সোমবার, ১৬ মে ২০২২, ০৬:২৯ অপরাহ্ন

শিরোনাম ::
হবিগঞ্জে ট্রাক-ধান কাটার মেশিনের সংঘর্ষে যুবক নিহত আসছে বর্ষা, সিলেটে ঝুঁকি নিয়ে টিলায় বসবাস শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে সিলেট জেলা আ.লীগের কর্মসূচী ঘোষণা জগন্নাথপুরে ৩ দিন ধরে ফেরি চলাচল বন্ধ, চরম দুর্ভোগে যাত্রীরা জাপানি দুই শিশু: বাবার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার আবেদন সিলেটে একদিনে সড়ক দূর্ঘটনায় ৪ জন নিহত আইসিইউতে ভর্তি বিএনপি নেতা মঈন খান পুকুরে টাকা ডুবলেই ‘স্বপ্ন পূরণ পানির নিচে খাদেমের কারসাজি’ সিলেট নগরীতে ট্রাকচাপায় মোটরসাইকেল আরোহীর মৃত্যু সিলেটে কুড়িয়ে পাওয়া শিশু উর্মির অভিভাবকের সন্ধান চায় পুলিশ বিশ্বকাপ ট্রফি ৫১ দেশের উদ্দেশে যাত্রা শুরু ‘এখানে কিছু টাকা আছে, এটা দিয়ে আমার দাফন-কাফন করিও’ সিলেটে পাহাড়ি ঢলে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত, দুর্ভোগে মানুষ সিলেটে গাঁজাসহ মাদক কারবারি আটক বড়লেখায় বর্হিবিশ্ব জাতীয়তাবাদী ফাউন্ডেশন নেতৃবৃন্দদের সংবর্ধনা প্রদান




সিলেটে ২৬ বছরে নিখোঁজ ১৭ জন

nikhuj photo 600x337 1 - BD Sylhet News




বিডিসিলেট ডেস্ক : ‘এখন আর চোখে জল আসে না। কান্নাগুলো বুকের মধ্যে জমাট বেঁধে আছে। মাঝেমধ্যে খুব হতাশ লাগে। কোথায় গেলে তাকে খুঁজে পাব, কে দেবে সান্ত্বনা- এমন হাজারো প্রশ্ন নিয়ে বেঁচে আছি।’ কথাগুলো সিলেটের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমানের স্ত্রী টিপু সুলতানা খাতুনের।

২০০৪ সালের ১৭ অক্টোবর। রমজান মাস। ইফতার শেষে বাসার সামনে হাঁটতে বের হন নগরীর প্রধান পাইকারি বাজার কালীঘাটের আড়তদার হাবিবুর। সেই তার শেষ যাওয়া। আর ফিরে আসেননি। উপশহরের ই-ব্লকের ৩ নম্বর রোডের ৭৫ নম্বর রহমান ভিলায় প্রায় ১৮ বছর ধরে তার প্রতীক্ষায় সুলতানা। এরই মধ্যে মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। নাতি-নাতনিও হয়েছে। কিন্তু পুলিশ ও গোয়েন্দারা হাবিবুরের খোঁজ দিতে ব্যর্থ।

একইভাবে বছরের পর বছর ধরে নিখোঁজ সিলেট জেলার কুলাউড়ার উছলাপাড়ার আব্দুস ছত্তারের ছেলে আব্দুল হান্নান ও তার মাইক্রোবাসচালক জুড়ীর মনতৈল গ্রামের গিয়াস, পুলিশ লাইন্স স্কুলের ছাত্র মাহিয়ান, শহরতলির টুকেরবাজারের ইমাম আবদুল গনি, শিশু স্নিগ্ধা দেব জয়ী, মেজর (অব.) ডা. রোকন উদ্দিন চৌধুরী, কাকলী পাল, ছাত্রদল নেতা দিনারসহ ১৭ জন। এ তালিকায় রয়েছেন বহুল আলোচিত বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী ও তার গাড়িচালকও। গত ২৬ বছর ধরে এসব ব্যক্তি নিখোঁজ। তবে ২০০২ সাল থেকেই নিখোঁজ ১৫ জন।

