মঙ্গলবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২০, ০৩:২১ অপরাহ্ন

শিরোনাম ::
গোলাপগঞ্জে অস্ত্রসহ ডাকাত আটক ম্যারাডোনার মৃতদেহ চুরির আশঙ্কা, ২০০ সশস্ত্র পুলিশ মোতায়েন নতুন তথ্য সচিব খাজা মিয়া যোগদান করেছেন ম্যারাডোনার মৃত্যুতে ‘ভাত খাচ্ছেন না’ নাটোরের বাবু সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের নবনিযুক্ত প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসারের দায়িত্ব গ্রহন আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময় বাড়লো এক মাস মহান বিজয়ের মাস শুরু আজ বড়লেখায় যুবলীগের বিক্ষোভ মিছিল বিকাশ প্রতারকের সঙ্গে প্রেম করে টাকা উদ্ধার করলেন কলেজছাত্রী কেনিয়ায়‘মৃত’ব্যক্তির চিৎকারে ভয়ে পালালেন মর্গের কর্মীরা! সিলেটে বৃহস্পতিবার ৮ ঘন্টা থাকবে না গ্যাস সিলেটে জেলা যুবলীগের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ মুজিব বর্ষে বড়লেখার দৌলতপুর মাদ্রাসায় মাস্ক কোরআন ও ফলজ গাছ বিতরণ নিসচা জুড়ী উপজেলা শাখার কমিটির অনুমোদন,বড়লেখা উপজেলা শাখার শুভেচ্ছা ফেনীতে নিজ হাতে সন্তানের মাথা ফাটিয়ে কোলে নিয়ে ভিক্ষা!
cloudservicebd.com

নিরাপদ হলো না সড়ক

20201022 022304 - BD Sylhet News

কাজী সালমা সুলতানা: প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেই চলছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগও মোকাবিলা করা যায়, কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনা নামক গণমৃত্যুর ফাঁদ কিছুতেই দূর হচ্ছে না?

তিন বছর ধরে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস পালন করা হয়, কিন্তু সড়ক আর নিরাপদ হয় না। একইভাবে সড়কগুলোয় বাসের প্রতিযোগিতা চলছে। এখনও রাজধানীর সড়কে অসংখ্য ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলছে। কোনো কিছুতেই কমছে না সড়ক দুর্ঘটনা। যে পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটি প্রাণ হারান, সে পরিবারের যে কী অবস্থা হয়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর যারা পঙ্গু হয় তাদের পরিবারের অবস্থা আরও শোচনীয় হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিবারই দুর্ঘটনার পরপরই একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তারপর সেই তদন্ত প্রতিবেদন আর প্রকাশ করা হয় না।

২০১৮ সালের ২৯ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট দেশব্যাপী নিরাপদ সড়ক আন্দোলন থেকে একটি আন্দোলন বা গণবিক্ষোভ সংগঠিত হয়েছিল। রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী বাসের নিচে পিষ্ট হয়ে নিহত এবং ১০ শিক্ষার্থী আহত হয়। এ দুর্ঘটনায় যে বিক্ষোভ শুরু হয়, তা পরে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর গত বছরের ৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে একটি খসড়া ট্রাফিক আইন অনুমোদন করা হয়। কিন্তু পরে দেখা যায়, পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের অযৌক্তিক দাবি ও চাপের কারণে ‘সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮’ বাস্তবায়নের আগেই সংশোধন করা হয়। সড়ক ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে চলা নৈরাজ্যের মুখে গত বছরের মাঝামাঝি নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের নজিরবিহীন আন্দোলনের মুখে সরকার ‘সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮’ পাস করলেও পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের বাধার মুখে তা বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয়। এই খসড়া সংশোধনের দাবিতেও দেশের বিভিন্ন জেলায় পরিবহন মালিক- শ্রমিকরা ধর্মঘট করেন।

আইনের ভেতরের বিষয়বস্তু নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল ‘রোড সেফটি ফাউন্ডেশন’ ও ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ নামে দুটি সংগঠন। তাদের বক্তব্য হলোÑএ আইনে সড়ক নিরাপত্তার বিষয়গুলো তেমন গুরুত্ব পায়নি। পরিবহন মালিক, শ্রমিক ও যাত্রী বা জনসাধারণ অর্থাৎ সব পক্ষের স্বার্থ সুরক্ষা হয়নি। মূলত মালিক পক্ষের স্বার্থকেই আইনে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

