ অঞ্চলের শেরপুর, নবীগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজারসহ আশপাশের সৌখিন অনেক প্রবাসীরা দেশে আসেন। তাছাড়া মেলাকে কেন্দ্র করে আত্মীয়স্বজনরাও আসেন তাদের বাড়িতে। নানা স্বাদের মাছ আর নানা জাতের পিঠা তৈরিতে উৎসবের আমেজে জমে উঠে পুরো এ অঞ্চল।