যেভাবে নিখোঁজ
২০১২ সালে আলোচিত ছিল এম ইলিয়াস আলী ও তার গাড়িচালক আনসার আলীর নিখোঁজের ঘটনা। ইলিয়াস আলী ছিলেন সিলেট-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি। সে বছরের ১৭ এপ্রিল ঢাকা থেকে গাড়িচালকসহ নিখোঁজ হন তিনি।

একই বছরের ২২ মার্চ সিলেট নগরীর উপশহরে খুন হন ছাত্রদলের কর্মী শওকত। এ হত্যা মামলায় একই বছরের ১ এপ্রিল উচ্চ আদালতে জামিনের জন্য হাজিরা দিতে গিয়ে নিখোঁজ হন জেলা ছাত্রদলের সহসম্পাদক ইফতেখার আহমদ দিনার ও ছাত্রদল কর্মী জুনেদ আহমদ। ইলিয়াস আলী, আনসার আলী, দিনার ও জুনেদকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেওয়া হয়েছে বলে তাদের পরিবারের অভিযোগ। এর আগে ২০০৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ঢাকা থেকে নিখোঁজ হন সিলেটের বিশিষ্ট চিকিৎসক মেজর (অব.) ডা. রোকন উদ্দিন চৌধুরী। আজও তার সন্ধান মেলেনি।

২৫ বছর আগের ঘটনা। ১৯৯৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর কুলাউড়া থেকে ঢাকায় যাওয়ার পথে নিখোঁজ হন আব্দুল হান্নান ও তার গাড়িচালক। তখন হান্নান দুই সন্তানের জনক। তার স্ত্রী রহিমা আক্তার শেফালি ছিলেন অন্তঃসত্ত্বা। সাত মাস পর জন্ম নেয় তৃতীয় সন্তান শাহরিয়ার আলম পায়েল। শেফালি ও তার ছেলেরা এখনও অপেক্ষায় আছেন হান্নান কবে ফিরবেন? প্রতিবছর বিজয় দিবস এলেই তাদের ঘরে বয়ে যায় কান্নার রোল।

আলোচিত ছিল শিশু স্নিগ্ধা দেব জয়ীকে অপহরণের ঘটনা। গোয়ালাবাজারের ইলাশপুর গ্রামের স্কুলশিক্ষক সন্তোষ কুমার দেব ও জেলা প্রশাসনের অফিস সহকারী সর্বানী দেব তুলি দম্পতির একমাত্র সন্তান। ২০১৩ সালের ২১ জুলাই নগরীর ভাঙ্গাটিকর নবীন ৩৪/৩ নম্বর বাসা থেকে স্নিগ্ধাকে অপহরণ করা হয়। মামলার পর পুলিশ রবিউল ও বাসার মালিক বিনোদ বিহারী দামের ছেলে শঙ্কর দামকে আটক করে। অনিতা নামের এক নার্সকেও আটক করা হয়। মেয়েকে উদ্ধারে ২০১৪ সালে উচ্চ আদালতে রিট করেন সন্তোষ কুমার। ২০১৮ সালে রবিউল, অনিতা ও শঙ্কর দামকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দেয় সিআইডি। বর্তমানে মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে। গত ডিসেম্বরে মারা যান প্রধান আসামি শঙ্কর।

শহরতলির টুকেরবাজার নোয়াগাঁও গ্রামের কারি আবদুল গণিকে অপহরণ করা হয় ২০০৭ সালের ২৮ জুলাই। পরদিন তার ভাই আব্দুল বারী গাঢাকা দেন। স্ত্রী নেহারুন নেছা বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন। বারী তার ভাই গণির পরিবারের সঙ্গে সমঝোতার আশ্বাস দিয়ে মামলাটি খারিজও করিয়ে নেন। তবে তার বিরুদ্ধে গণির ছেলে লায়েকের করা আরেকটি জালিয়াতি মামলায় চার্জশিট হয়েছে।

২০০৮ সালের ১৯ আগস্ট নগরীর কাজিটুলার লোহারপাড়ার নজির আলীর ছেলে উজ্জ্বল অপহৃত হয়। ২৫ আগস্ট উজ্জ্বলের মা তার জামাতা মজিবুর রহমান পাটোয়ারী ও স্থানীয় হিরণ বাবুর্চির ছেলে কালিয়াকে আসামি করে কোতোয়ালি থানায় জিডি এবং ৬ অক্টোবর সিলেটের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন। পুলিশ চার্জশিটে মজিবুর ও কালিয়াকে অভিযুক্ত করে। সন্দেহ করা হচ্ছে পারিবারিক বিরোধের বলি উজ্জ্বল।