গত বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর সড়ক পরিবহন আইন পাস হয়। আইনে বলা হয়, চালকের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণি পাস হতে হবে, যা বাস্তবে দৃশ্যমান নয়। লাইসেন্স না থাকলে চালকের ছয় মাসের কারাদণ্ড বা ২৫ হাজার টাকা জরিমানা হবে। দুই যানবাহনের পাল্টাপাল্টিতে দুর্ঘটনা ঘটলে চালকের তিন বছরের কারাদণ্ড অথবা জরিমানা হবে ২৫ লাখ টাকা। আইন অমান্য করলে চালকের নির্ধারিত নম্বরও কাটা যাবে। একপর্যায়ে সব নম্বর কাটা গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে তার লাইসেন্স। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ও দুর্ঘটনা কমাতে এমন অনেক বিধানই রয়েছে নতুন সড়ক পরিবহন আইনে। কিন্তু সংসদে পাস হওয়ার পর বছর পেরোলেও আইনটি কার্যকর হয়নি।

২০১৯ সালের ১৯ মার্চ রাজধানীর নর্দায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবরার আহমেদ চৌধুরী বেপরোয়া বাসের চাপায় নিহত হন। এরপর শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে আবারও রাস্তায় নামেন। আবারও আলোচনায় আসে সড়ক পরিবহন আইন কার্যকর করার বিষয়টি।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে, সারা দেশে গত বছর ৫ হাজার ৫১৬টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে ৭ হাজার ৮৫৫ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১৩ হাজার ৩৩০ জন। জাতীয় ও আঞ্চলিক সংবাদপত্র এবং অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এই তথ্য জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। এসব ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা বেড়েই চলছে।

এসব সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী হলো ত্রুটিযুক্ত যানবাহন অর্থাৎ ফিটনেসবিহীন গাড়ি, গাড়ির চালক, সড়কের নির্মাণ ত্রুটি, চালকের অসতর্কতা, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, বিপজ্জনক ওভারটেকিং, যাত্রী ও পথচারীদের অসতর্কতা, গাড়ি চালানোর সময়ে মোবাইল ফোন বা হেডফোন ব্যবহার করা, মাদক সেবন করে যানবাহন চালানো প্রভৃতি। আমাদের সমাজের প্রচলিত কথা অনুযায়ী সব দুর্ঘটনাকেই বলা হয় নিয়তির নির্মম পরিহাস। কিন্তু যে পরিবারে নেমে আসে এমন বিপদ, সেই পরিবারই বোঝে তার মর্মবেদনা।

এ কথা সত্য, ঢাকা শহরে যেসব গাড়ি গণপরিবহনে রয়েছে, তার ব্যাপক অংশ রাস্তায় চলার উপযোগী নয়। গাড়ির বাইরের অবস্থা দেখেই গা ঘিনঘিন করে। ভেতরে সিট, অকেজো ফ্যান, দুই সিটের মাঝের ফাঁকা স্থানের পরিমাণ, গাড়ির বডি, জানালার কাচ, রং এসব দেখলে বুঝতে মোটেও সমস্যা হয় না যে, এ গাড়ি রাস্তায় চলাচলের উপযোগী নয়। বিশ্বের কোনো দেশের রাজধানীতে এমন বিবর্ণ, জোড়াতালি দেওয়া, ভাঙাচোরা ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল করে? উন্নয়নশীল দেশের পথে এগিয়ে চলা বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা মহানগরীতে নির্বিঘেœ চলছে এসব গাড়ি। ফিটনেসবিহীন এসব গাড়ি নাকি পুলিশকে মাসোয়ারা দিয়ে চালানো হয়। এসব গাড়ির চালকের স্বেচ্ছাচারিতায় কখনও কখনও ট্রাফিক পুলিশটিকেও জীবন হারাতে হয়।

এসব গণপরিবহনের চালকের আসনে অনেক সময়ই স্টিয়ারিং ধরা থাকে কোনো কিশোরের হাতে। এ বয়সে গাড়িচালকের লাইসেন্স তার পাওয়ার কথা নয়, কিন্তু পেয়ে গেছে; অথবা ওই কিশোর গাড়ির হেল্পার, কোনো লাইসেন্সই নেই। প্রকৃত চালক বিশ্রাম নিচ্ছে, এ ফাঁকে সে একটা ট্রিপ মারছে। আবার গাড়িচালকদের অনেকেই মাদকসেবী। নিজেদের শরীরের ওপরই তাদের নিয়ন্ত্রণ নেই। জানা যায়, দেশে বৈধ যানবাহন ১৩ লাখের বেশি। আর বৈধ চালকের সংখ্যা মাত্র আট লাখ। লাইসেন্সবিহীন অদক্ষ অবৈধ কত চালক গাড়ি চালান, তার কোনো সঠিক হিসাব নেই। এসব চালকের হাতে যাত্রী বা পথচারীর জীবন বিপন্ন হচ্ছে। অধিক মুনাফার লোভে চালকরা পরস্পর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। ফলে ওভারটেকিং করে নিয়ম-কানুনকে তোয়াক্কা না করে। আর এর ফল হিসেবে বাসযাত্রীদের জীবন বিপন্ন হয়।

খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। ঢাকা মহানগরীতে নির্ধারিত স্থানের বাইরে গাড়ি থামত না। অর্থাৎ যাত্রীদের বাসস্ট্যান্ড থেকে উঠতে হতো এবং বাসস্ট্যান্ডেই নামতে হতো। কিন্তু এখন ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থা দেখে মনে হয় পুরো ঢাকা শহরই যেন বাসস্ট্যান্ড। কোনো বাস যেখানে যাত্রী পাচ্ছে, সেখান থেকেই তুলছে; আবার যেখানে ইচ্ছা সেখানেই যাত্রী নামিয়ে দিচ্ছে। এজন্য ওই গাড়িটি রাস্তার পাশেও চাপানো হচ্ছে না। রাস্তার মাঝখান থেকেই যাত্রী ওঠানো বা নামানো হচ্ছে। এভাবে যাত্রী ওঠানো-নামানো যে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ তা গাড়িচালক, গাড়ির হেল্পার এমনকি ওই যাত্রীরও ধারণা নেই। এছাড়া এভাবে যত্রতত্র গাড়ি দাঁড় করানোর ফলে তার পেছনে যে অসংখ্য গাড়ি দাঁড়িয়ে যাচ্ছে, সেদিকেও ভ্রুক্ষেপ নেই গাড়িচালকের। রাস্তার মাঝে গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানোর ক্ষেত্রে যেকোনো সময় পেছন থেকে আসা আরেকটি বাসের নিচে জীবন চলে যাচ্ছে যাত্রীর।

একই সঙ্গে সড়ক দুর্ঘটনায় পথচারীদের অসতর্কতাকেও দায়ী মনে করা হয়। সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, গাড়িচালক ও পথচারীর অসতর্কতা এবং বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের ৭২ শতাংশই পথচারী। সারা দেশে যত দুর্ঘটনা ঘটে, সেজন্য পথচারীরাও অনেকাংশে দায়ী। পথচারীরাও প্রায় কোনো নিয়মনীতিও মানতে চান না। তবে পথচারীরা যদি নিয়ম মেনে সতর্কতার সঙ্গে রাস্তা পারাপার হন, তাহলে প্রাণহানির সংখ্যা কমে আসবে। যানবাহনে অতিরিক্ত যাত্রী হওয়া, ট্রাকে যাত্রী হওয়া ও ট্রাকের মালামালের ওপর যাত্রী হওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

সড়ক দুর্ঘটনা হয় না এমন দেশ নেই। কিন্তু দুর্ঘটনার সংখ্যা এবং ক্ষয়ক্ষতি যত কমিয়ে আনা যায়, সেটিই লক্ষ্য হওয়া উচিত। বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য মাত্রায় নেই। সার্বিকভাবে সড়ক অব্যবস্থাপনা জাতীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

সড়কে বিশৃঙ্খলার নিরসন হওয়া খুবই জরুরি। সে কারণেই সড়ক পরিবহন আইনে চালকদের সাজার পরিমাণ বৃদ্ধি করা যেমন জরুরি, তেমনি চালকদের নিয়োগ নীতিমালাসহ পেশাগত সুযোগ-সুবিধা, দৈনিক কর্মঘণ্টা, আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন। অতিরিক্ত কর্মঘণ্টার কারণে দুর্ঘটনা ঘটলে চালকের জন্য যে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে, মালিকের জন্যও তা প্রযোজ্য হওয়া উচিত।

প্রতিদিন জীবনমৃত্যুকে হাতে নিয়েই চলছে সড়কে যাতায়াত। দেশের জনগণ যেন পরিবহন মালিকের হাতে জিম্মি। চালকের স্বেচ্ছাচারিতা, যখন-তখন ওভারটেক করা এবং অতিরিক্ত জোরে গাড়ি চালানোয় পথচারীর মৃত্যু হলে চালকের শাস্তি নিশ্চিত করা যায় না। একজন অপরাধীর পক্ষ নিয়ে সারা দেশে পরিবহন ধর্মঘট শুরু হয়ে যায়। তাই সত্বর সড়ক পরিবহন আইন কার্যকর হওয়া দরকার। সরকাররের পাশাপাশি পথচারী ট্রাফিক পুলিশ, পরিবহন মালিক এবং চালকের দায়িত্ববোধ ও আন্তরিক সচেতনতার সমন্বয়ই পারে সড়ক দুর্ঘটনা সহনীয় পর্যায়ে কমিয়ে আনতে। কিন্তু সেটা কবে হবে, তা আমাদের জানা নেই। তাই সড়কে লাশের মিছিল আজও চলছে।

লেখক:- সংবাদকর্মী

 

শেয়ার করুন...
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  


বিডি সিলেট নিউজ মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। © ২০১৭ - ২০২০
Design & Developed BY Cloud Service BD