২০১২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি আরেক আলোচিত ঘটনা ছিল কাকলী পাল অপহরণ। ফুলবাড়ী পূর্বপাড়ার কানাই লাল পালের মেয়ে কাকলী গোলাপগঞ্জ চৌমুহনী থেকে অপহৃত হন। এ মামলায় নগরীর দাড়িয়াপাড়ার বাসিন্দা উজ্জ্বল মল্লিকসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। অপহরণ সত্য হলেও আটক ব্যক্তিরা জড়িত নন বলে পুলিশ, ডিবি ও র‌্যাব প্রতিবেদন দেয়। এর বিরুদ্ধে ২০১৪ সালে উচ্চ আদালতে যান কাকলীর ভাই কল্লোল পাল।

২০২০ সালের ৪ সেপ্টেম্বর হরিপুর বাজার সমিতির সেক্রেটারি নঈম উল্লাহ নিখোঁজ হন। স্থানীয়রা বলছেন, দেনা থেকে বাঁচতে নঈম বর্তমানে ভারতে। পুলিশ লাইন্স স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র মাশিয়ানকে (৭) স্কুলের সামনে থেকে অপহরণ করা হয় ২০০৬ সালের ১৩ নভেম্বর। গত বছরের নভেম্বরে তাবলিগ জামাতে যাওয়ার কথা বলে নিখোঁজ হন ওসমানীনগর উপজেলার দয়ামীরের শেখ আহমেদ মামুন, একই গ্রামের হাসান সায়িদ, সাইফুল ইসলাম তুহিন ও সাদিকুর রহমান। তাদের এখন পর্যন্ত খোঁজ নেই বলে জানিয়েছেন থানার ওসি এস এম মাইন উদ্দিন।

যারা ফিরেছেন
২০১৪ সালের ৪ মে সুনামগঞ্জ থেকে সিলেটে ফেরার পথে অপহৃত হন যুক্তরাজ্য বিএনপির সেই সময়ের উপদেষ্টা কমিটির সদস্য ও সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মুজিবুর রহমান ও তার গাড়িচালক রেজাউল করিম সোহেল। অপহরণকারীরা তার কাছে ১২ কোটি টাকা দাবি করেছিল। কিছুদিন পর মুজিবকে ঢাকা থেকে ও পরে চালককে উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় আকবর চৌধুরী, জিহাদ, তারেক ও মাহমুদ নামের চারজনকে আটক করেছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

গত বছরের ১০ ডিসেম্বর নগরীর পাঠানটুলা মোহনা ৮৩ নম্বর বাসা থেকে নিখোঁজ ঠিকাদার নজরুল ইসলাম দেশের দক্ষিণাঞ্চল থেকে উদ্ধার হন। কয়েক বছর আগে সুবিদবাজারের বাসিন্দা শাহ মোহাম্মদ শওকত আলীও ঢাকা থেকে উদ্ধার হয়েছিলেন। ১৯৭২ সালে বিয়ানীবাজারের বেজগ্রাম থেকে নিখোঁজ হন হাবিবুর রহমান (৭৮)। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে ফেসবুকের কল্যাণে তার সন্ধান পান সন্তানরা। চট্টগ্রামে ব্যবসার কাজে গিয়ে নিখোঁজ হন তিনি। ২০১৮ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি জৈন্তাপুরের ব্যবসায়ী একরাম হোসেন নিখোঁজের কয়েক দিন পর উদ্ধার হন।

স্বজনরা যা বলছেন
সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়া নিখোঁজ চিকিৎসক রুকন উদ্দিন চৌধুরীর পরিবার থাকে ঢাকায়। তাদের বক্তব্য নেওয়া যায়নি। একইভাবে অপহৃত স্কুলছাত্র মাশিয়ানের পরিবারের অবস্থান পরিবর্তন হওয়ায় তাদের বক্তব্য মেলেনি। স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক বিদ্যুৎ জ্যোতি চক্রবর্তী বলেন, তাদের কাছে মাশিয়ানের কোনো তথ্য নেই।

কুলাউড়া থেকে অপহৃত হান্নানের ছেলে শফিউল আলম সৌরভ বলেন, ‘বাবার কোনো সন্ধান কেউ দিতে পারেনি। মামলাটির কী হলো তাও জানি না।’ নিখোঁজ ছাত্রদল নেতা দিনারের মামা সিলেট কল্যাণ সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এহসানুল হক বলেন, মামলাটি এখন ডিবি তদন্ত করলেও অগ্রগতি নেই। নিখোঁজ হাবিবুর রহমানের ভাই রফিক উদ্দিন বলেন, ‘কেউ খবর দিতে পারেনি। মামলাটি তামাদিই মনে হচ্ছে।’

শহরতলির টুকেরবাজার নোয়াগাঁও গ্রাম থেকে নিখোঁজ কারি আবদুল গণির ছেলে লায়েক আহমদ বলেন, বাবাকে খুঁজে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ২০১৬ সালে গ্রামের লোক নিয়ে মামলাটি খারিজ করিয়ে নেন চাচা আব্দুল বারী। কিন্তু তিনি কথা রাখেননি। আজও বাবার খোঁজ মেলেনি। এ বিষয়ে বাদীপক্ষের আইনজীবী অশেষ কর বলেন, এত আগের মামলা শেষ হয়ে যাওয়ার কথা।

অপহৃত কাকলী পালের ভাই কল্লোল পাল বলেন, ‘শুরু থেকেই একটি পক্ষের প্রভাবে কাকলীকে উদ্ধার প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটে। ১০ বছর পেরিয়ে গেছে। এখনও জানতে পারলাম না কাকলী বেঁচে আছেন, না মেরে ফেলা হয়েছে।’

একইভাবে গোয়ালাবাজারের ইলাশপুর গ্রামের স্নিগ্ধার বাবা সন্তোষ কুমার দেব বলেন, ‘মেয়েটি কোথায় আছে, কেমন আছে, আদৌ বেঁচে আছে কিনা জানতে পারলাম না।’

ওসমানীনগরে নিখোঁজ হাসান সায়িদ, সাইফুল ইসলাম তুহিন ও সাদিকুর রহমানের পরিবারের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে মামুনের বাবা শেখ শামসুল হক স্বপন বলেন, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক টিমের সঙ্গে তাদের কথা হয়েছে। কিন্তু কারোর খোঁজ মেলেনি।

কী বলছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী
নিখোঁজ ব্যক্তিদের ব্যাপারে সিলেট অঞ্চলে আলাদা কোনো পরিসংখ্যান নেই উল্লেখ করে মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ সিলেটের সমন্বয়ক মুহিবুর রহমান বলেন, গত ২০ বছরে অনেকেই গুম ও অপহরণের শিকার। দু-একজন ফিরে এলেও বাকিদের হদিস নেই। সরকারের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

সিআইডি সিলেটের বিশেষ পুলিশ সুপার সুজ্ঞান চাকমা বলেন, অপহরণ বা নিখোঁজের মামলায় ভুক্তভোগী উদ্ধার না পাওয়া পর্যন্ত চার্জশিট বা ফাইনাল রিপোর্ট দেওয়া যায় না। এ ক্ষেত্রে সময় লাগে। কোনো কারণে অপহৃত দের উদ্ধার না করে আদালতে প্রতিবেদন দেওয়া হলেও ভবিষ্যতে মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করার সুযোগ রাখা হয়।

পুরোনো কোনো অপহরণ কিংবা নিখোঁজের মামলা ও অভিযোগ জেলা পুলিশের তদন্তাধীন নেই উল্লেখ করে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন বলেন, সম্প্রতি ওসমানীনগর থেকে চারজন নিখোঁজ হয়। তারা স্বেচ্ছায় বাড়ি ছাড়ে। তবে তারা কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত নাকি অন্য কারণে বাড়ি ছেড়েছে সে বিষয়ে তদন্ত চলছে।

সূত্র: সমকাল

শেয়ার করুন...











বিডি সিলেট নিউজ মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। © ২০২২
Design & Developed BY Cloud Service BD